somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি অনুসারীর জন্য সিনেমাটি সম্পূর্ণ সম্প্রচার করেন, তখন এটি ব্যাপক আলোচনায় আসে।

গল্পটি একটি ইউরোপীয় শহরকে ঘিরে। সেখানে দেখানো হয় মুসলিম অভিবাসীরা হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ করেও উদারপন্থী শাসনব্যবস্থা ও আইনের ফাঁকফোকরে শাস্তি না পেয়ে পার পেয়ে যায়। কাহিনীটি এরকম: একজন নারী তাঁর সন্তানের সামনে অভিবাসীদের হাতে ধর্ষণ-হত্যার শিকার হন। এরপর শহরজুড়ে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তখন মারদাঙ্গা থ্রিলার গল্পে যেমনটা প্রায়ই দেখা যায়, একজন উদ্ধারকর্তা নায়ক সেই শহরে আসে। তার নাম মাইকেল স্যান্ডার্স, আমেরিকান সাবেক সেনা অফিসার। তিনি বাবার ব্যবসার দায়িত্ব নিতে ইউরোপের সেই শহরে আসেন। শহরটিতে অভিবাসীদের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ। তাঁর ধারণা হয় দেশটির বিচারব্যবস্থা ও সরকার স্থানীয়দের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তিনি নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে অপরাধীদের ধরে ধরে হত্যা করতে বেরিয়ে পড়েন। শুধু অপরাধী নয়, পুলিশ এবং বিচারকদেরও তিনি হত্যা করেন। কারণ, এসব ব্যক্তি অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে প্রকারান্তরে তাদের সহায়তা করেছে, অতএব তারাও অপরাধী।

স্যান্ডার্সের সাথে এক কিশোরীর দেখা হয়, যে ছয়জন অভিবাসীর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিল; কিন্তু মামলার বিচারক অভিযুক্তদের শাস্তি না দিয়ে মুক্তি দেন। বিচারকের যুক্তি ছিল, অভিযুক্তরা ইউরোপীয় সমাজে একীভূত হতে গিয়ে নানা ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে, তাই তাদের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কিশোরী স্যান্ডার্সকে জানায় সে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এরপর স্যান্ডার্স বিচারককে হত্যা করে এবং ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে সাজায়।

সিনেমার শেষদিকের একটি অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। সেই অংশে দেখা যায়, স্যান্ডার্স সন্তানের সামনে সংঘটিত ধর্ষণ ও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেন। ধর্ষক ও হত্যাকারী একজন সিরীয় শরণার্থী, নাম ইউসুফ। স্যান্ডার্স ইউসুফের বাড়িতে যায় এবং তার পরিবারের সবাইকে আটক করে। এরপর ইউসুফের বাবার সঙ্গে তার নিম্নোক্ত কথোপকথন হয়:

স্যান্ডার্স: তুমি কি এই ধরনের শিক্ষা তোমার ছেলেকে দিয়েছ?

ইউসুফের বাবা: আমি তাকে কোরআনের শিক্ষা দিয়েছি এবং পরিবারিক মূল্যবোধ শিখিয়েছি।

স্যান্ডার্স: বেশ, এটাই যদি তোমার মূল্যবোধ হয় যে নারীর পোশাকের কারণে আমেরিকা ও ইউরোপের নারীরা ধর্ষিত হওয়ার যোগ্য, তাহলে তুমি কেন এদেশে এসেছো?

ইউসুফের বাবা: আমার মনে হয়, সেটা (ধর্ষন ও হত্যা) খুবই খারাপ ছিল।

স্যান্ডার্স: আর আমার মনে হয়, তোমরা প্রাচীন ধ্যানধারণা এদেশে সাথে করে নিয়ে এসেছ। গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের চেয়ে ধর্মের প্রতি আনুগত্য তোমাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর স্যান্ডার্স ইউসুফ ও তার পরিবারের সবাইকে - বাবা, মা, ভাই ও বোনকে হত্যা করে।

সিনেমাটি শেষ হয় স্যান্ডার্সের একটা স্বগতোক্তিতে। সেখানে সে বলে, এখন সময় হয়েছে ঘর থেকে বাহিরে এসে দেখিয়ে দেওয়া যে অপরাধ করে এরা যাতে ছাড়া না পায়। স্যান্ডার্সের লড়াই চলতে থাকবে, যতক্ষণ না মানুষ নিজেকে রক্ষার দায়িত্ব নিজেরাই গ্রহণ করে।

সিনেমাটি প্রচারের জন্য ইলন মাস্ক এমন সময় বেছে নিয়েছেন যখন ইউরোপে অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। ইলন মাস্ক যে এই প্রথম এ ধরনের ঘৃণা ও দাঙ্গাকে উসকে দিলেন, তা নয়। অতীতে তিনি বহুবার এমন অপকর্ম করেছেন এবং উগ্র ডানপন্থিদের উসকানি দিয়েছেন।

গত মাসে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে, এক সুদানি শরণার্থীর ছুরিকাঘাতের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উগ্র ডানপন্থীরা বিক্ষোভের ডাক দেয়। সেখানে অভিবাসন-বিরোধী প্রতিবাদ সহিংসতায় রূপ নেয়। ইলন মাস্ক আরেক উগ্র ডানপন্থী টমি রবিনসনের সাথে তখন জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানায়। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই মুখোশধারী জনতা বেলফাস্ট ও তার আশেপাশে অভিবাসীদের বাড়িঘর, যানবাহন এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন ধরিয়ে দেয়।

আরেকটি ঘটনা ঘটে গত সপ্তাহে ডাবলিনে। সেখানে একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

মুসলিম অভিবাসীদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করে তাদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে নায়কোচিতভাবে দেখানোর পেছনে যে কারণগুলো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পাশ্চাত্য সমাজে সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীকরণ এবং সেই সূত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। ট্রিলিয়ন ডলারের অধিকারী ইলন মাস্কের যে ক্ষমতা তা অসামান্য ও অভূতপূর্ব। অতি ক্ষুদ্র ধনী গোষ্ঠীর হাতে যখন বিপুল পরিমাণ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, গণমাধ্যমগত এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতাও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

একদিকে সাধারণ মানুষ প্রবল মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধ এবং এআইকে ঘিরে সম্ভাব্য বেকারত্ব ও হতাশায় নিমজ্জিত, অন্যদিকে সমাজের মোট সম্পদের বড় অংশের মালিকানা অল্প সংখ্যক অতি-ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা এক গভীর খাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের জন্য ইলন মাস্কের মতো অতি-ধনীরা যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হন, সেজন্য এই সংকটের জন্য অভিবাসীরাই দায়ী, এমন একটি বয়ান এবং সেই সাথে দাঙ্গা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে।

মানুষ তাদের অর্থনৈতিক শ্রেণি-পরিচয়ের চেয়ে ধর্ম, জাতি বা বর্ণপরিচয়ের ভিত্তিতে বেশি সংগঠিত হয়। এই প্রবণতা কাজে লাগিয়ে ইলন মাস্কের মতো ক্ষমতাবানেরা শ্রেণিবৈষম্য ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন আড়াল করতে মুসলিম অভিবাসী পরিচয়কে সামনে নিয়ে এসেছে।

এর সাথে আছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইসরায়েলের গণহত্যা ও ধ্বংসলীলা সম্পর্কে পশ্চিমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি। ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হলে পরিকল্পিতভাবে আলোচনা ইসরায়েল থেকে সরিয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এটি ইসরায়েলের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি কৌশল। পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন পুনরুদ্ধারের উপায় হিসেবে উগ্র ইসলাম, শরিয়া ও জিহাদ নিয়ে ভয় তৈরি করা হয়। ইসরায়েলের নীতির সমালোচনার জবাব না দিয়ে মুসলিমদের প্রতি ভয় ও ঘৃণা উসকে দিয়ে জনমত সরিয়ে নেওয়া যায়।

এখন "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি"-এর যে বক্তব্য, সেটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, প্রবলভাবে রাজনৈতিক এবং স্পষ্টতই বর্ণবাদী উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের প্রচার। কিন্তু সংকীর্ণ হলেও এই বয়ানের মধ্যে একটি প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ আছে যা নিয়ে মুসলিম অভিবাসীদের আত্মপর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। প্রশ্নটি হলো, একজন মুসলিম অভিবাসী হিসেবে আমরা কি সত্যিই ধর্মের প্রাচীন ধ্যানধারণাগুলোই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি, নাকি আমাদের সংস্কৃতির ভেতরেও বৈচিত্র্য, ভিন্নতা, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতা রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী নয় বরং সহায়ক?

আমাদের নাগরিক আচরণের মাধ্যমে দেখাতে হবে যে মুসলিম সমাজ একরৈখিক, স্থির ও জড় নয়। এর ভেতরে চিন্তা, সংস্কৃতি ও বহুত্বের বৈচিত্র্য রয়েছে। মুসলিম মানেই দেড় হাজার বছর আগের সামাজিক বিধিবিধানের অনড় অনুসারী নয়। আমাদের মধ্যে পরিবর্তনের সক্ষমতা রয়েছে। মুসলিম অভিবাসী হিসেবে আমার দায়িত্ব হল আমার আচরণ ও সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণ করা যে আমি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং বহুত্ববাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আর এটাই ইলন মাস্ক ও উগ্র ডানপন্থী বয়ানের সবচেয়ে কার্যকর জবাব।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:২৬
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×