(প্রায় দু’মাস আগে লেখা। তখন গ্রীষ্মকাল হলেও ঢাকায় কয়েকদিন পরপর বৃষ্টি হতো। এখনকার মত “ঘাম ঝরে দরদর” ধরণের গরম ছিল না। রাতগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ ঠাণ্ডা থাকতো।)
আজ খুব ভোরে (শেষরাতে) বিজলি চমকানোর আলো আর বজ্রপাতের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। রাতে শোবার আগে দেখে নিয়েছিলাম, কাঁচের জানালাটা ইঞ্চি চারেক খোলা রেখে নেটের জানালাটা পুরোটা লাগানো আছে। ঘুমানোর আগে ঘরের ভেতরে বাতাস চলাচলের জন্য শিওরের কাছের জানালায় এ সামান্য ব্যবস্থাটুকু নিশ্চিত করাটা এখন আমার প্রাত্যহিক অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটুকু খোলা না রাখলে একটু হাঁসফাস বোধ করি। ঘুম ভেঙে গেলেও, আরেকটু ঘুমোতে ইচ্ছে করছিল। ঘুম জড়ানো চোখে সময়টা দেখে নিলাম, কেবলমাত্র ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়েছে। উঠবো উঠবো করতে করতে ভয় হচ্ছিল, উঠতে না পারলে ফজরের নামাজটা ওয়াক্তের মধ্যে পড়ে নিতে পারবো না। কারণ, এ সময়ের ঘুমটা মারাত্মক রকমের গভীর হয়ে থাকে। যাহোক, আমার এই আলসেমির বিরুদ্ধে প্রকৃ্তিই বাধ সাধলো। আধো ঘুমের মধ্যেই টের পেলাম, বৃষ্টির ঝাপটার একটা হাল্কা ধারা মুখে এসে লাগছে। ধড়ফড় করে উঠে জানালার কাঁচটা পুরোপুরি লাগিয়ে দিলাম। আর এই দ্রুত অনুশীলনের কারণে চোখে লেগে থাকা ঘুমটাও কোথায় যে চলে গেল!
ভোর ছয়টায় হাঁটার জন্য নিচে নেমে দেখি, আমাদের বাসার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খালটার বুকে যেন জোয়ার এসেছে। ভোর রাতের সেই সামান্য সময়ের (কিন্তু ভারীবর্ষণ) বৃষ্টিতেই প্রায় মরা খালটা জলে ভরে টইটম্বুর হয়ে গেছে। এই জলস্রোত গুলশান লেক হয়ে গিয়ে মিশবে হাতির ঝিলের জলের সাথে। সেই আনন্দে মাতোয়ারা খালের স্রোতধারা উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে যাচ্ছে, মৃদু লয়ে নয়, বেশ ব্যস্ত ত্রস্ত হয়ে। সেই স্রোতে ভেসে যাচ্ছে গাছের ঝরা পাতা, শুকনো সরু ডাল ও কঞ্চি এবং আরও হরেক রকমারি ভাসমান দ্রব্যাদি। একটাও পলিথিন ব্যাগ চোখে পড়লো না বলে মনটা খুশি হলো। আকাশে পাখিদের ওড়াউড়ি চলছে, খালের পাশের গাছ-গাছালিতে বসে থাকা পাখিদের কিচির মিচির আওয়াজও বেশ জোরেই শোনা যাচ্ছে। অদূরে দেখলাম একটা কানি বকও ওঁৎ পেতে বসে আছে জল থেকে টুপ করে তার সকালের নাশতার কোন উপকরণ বেছে নেয়ার জন্য। সাধারণতঃ ছোট কোন মাছ, ব্যাঙাচি কিংবা খালের তীর ঘেঁষে চলমান কোন পোকা মাকড় ছাড়া এখানে তার মেন্যুতে আর কিছু পাওয়ার কথা নয়।
মুহূর্তের মধ্যেই শৈশবে ফিরে গেলাম। ঝরা পাতা, শুকনো সরু ডাল ও কঞ্চি ইত্যাদিকে ‘কেয়াপাতার নৌকো’ এবং সরু খালটিকে ‘তালদিঘি’ কল্পনা করে নিজের অজান্তেই যেন স্মৃতি থেকে আওড়ালামঃ
“কেয়াপাতায় নৌকো গড়ে’
সাজিয়ে দেব ফুলে,
তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেবো,
চলবে দুলে দুলে।"
(ছুটি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
যদিও কল্পিত ‘কেয়াপাতার নৌকো’গুলো ‘দুলে দুলে’ চলছিল না, বহমান স্রোত দ্বারা সোজা ধাবিত হচ্ছিল, তথাপি চোখে যাই দেখি না কেন, মনে স্মৃতির ঐ কথাগুলোই ভাসছিল।
প্রতিটি মানুষের অন্তরে একটি ইম্প্রেশনিস্ট কবি সত্তা রয়েছে। শৈশবের স্মৃতিমালা তার কোমল মনে যে ইম্প্রেশন রেখে যায়,সেটা অবিনাশী। বয়স যতই বাড়ুক, অনুকূল পরিবেশ পেলে সেটা তার মনের ক্যানভাসে উদয় হয়, তাকে ভাবায়, তাকে দিয়ে লেখায়।
ঢাকা
১৭ মে ২০২৬, ভোর ০৬-০২
শব্দ সংখ্যাঃ ৪৩৬

স্থির ছবিতে তেমন বোঝা যাচ্ছেনা। ভিডিও করেছি, কিন্তু সেটা সামুতে পোস্ট করার তরিকা জানা নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



