আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত তিন দশকে নিঃশব্দে সম্পন্ন হয়েছে, এই কাজটি করেছে কিছু লিল্লাহখোর মিসকিন সম্প্রদায়।
প্রথমে গেল সিনেমা হল। সারা পৃথিবীতে সিনেমা শিল্প টিকিয়ে রাখে শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাওয়ালা, হকার, দিনমজুর—সপ্তাহের শেষে একটি অন্ধকার হলে বসে আলোকিত পর্দার সামনে ঘন্টাদুয়েক। এটা বিলাসিতা নয়, এটাও শ্বাস নেওয়া। বাংলাদেশে এই শ্বাস নেয়া বন্ধ হয়েছে। মোবাইল আসার কারণে নয়—মোবাইল এসেছে সারা পৃথিবীতে, হলিউড-বলিউড তবু চলছে। বাংলাদেশে হল বন্ধ হয়েছে কারণ হলে যাওয়াটাকে ধীরে ধীরে লজ্জার বিষয় বানানো হয়েছে। মানুষ মোবাইলে দেখে—একা, চুপচাপ, লুকিয়ে। পাপবোধ নিয়ে। পাপবোধ নিয়ে উপভোগ করা আনন্দ মাটি হয়। তারপর গেল লোকগান। বাউল, পালাগান, জারিসারি—এগুলো বিনোদন না শুধু। এগুলো বাংলাদেশের মাটির নিজস্ব দর্শন। দেহতত্ত্ব, মানবতা, প্রশ্ন করার সাহস—সবই আছে গানে। এই গানকে হারাম ঘোষণা করা সহজ ছিল, কারণ রাষ্ট্র বাধা দেয়নি। জেলা প্রশাসন মঞ্চ ভেঙে দিয়েছে, পুলিশ শিল্পীদের তুলে নিয়ে গেছে—এবং কেউ প্রতিবাদ করেনি, কারণ প্রতিবাদ করলে নিজেও 'হারামের পক্ষে' হয়ে যায়। এখন এরা পড়বে খেলাধুলার পেছনে। বিগত জঙ্গী সরকার ক্রিকেটের সর্বনাশ করার সর্বাত্ম চেষ্টা করেছে, মেয়েদের ফুটবলকেও আক্রমণ করেছে। খেলার সময় টেলিভিশনের সামনে ভিড়—তখন সেটা আর নিছক খেলা না। এটা সম্মিলিত আনন্দের বিরল মুহূর্ত। সম্মিলিত আনন্দ বিপজ্জনক। কারণ যে মানুষ একসাথে আনন্দ করতে পারে, সে একসাথে প্রতিবাদও করতে পারে।
অর্ওয়েলের 'উনিশশো চুরাশী'তে পার্টি নিয়ন্ত্রণ করত মানুষের যৌনতা, সৌন্দর্যবোধ, এবং স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দকে—কারণ আনন্দ মানুষকে স্বাধীন রাখে। ভয় মানুষকে বাধ্য রাখে, কিন্তু আনন্দ-বঞ্চিত মানুষ নিজেই নিজের কারাগার তৈরি করে। বাংলাদেশে এই কারাগার তৈরি হচ্ছে স্বেচ্ছায়। রাষ্ট্র নির্দেশ দেয়নি—'তৌহিদী জনতা' নামক অসভ্যরা নিজেই নিজেদেরকে বলছে: এটা দেখো না, ওটা শোনো না, এখানে যেও না। যে সমাজ নিজের আনন্দকে ভয় পায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে এমন একটি জায়গায় পৌঁছায় যেখানে ক্রোধই একমাত্র অনুমোদিত আবেগ হয়ে ওঠে। ক্রোধ দিয়ে সভ্যতা হয় না। ক্রোধ দিয়ে হয় শুধু আগুন। আর মানবজাতির নতুনকরে আর আগুন আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই, গুহামানব অনেক আগেই সে কাজ করে ফেলেছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



