somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক পুনরুত্থান এবং দেশ থেকে দারিদ্র্য পুরোপুরি নির্মূল করার পেছনে এই মাস্টারপ্ল্যানটিই ছিল সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

এই পরিকল্পনাটি ১০ বছরের মধ্যে জাপানের অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে ৭.২% বার্ষিক প্রবৃদ্ধির টার্গেট নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে, জাপানিদের কঠোর পরিশ্রম এবং ইকেদার চমৎকার নীতির ফলে মাত্র ৭ বছরেরও কম সময়ে জাপানের অর্থনীতি দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০% ছাড়িয়ে যায়।

হায়াতো ইকেদার এই পরিকল্পনা যেভাবে জাপান থেকে দারিদ্র্য দূর করে একটি সমতাভিত্তিক মধ্যবিত্ত সমাজ তৈরি করেছিল, তার মূল কৌশলগুলো বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যায় কি না তা ভেবে দেখতে হবে।

ভারী ও রাসায়নিক শিল্পায়ন

ইকেদা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সস্তা শ্রম ও টেক্সটাইল শিল্পের মতো হালকা খাতের ওপর ভর করে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। তিনি সরকারি বিনিয়োগের দিক পরিবর্তন করে অটোমোবাইল, জাহাজ নির্মাণ, স্টিল এবং রাসায়নিক শিল্পের মতো ভারী ও মূলধন-নিবিড় খাতে ব্যাপক জোর দেন। এর ফলে লাখ লাখ গ্রামীণ অনুন্নত মানুষ শহরের আধুনিক শিল্পকারখানায় উচ্চ বেতনের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, যা তাদের দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বের করে আনে।

ট্যাক্স হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধি

দারিদ্র্য দূর করতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি ছিল। ইকেদা সরকার ট্যাক্স বা করের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেন। কর কমানোর ফলে সাধারণ মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হতে থাকে। এই অর্থ দিয়ে জাপানিরা রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন এবং রঙিন টেলিভিশনের (যা জাপানে "থ্রি ডিভাইন ট্রেজার্স" বা 'তিনটি ঐশ্বরিক রত্ন' নামে পরিচিত ছিল) মতো কনজিউমার পণ্য কিনতে শুরু করে। অভ্যন্তরীণ বাজারের এই বিপুল চাহিদাই জাপানি কোম্পানিগুলোকে আরও বড় হতে সাহায্য করে।

সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী

ইকেদার পরিকল্পনার একটি বড় চালিকাশক্তি ছিল সামাজিক কল্যাণ। ১৯৬১ সালে এই প্ল্যানের অংশ হিসেবে জাপানজুড়ে "সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা" এবং "সর্বজনীন জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা" চালু করা হয়। এর ফলে কোনো নাগরিক অসুস্থ হলে বা বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছালে আকস্মিক চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়ে যান।



শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং পূর্ণ কর্মসংস্থান

মাস্টারপ্ল্যানটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল "পূর্ণ কর্মসংস্থান" নিশ্চিত করা, অর্থাৎ কাজের যোগ্য প্রতিটা নাগরিকেরই চাকরি থাকবে। সরকার সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে ব্যাপক অর্থায়ন শুরু করে। ফলে, গ্রাম থেকে আসা অদক্ষ যুবকরাও দ্রুত প্রশিক্ষণ নিয়ে উচ্চ বেতনের দক্ষ কারখানাকর্মীতে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পান।

আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ ও গ্রামীণ উন্নয়ন

দারিদ্র্য যেন কেবল গ্রামেই আটকে না থাকে, সেজন্য ইকেদা "আঞ্চলিক আয় বৈষম্য নির্মূল" করার উদ্যোগ নেন। তিনি গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলগুলোর সাথে শহরের সংযোগ বাড়াতে মহাসড়ক, বুলেট ট্রেন (শিনকানসেন) এবং আধুনিক বন্দর নির্মাণের মতো বিশাল পাবলিক ওয়ার্কস প্রজেক্টে রাষ্ট্রীয় তহবিল ঢেলে দেন। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি শহরের বাজারে ভালো দামে বিক্রির সুযোগ পান।

ফলাফল ও মূল মূল্যায়ন

হায়াতো ইকেদার এই "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" জাপানকে একটি চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের দেশ থেকে এমন একটি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করে যেখানে ৯০% নাগরিক নিজেদের "মধ্যবিত্ত" (Middle Class) বলে মনে করতে শুরু করেন। এটি সমাজের নিচের স্তরের মানুষের আয় এতোটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, মাত্র এক দশকের মধ্যে জাপান থেকে "চরম দারিদ্র্য" শব্দটাই কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়।

জাপানের এই "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই কিন্তু পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর বিখ্যাত "লুক ইস্ট পলিসি" তৈরি করেছিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের রসায়নবিদ

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


লেখকের নোট:
এই গল্পের পটভূমি ১৯৭৭ সালের ঢাকায় সংঘটিত জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×