somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে অনুকরণ না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অতি দ্রুত চীনকে একটি আধুনিক শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তর করা।

আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে প্রধান কারণগুলোর জন্য এই আন্দোলনটি নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল তা আমাদের মতো উন্নয়নশীল কৃষি প্রধান দেশে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবয়নের আগে ভালো করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অবাস্তব উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং মিথ্যা রিপোর্টিং

আন্দোলনের শুরুতে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে আকাশচুম্বী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ এবং মাও সে তুং-কে খুশি করার জন্য কাগজের কলমে ফসলের কাল্পনিক ও অতিরিক্ত উৎপাদন হিসাব (যেমন: একর প্রতি ১ টন উৎপাদনকে ৩০ টন দেখানো) পাঠাতে শুরু করেন। বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় সরকার এই মিথ্যা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে কর হিসেবে প্রায় সব খাদ্যশস্য গ্রামীণ এলাকা থেকে সংগ্রহ করে শহরে নিয়ে যায় এবং বিদেশে রপ্তানি করে। ফলে, কৃষকদের নিজেদের খাওয়ার জন্য কোনো খাদ্যশস্যই অবশিষ্ট ছিল না, যা তীব্র দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করে।

বাড়ির পেছনের চুল্লিতে নিম্নমানের ইস্পাত উৎপাদন

মাও সে তুং ঘোষণা করেছিলেন যে চীন খুব দ্রুত ইস্পাত উৎপাদনে যুক্তরাজ্যকে ছাড়িয়ে যাবে। এই লক্ষ্য অর্জনে পেশাদার কারখানার ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি গ্রামের সাধারণ মানুষকে তাদের বাড়ির পেছনে মাটির চুল্লি তৈরি করে লোহা ও ইস্পাত গলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কৃষকেরা বাধ্য হয়ে চাষাবাদ ছেড়ে দিনরাত ঘরের থালা-বাসন, কড়াই, কোদাল, এমনকি দরজার হুক গলিয়ে লোহা তৈরি করতে শুরু করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান না থাকায় এই চুল্লিগুলো থেকে যে লোহা উৎপাদিত হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং ভঙ্গুর, যা কোনো শিল্পকারখানায় ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী ছিল। এর ফলে দেশের মূল্যবান সময়, জ্বালানি এবং শ্রমের অপচয় হয়।

কৃষি খাত থেকে শ্রমের বিচ্যুতি
একটি কৃষিপ্রধান দেশে রাতারাতি লাখ লাখ কৃষককে মাঠ থেকে সরিয়ে ইস্পাত উৎপাদন, বাঁধ নির্মাণ এবং খনি খননের মতো বিশাল অবকাঠামোগত প্রকল্পে বাধ্য করা হয়। এর ফলে ফসলের মৌসুমে জমিতে ফসল কাটার মতো পর্যাপ্ত জনশক্তি ছিল না। মাঠের পর মাঠ পাকা শস্য অলসভাবে পড়ে থেকে পচে নষ্ট হয়ে যায়। শিল্পায়নের পেছনে অন্ধভাবে ছুটতে গিয়ে চীনের মেরুদণ্ড - কৃষি খাত সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

ক্ষতিকারক ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক কৃষি নীতি (Lysenkoism)

এই আন্দোলনে সোভিয়েত ছদ্ম-বিজ্ঞানী ট্রফিম লিসেনকোর কিছু ভুল ও আজব কৃষি তত্ত্ব জোরপূর্বক প্রয়োগ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:

ঘন রোপণ: তত্ত্ব দেওয়া হয়েছিল যে একই জাতের চারা গাছ একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে না, তাই খুব ঘন করে চারা রোপণ করলে উৎপাদন বাড়বে। বাস্তবে আলো ও বাতাসের অভাবে সব চারা মারা যায়।

মহামারী নির্মূল করতে চারটি অভিযান: মাও সে তুং মাছি, মশা, ইঁদুর এবং চড়ুই পাখি নিধনের ডাক দেন। কিন্তু লাখ লাখ চড়ুই পাখি মেরে ফেলার ফলে ফসলি জমিতে পঙ্গপাল ও ক্ষতিকারক পোকা-মাকড়ের আক্রমণ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা অবশিষ্ট ফসলও ধ্বংস করে দেয়।

ভিন্নমতের দমন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ

১৯৫৯ সালের লুশান সম্মেলনে চীনের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেং দেহুয়াই এই আন্দোলনের ভুলত্রুটি ও গ্রামীণ দুর্ভিক্ষের বাস্তব চিত্র মাও-এর সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু মাও সে তুং সমালোচনা সহজভাবে না নিয়ে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেন এবং আন্দোলন আরও কঠোরভাবে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এর ফলে অন্য কোনো কর্মকর্তা সত্য কথা বলার সাহস পাননি। এর সাথে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চীনের কিছু অঞ্চলে তীব্র খরা এবং হলুদ নদীতে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে। ভুল নীতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই মেলবন্ধনে সৃষ্ট "গ্রেট চাইনিজ ফ্যামিন" বা মহা-দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ মারা যান।


এই চরম ব্যর্থতার পর ১৯৬০ সালের শেষের দিকে চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড বাতিল করতে বাধ্য হয়। কৃষকদের আবার ব্যক্তিগত জমি ফেরত দেওয়া হয় এবং আদর্শের চেয়ে বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে মাও সে তুং সাময়িকভাবে রাষ্ট্রের প্রধান পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং লিউ শাওচি ও ডেং শিয়াওপিং চীনের অর্থনীতি পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৪
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাও সে তুং-এর 'পিপলস কমিউন' ব্যবস্থা যেভাবে ৩-৪ কোটি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬



চীনের আধুনিকায়নে মাও সে তুং-এর নেওয়া সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল কৃষির সমবায়িকরণ এবং "পিপলস কমিউন" ব্যবস্থা, ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার মূল... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার রিসাচ পেপার পাবলিশভ

লিখেছেন মোঃ মােজদুল ইসলাম, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:৩৪

Hailstorm, Rain, Dust The effect of Climate Change in Bangladesh
XXXX
IOSR Journal of Environmental Science, Toxicology and Food Technology
2319-2402
International Organization of Scientific Research
www.iosrjournals.org
Open Access Publishing
Blind Peer Review Process
Indexed Refereed Journal
20
06
10.9790/2402-2006020106 ...বাকিটুকু পড়ুন

সংস্কৃতি হারালে, বাংলাদেশ শুধু মানচিত্রে থাকবে- আত্মায় থাকবে না

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

সংস্কৃতি হারালে, বাংলাদেশ শুধু মানচিত্রে থাকবে- আত্মায় থাকবে না

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধ লাগে না।
তার ভাষা, সাহিত্য, গান, নাটক, ইতিহাস আর সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে দিলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×