somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রথম .........।

০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর ধীরে ধীরে একটা মানুষের পরিচয় হয়ে যায়।
আমার গল্পটাও ঠিক তেমন।২০০৮ থেকে ২০২১ প্রায় এক যুগ আমি মিউজিকের সাথে ছিলাম। এখন পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, ওই সময়টা শুধু গান করা বা ইনস্ট্রুমেন্ট শেখার সময় ছিল না। ওই সময়টা ছিল নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সময়।
আমার প্রথম স্টেজ পারফরম্যান্সের কথাটা এখনো পরিষ্কার মনে আছে।

সেদিন একটা শো ছিল। আমি সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের মতো করে নাচানাচি করছিলাম। মঞ্চে গান করছিলেন আমার বড় ভাইয়ের মতো একজন মানুষ ''আব্দুল্লাহ।''তিনি আমার আপন ভাই ছিলেন না, কিন্তু সম্পর্কের জায়গাটা তার থেকেও অনেক গভীর ছিল। ছোটবেলার অনেকটা সময় তার সাথে কেটেছে। তিনি ছিলেন আমার মিউজিকের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা।উত্তরবঙ্গের মানুষ তাকে "জেমস" নামে চিনতো। তার নিজের একটা পরিচয় ছিল, নিজের একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল।সেদিন আমি শুধু একজন দর্শক ছিলাম।
কিন্তু হঠাৎ করেই মঞ্চ থেকে তিনি মাইকে বললেন,"এবার গান গাইবে..."তারপর আমার নাম বললেন।
সত্যি বলতে, ওই মুহূর্তের জন্য আমি একদম প্রস্তুত ছিলাম না। কয়েক হাজার মানুষের সামনে দাঁড়ানো এটা কখনো কল্পনাও করিনি।কিন্তু কিছু মুহূর্ত আসে, যেখানে ভয় আর চিন্তা করার সময় থাকে না।আমি মঞ্চে উঠলাম।প্রায় ৩ হাজার মানুষের সামনে প্রথমবার গান করলাম।আর সেদিনই হয়তো বুঝেছিলাম মঞ্চ আমার জন্য কোনো ভয় পাওয়ার জায়গা না।বরং মঞ্চ এমন একটা জায়গা, যেখানে আমি নিজেকে সবচেয়ে বেশি খুঁজে পাই ।

তারপর শুরু হলো আসল যাত্রা।গিটার শেখা, কিবোর্ড বাজানো, বেস গিটার একটার পর একটা নতুন জগৎ খুলতে লাগলো।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে আমি থেমে গেলাম ড্রামের কাছে।কেন জানি না, ড্রামের সাথে একটা আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। মনে হতো, এটা শুধু একটা ইনস্ট্রুমেন্ট না এটা আমার ভেতরের রাগ, কষ্ট, আনন্দ, সবকিছুর একটা প্রকাশ।
প্রথম দিকে কমার্শিয়াল মিউজিক করলেও ধীরে ধীরে আমি ঢুকে গেলাম আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিকের জগতে।
আর সেখানে গিয়ে যেন নিজের আসল জায়গাটা খুঁজে পেলাম।
সেই সময় Chris Adler এর ড্রামিং আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার বাজানোর প্যাটার্ন, পাওয়ার, টাইমিং আর এনার্জি আমাকে মুগ্ধ করতো।আমি প্রায় সবসময় তাদের গান কভার করতাম। ধীরে ধীরে সেই influence আমার নিজের বাজানোর স্টাইলের মধ্যে চলে আসে। আমার ব্যান্ডের অন্য সদস্যরাও সেই গানগুলো কভার করতো।
আসলে একজন মিউজিশিয়ানের জীবনে কিছু মানুষ আসে, কিছু ব্যান্ড আসে যারা তার চিন্তা করার ধরনটাই বদলে দেয়।
আমার জন্য সেই সময়টা ঠিক তেমন ছিল।
ড্রামের journey শুরু হয়েছিল Di-Illumination ব্যান্ডের মিঠু ভাইয়ের কাছে। প্রথম তিন মাস তার কাছ থেকে শেখাটা ছিল আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর শেখার সুযোগ হয়েছিল Niyaz Kamran Abir ভাইয়ের কাছে। উনি কিছুদিন Artcell এর সাথেও বাজিয়েছিলেন। খুবই সেন্সিবল একজন মিউজিশিয়ান এবং তার থেকেও বড় কথা, একজন ভালো মানুষ।
কিন্তু মিউজিক শুধু শেখা আর বাজানোর গল্প না।
মিউজিকের সাথে জড়িয়ে থাকে মানুষ। জড়িয়ে থাকে স্মৃতি।

২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটা তারিখ যেটা আমার জীবনের গল্পের একটা বড় অংশ।সেদিন আব্দুল্লাহ ভাই মর্মান্তিকভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যান।তিনি খুন হন।সেদিন বিকেলেও আমাদের শো ছিল, শেষ শো আর করা হয়নি তার সাথে। যে মানুষটা আমাকে প্রথম মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছিল, যে মানুষটা আমার চোখে একজন inspiration ছিল তার চলে যাওয়া একটা শূন্যতা তৈরি করেছিল।কিছু মানুষ জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য থাকে, কিন্তু তাদের প্রভাব থেকে যায় সারাজীবন।
প্রায় ৪ বছর হয়ে গেছে কোনো শো করা হয় না।
মাঝে মাঝে পুরোনো ছবিগুলো দেখি। প্রথম শোয়ের ছবিটা দেখলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়।
মনে হয়, সেদিন যেন আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না।
আমি শুধু একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর মিউজিক আমাকে চালাচ্ছিল।স্টেজে বাজানোর অনুভূতি আসলে ভাষায় বোঝানো কঠিন।যখন সামনে একদল উন্মাদ তরুণ-তরুণী মাথা নাড়ছে, হেডব্যাং করছে, আর তোমার চার হাত-পায়ের প্রতিটা stroke গিয়ে মিশছে সেই মুহূর্তের সাথে তখন একটা অদ্ভুত শান্তি আসে।
একটা feeling আসে, যেটা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।তখন মনে হয়,
"Yes… this is where I belong."কারণ মঞ্চ শুধু একটা জায়গা না।মঞ্চ হলো সেই জায়গা যেখানে তুমি পৃথিবীকে দেখাতে পারো তুমি আসলে কে।
The stage is not where you perform.
The stage is where you reveal yourself.
একটা হঠাৎ পাওয়া মাইকের ডাক থেকে শুরু হওয়া গল্প।একজন মিউজিকের মানুষের অনুপ্রেরণা থেকে শুরু হওয়া গল্প।
একটা ড্রামের শব্দের মধ্যে নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার গল্প।আর হয়তো কোনো একদিন আবার সেই আলো জ্বলবে, সামনে মানুষ থাকবে, আর চারটা stroke আবার বলে উঠবে
আমি এখনো এখানেই আছি।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৮
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ১৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯



বিএনপি সরকার দেশে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই দেশে প্রতারকের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
প্রতারক সব আমলেই ছিলো। কিন্তু বিএনপির আমলে যেন প্রতারকের উৎসব শুরু হচ্ছে। দেশে বেড়ে গেছে মারামারি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘স্বর্ণামতি সেতু’ থেকে

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ৩০ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯



আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। তার একটা আদুরে নাম আছে, ‘স্বর্ণামতি’। কে, কবে, কেন নদীটির এ নাম দিয়েছে, তা আমার অজানা। তবে নামটি আমার খুবই প্রিয়। এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষড়যন্ত্রঋতু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:২৯

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সারাবছরই ঐক্যের ঋতু, এখানে রাজনীতিতে শত্রু না থাকলে মিত্র টেকে না। যতদিন হাসিনা ছিল, স্বাধীনতাবিরোধীরা ছিল একটি সুখী পরিবার। বাম জানত ডানকে ঘৃণা করতে হয়, কিন্তু আপাতত স্থগিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পছন্দের বাংলা গানগুলো

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১১


অনেকদিনের ইচ্ছে পছন্দের বেশকিছু গান নিয়ে একটা পোস্ট দেব। দেওয়া হয়নি, কারণ, বিষয়টা সময়সাপেক্ষ। আজ হুট করে বসেই পড়লাম। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুলগীতি, লালনগীতিসহ নানান ধরনের গানের একটা তালিকা করছি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×