সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয় না। এটা একটি সিস্টেম। মিডিয়ার নীরবতা কাকতালীয় নয়, কাঠামোগত। অর্ওয়েল পশুর খামার (Animal Farm) বইয়ে দেখিয়েছিলেন, ইতিহাস লেখে ক্ষমতাবানরা। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মানচিত্রেও এই নিয়মটি কাজ করে—তবে একটু ভিন্নভাবে। এখানে নীরবতাটা সবসময় সরাসরি নির্দেশে আসে না। এটা আসে প্রণোদনার কাঠামো থেকে। কোন খবর "গুরুত্বপূর্ণ" সেটা ঠিক হয় কে বিজ্ঞাপন দেয়, কার সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে, কোন পক্ষ নেওয়া নিরাপদ—এই হিসাবে। একটি তরুণের মৃত্যু যদি কোনো "পক্ষের" আখ্যানকে জটিল করে তোলে, তাহলে সেই মৃত্যুটি প্রায়ই সংবাদ হয় না। এটা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটা রাজনৈতিক অর্থনীতির ফলাফল।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা পক্ষপাতদুষ্ট; তবে বুদ্ধিজীবীদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতাই হলো—তারা যে রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যে সমাজের অংশ, যে পুরস্কার ও স্বীকৃতির ব্যবস্থার মধ্যে থাকে—সেই কাঠামোর বাইরে যাওয়া তাদের পক্ষে কঠিন। এটা কপটতা হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় এটা শুধু মানবিক দুর্বলতা—সাহসের অভাব, অভ্যাসের জড়তা, বা সত্যিকারের অসচেতনতা। সৎ সমালোচনার জন্য এই পার্থক্যটা করা দরকার। কারণ "সবাই একই রকম খারাপ" বললে সমস্যার সমাধান হয় না, সমস্যা আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়।
রাজনৈতিক সহিংসতার প্রশ্নটা আসলে কোথায়? এনামুল মোল্লার মৃত্যু—এবং গত দুই বছরে এরকম আরও যে মৃত্যুগুলো হয়েছে—সেগুলো একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হত্যা করা যাবে কিনা। এই প্রশ্নের উত্তর "না" হওয়া উচিত—এবং এই "না"টি সার্বজনীন হওয়া উচিত, শর্তসাপেক্ষ নয়। যে সমাজে "আমাদের লোক" মরলে প্রতিবাদ হয়, "ওদের লোক" মরলে নীরবতা থাকে—সেই সমাজে সহিংসতার চক্র কখনো থামে না। কারণ প্রতিটি পক্ষই নিজের নীরবতাকে ন্যায্য মনে করে এবং অন্যের নীরবতাকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে। অর্ওয়েল এই সমস্যাটির নাম দিয়েছিলেন 'দুমুখোচিন্তা' (doublethink)—একই সময়ে দুটো পরস্পরবিরোধী বিষয়কে সত্য বলে মানার ক্ষমতা। আমরা একসাথে বিশ্বাস করি যে, সহিংসতা খারাপ, এবং যে, আমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সহিংসতা ন্যায্য। এই দ্বিমুখীচিন্তা ভাঙা না গেলে এনামুল মোল্লারা গণনায় আসবে না—আজও না, ভবিষ্যতেও না, কখনোই না।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


