বাংলাদেশের রাজনীতিতে সারাবছরই ঐক্যের ঋতু, এখানে রাজনীতিতে শত্রু না থাকলে মিত্র টেকে না। যতদিন হাসিনা ছিল, স্বাধীনতাবিরোধীরা ছিল একটি সুখী পরিবার। বাম জানত ডানকে ঘৃণা করতে হয়, কিন্তু আপাতত স্থগিত। ডান জানত বামকে সহ্য করা যায় না, কিন্তু আপাতত মুলতবি। রাজাকার জানত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম শুনলে গা জ্বলে, কিন্তু আপাতত চাপা দেওয়া, এতটাই চেপে যাওয়া যে নিজেরাই মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হতে চাওয়া। একটা অদৃশ্য আঠা ছিল। সেই আঠার নাম 'ক্ষমতার বাইরে থাকার যন্ত্রণা'। সেই আঠা উঠে গেলে কী হয়—সেটা এখন দেখা যাচ্ছে। বামেরা আবিষ্কার করেছে যে ডানেরা আসলে ফ্যাসিস্ট। ডানেরা আবিষ্কার করেছে যে বামেরা আসলে ভারতের দালাল। মাঝখানের "নিরপেক্ষ" বুদ্ধিজীবীরা আবিষ্কার করেছে যে আসলে সবাই খারাপ—এই আবিষ্কারটি তারা প্রতি ছয় মাস অন্তর করে থাকেন, প্রতিবার নতুনভাবে।
অর্ওয়েলের উনিশশো চুরাশী (Nineteen Eighty-Four)তে একটি দৃশ্য আছে—জনসভায় বক্তৃতা চলছে, হঠাৎ শত্রু বদলে গেল। গতকাল যে ইউরেশিয়া শত্রু ছিল, আজ সে মিত্র। ইস্টেশিয়া গতকাল মিত্র ছিল, আজ চিরশত্রু। জনতা বিভ্রান্ত হলো না। জনতা সাথে সাথে মানিয়ে নিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক জনতাও এই প্রতিভায় কম যায় না। হাসিনা ফিরলে বামেরা আবারও 'গুপ্ত বিহারীভাষীদের কথাকেই' পুলিশ বা আধিপত্যবাদী ভারতীয় চরের 'হিন্দি বলার গুজব হিসেবে ছড়াবে'। তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা কমিটি নতুন ব্যানার বানাবে—পুরনো ব্যানারের কালি শুকানোর আগেই। আনু মোহাম্মদ মানববন্ধনের তারিখ ঠিক করবেন, ব্যানার ব্যবসায়ীরা অগ্রিম অর্ডার নেবে। ডানেরা আবিষ্কার করবে যে, 'ধর্মহীনতা'কে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' বলে চালানো সেকুলারিজম আসলে একটি ষড়যন্ত্র। মধ্যপন্থীরা আবিষ্কার করবে যে তারা আসলে কখনো কাউকে সেইঅর্থে সমর্থন করেননি—"শুধু ন্যায়বিচারের কথা বলেছে।" সবচেয়ে পরিশ্রমী হবে "নিরপেক্ষ" পক্ষ। তারা দ্রুত খুঁজে বের করবে যে হাসিনার আমলে কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন। নিপীড়নের, অবিচারের, নীরবে সহ্য করার স্মৃতি উদ্ধার করতে না পারলে উদ্ভাবন করা হবে।
আর এই স্মৃতিগুলো গত দুই বছর কোথায় ছিল, সেই প্রশ্ন কেউ করবে না। করা অভদ্রতা। পশুর ভাগাড়ে শুয়োরদের রাজনীতির শত্রু বদলায়। আঠা বদলায় না।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



