somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের গুরুত্ব এখনও আকাশের মতো বিশাল । কিন্তু একটা অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করেছেন? যারা প্রকৃত অর্থে কোটা সংস্কারের দাবিতে বা একটা একটা ন্যায্য অধিকারের জন্য বুক চিতিয়ে মাঠে নেমেছিল, যাদের আসলেই একটা চাকরি বা ক্যারিয়ারের বড্ড দরকার ছিল, সেই সাধারণ ছাত্র বা চাকরিপ্রার্থীরা কিন্তু এখন একদম চুপচাপ। তারা হয় চাকরির পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে দিনরাত পার করছে, নয়তো কোনো রকমে একটা গতি করে সংসার চালাতে ব্যস্ত।

প্রতি শুক্রবার সকাল হলেই যে হাজার হাজার বেকার মানুষ চাতক পাখির মতো পরীক্ষার হলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তাদের কাছে আসলে কোনো নির্দিষ্ট মাসের আলাদা কোনো মাহাত্ম্য বা চেতনার সময় নেই, চাকরিটা পাওয়াই তাদের একমাত্র চেতনা। আর যারা অলরেডি চাকরি করছেন, তারা অফিস আর ফ্যামিলির টানাপোড়েনে এতই বুঁদ হয়ে আছেন যে, তাদের রাজপথের এই গরম হাওয়া নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?

তাহলে এখন জুলাই মাস নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করছে কারা? খুব সহজ সমীকরণ, মাঠে এখন মূলত দুই পক্ষ। একদল ক্ষমতা হারানো সাবেক সরকারি দল, আর অন্যদল তাদের অ্যান্টি-প্ল্যাটফর্ম বা বর্তমান ক্ষমতার অংশীদারদের জোট। একদল আপ্রাণ চেষ্টা করছে জুলাইয়ের স্মৃতিকে নিজেদের মতো করে ব্র্যান্ডিং করতে, আরেকদল চেষ্টা করছে এটাকে যেকোনো মূল্যে ডিফেম বা বিতর্কিত করতে। এই দুই পক্ষের কাউয়া ক্যাচালে আখেরে কার লাভ হচ্ছে জানি না, তবে সাধারণ মানুষের মনোযোগ যে নিত্যদিনের মূল সমস্যাগুলো থেকে একদম সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা নিশ্চিত।

পুরোনো বিষয় নিয়ে বারবার কুতর্ক করে এরা নিজেদের ঘরে কতটুকু রাজনৈতিক ফসল ঘরে তুলতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, ভবিষ্যতের বড় বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, তা নিয়ে এদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো যেভাবে হোক ক্ষমতায় যাওয়া, আর ক্ষমতা পেলে নখ-দন্ত দিয়ে সেটাকে আঁকড়ে ধরা।

বর্তমান ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা জোটটি এখন সাবেক সরকারের সমালোচনা করছে। তারা জনগণকে বোঝাতে চাইছে, ওই দলটা গণহত্যাকারী, তাই তাদের আর কোনো দিন ফিরে আসার অধিকার নেই। ঠিক আছে, ক্ষমতার লোভে যখন চৌদ্দশ মানুষের প্রাণ যায়, তখন সেই অধ্যায় ক্লোজ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা চেনা প্রবাদ আছে না, এই দিন দিন দিন না, আরও দিন আছে। আজ সাবেক সরকারের গায়ে ফ্যাসিবাদের যে তকমা এরা লাগাচ্ছে, কাল নিজেরাও যে ক্ষমতার লোভে একই পথের পথিক হবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? নিজেদের ক্ষমতা ছাড়ার অতীত ইতিহাসও তো খুব একটা পজিটিভ ছিল না।

সতেরো বছর একনাগাড়ে একটা দল শাসন করায় মানুষ আপাতত এসব পুরোনো কাসুন্দি নিয়ে আর ঘাটতে চাইছে না। আমার কেবল টেনশন হয়, সাবেক দলকে যা যা গালি দেওয়ার এরা তো এখনই সব দিয়ে ফেলছে, পরে নিজেদের বেলায় বাকি থাকবে তো কিছু? যে যুক্তিতে একটা দলকে ফ্যাসিস্ট বলা হলো, সেই একই ফাঁদে বর্তমানের এই বিরোধী পক্ষ যে পা দেবে না, তা আমরা কেউ জানি না।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ক্ষমতার এই খেলায় কে আসল বিরোধী দল, তা নিয়ে জনগণের মনে বড় খটকা তৈরি হচ্ছে। একটা দল যতই নিজেদের আলাদা বা স্বতন্ত্র দাবি করুক না কেন, মানুষ কিন্তু তাদের একসাথেই জোটের অংশ হিসেবে দেখে। এই তো সেদিন যখন বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাস হলো, তখন কিন্তু এদের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো সংশোধনী বা প্রতিরোধ দেখা গেল না। এই কুসুম কুসুম বিরোধিতা আর হাত ধরাধরি করে চলা দেখে মনে হচ্ছে, পাঁচ বছর পার হওয়ার আগেই মানুষ এদের দুই দলকে আসলে এক দল হিসেবেই মনে করবে। আর তখন প্রকৃতির অদ্ভুত নিয়তিতেই মানুষ আবার সাবেক দলটাকেই প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করবে।

আমাদের দেশের শাসক দলগুলোর একটা চিরন্তন রোগ আছে। তারা মনে করে, মিডিয়া আর প্রোপাগান্ডা দিয়ে জনগণকে যা গিলানো হবে, জনগণ সেটাই গিলবে। সরকারের শত্রু মানেই দেশের শত্রু, সরকারের শত্রু মানেই আম-জনতার শত্রু: এই সস্তা থিওরি অন্তত এখন আর খাটে না। সাধারণ মানুষের নিজস্ব চোখ আছে, কান আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা হলো তুলনা করার ক্ষমতা আছে। সরকার মিডিয়া আর ক্ষমতা দেখিয়ে কাউকে যতই জাতীয় ভিলেন বানাক না কেন, সাধারণ মানুষ দিনশেষে নিজের পকেটের অবস্থা দিয়ে তুলনা করবে যে অমুক সরকারের আমলে আমি ভালো ছিলাম, নাকি এখন ভালো আছি। কিন্তু এই মনস্তত্ত্ব বোঝার মতো গভীরতা আমাদের রাজনীতিবিদদের নেই।

তাই নির্দিষ্ট কিছু মাস আসলেই টকশো আর মিডিয়াতে সার্কাস শুরু হয়ে যায়। কিছু বুদ্ধিজীবী নামক ভাড়াটে অভিনেতা টকশোতে এসে টেবিল গরম করেন। সাধারণ মানুষ এই নাটক দেখে বিভ্রান্ত হয় এবং দিনশেষে নিজের বুদ্ধি আরও কিছুটা হারিয়ে ফেলে। ওদিকে যারা অতিথি হয়ে যান তাদের পকেট ভারী হয়, টিভির টিআরপি বাড়ে, আরও নতুন নতুন মিডিয়া হাউজের জন্ম হয় , আরও নব্য বুদ্ধিজীবী তৈরি হয়। জনগণকে বোকা বানানোর এই চমৎকার চক্র চলতেই থাকে।

অথচ বাংলাদেশের মানুষের বাস্তব সমস্যার কি কোনো শেষ আছে? কোথাও কারেন্ট নেই, গরমে মানুষ সেদ্ধ হচ্ছে, কোথাও পানির হাহাকার। গ্যাসের সিলিন্ডার যেন সোনার হরিণ, রাত বারোটায় লাইনে গ্যাস আসলে গৃহিণীরা রান্না চড়ান। কয়দিন পর পর গার্মেন্টসের শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, তারা বেতনের জন্য রাস্তায় নামছে। শিক্ষিত যুবকদের চাকরির অভাব, খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল, আর সড়কে প্রতিদিন লাশের মিছিল। এসব মৌলিক ক্রাইসিস নিয়ে টকশোর টেবিল কিন্তু কোনো দিন গরম হয় না। সেখানে যারা যান, তাদের সবার একটাই প্রেসক্রিপশন: সব রোগের মেডিসিন , প্যারাসিটামল তিন বেলা। অর্থাৎ, তাদের পছন্দের দল ক্ষমতায় গেলেই নাকি দেশের সব সমস্যা জাদুর মতো ঠিক হয়ে যাবে। আসলে কিছুই ঠিক হয় না। কীভাবে ঠিক করতে হবে, সেই রোডম্যাপও এদের জানা নেই।

আজ দেশের শাসনব্যবস্থার যে অবস্থা, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যদি মন্ত্রীর বদলে স্রেফ আমলাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলেও দেশ এখন যেভাবে চলছে তার চেয়ে খারাপ চলবে না। অথচ কথা ছিল উল্টো। রাজনীতিকরা দেশ চালাবেন, আমলারা অর্ডার ফলো করবেন, রাজনীতিবিদরা বিদেশ থেকে বড় বড় ডিল আনবেন, চুক্তি করবেন, অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এসব কি আমরা আদৌ বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি? না, পাচ্ছি না। তাহলে প্রশ্ন থাকে, কী নিয়ে এত হাউকাউ করে নিজেদের পাশাপাশি দেশের মানুষের মাথা খাওয়ার চেষ্টা চলছে? এই তথাকথিত কাউয়া ক্যাচাল আর ক্ষমতার মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা দিয়ে আমাদের গন্তব্য আসলে কোথায়? আমরা যাচ্ছিটা কোথায়?



সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫৫
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×