somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি, ঘুমিয়ে গেছে। এবং ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেছে—কীভাবে ফিরে আসা যায়। অর্ওয়েলের 'পশুর খামারে'ও পুরনো শাসন ফিরে আসে নতুন মুখে। শূকররা মানুষ হয়ে যায়, মানুষরা শূকর—কিন্তু খামারের কাঠামো একই থাকে।

বাংলাদেশেও এই রূপান্তর ঘটেছে। মুসলিম লীগ ফিরে এসেছে জাসদ হয়ে, ভাসানী হয়ে, ইসলামী সমাজতন্ত্র হয়ে। সবচেয়ে চতুর রূপান্তরটি হয়েছে বাম পরিচয়ে। কারণ বামের তকমা সন্দেহ কমায়। কিন্তু এদিকে আবার চীনের চোখে ভাসানী ছিলেন "রেড মাওলানা"—লাল আর সবুজের যে মিশ্রণ, সেটা না লাল না সবুজ। সাদ্দাম, গাদ্দাফি, ভুট্টো—সবার সমাজতন্ত্রের গোড়া ছিল একই জায়গায়। ইসলামী শাসনতন্ত্রকে ইসলামী সমাজতন্ত্রের নাম দেয়া এই আদর্শের ধারাবাহিকতা লুকানোর চেষ্টা করা যায়, মুছে ফেলা যায় না।

আওয়ামী লীগের জন্মের গল্পটি নামের রাজনীতির এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। পাকিস্তান তৈরির পর পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গের নেতাদের বাদ দিল। কারণ, সন্দেহ—এদের রবীন্দ্রসংগীত আছে, লালন আছে, বৈশাখ আছে, বাংলা ভাষা আছে। এই মুসলমানদের মুসলমানিত্ব যথেষ্ট নিখাঁদ নয়। বাদ পড়া নেতারা নতুন দল করলেন। নামে "মুসলিম" রাখা নিয়ে প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল—পরে সেটা বাদ গেল। দলটি মৃদু বামঘেঁষা, কংগ্রেস ঘরানার, সংসদীয় গণতান্ত্রিক হয়ে উঠল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করল। কিন্তু ভেতরে মুসলিম লীগের অংশ থেকেই গেল। খন্দকার মোশতাক তার প্রতিনিধি। ১৯৭৫ সালে সেই অংশটি মুখ দেখাল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজারে একাত্তরের পরাজিত আদর্শ আবার ফিরে এসেছে—এবার আরো বাহারি পোশাকে। কেউ "বিপ্লবী", কেউ "সংস্কারক", কেউ "মুক্ত সাংবাদিক"। নতুন মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো রাতারাতি আলাদিনের চেরাগের মতো আবির্ভূত হয়েছে। অর্থের উৎস অস্পষ্ট, আদর্শ পরিচিত। জিন্নাহকে "বাপ" ডাকা, রবীন্দ্রনাথ-বিরোধিতা, উর্দুপ্রেম—এগুলো নতুন ভাষায় পুরনো গান।

তারপর এখন আবার এদের মধ্যেই গৃহযুদ্ধ। এরাই একে অপরকে "দালাল" বলছে। এদেরই কেউ কেউ এখন 'মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকার নাটক' করে বলছে প্রথম আলো মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকারীদের প্রতি "নরম"। অথচ প্রথম আলোই ছিল এই সবার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচনকারী, প্রথম আলোই এই সবকটা জঙ্গীর পাঠশালা। ইউনুস প্রথম আলোর পণ্য, আলী রীয়াজ প্রথম আলোর পণ্য। এটা অর্ওয়েলের পশুর খামারের শেষ দৃশ্য। শূকর আর মানুষ মুখোমুখি বসে তাস খেলছে—বাইরে থেকে আর পার্থক্য করা যাচ্ছে না। এবং তারাই একে অপরকে প্রতারক বলে অভিযোগ করছে।

মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই আন্দোলনকারীদের অন্তর্ভুক্তি নতুন একটি বিস্ময়কর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পরিচয় বিকৃতকারী আঘাত। মন্ত্রণালয়ের নামটি লক্ষ্য করুন। "মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়"—যে নামে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি ছিল, সেই নামের ছাদের নিচে ২০২৪ সালকে আনা হলো। অর্ওয়েলের 'উনিশশো চুরাশী'তে সত্য মন্ত্রণালয়ের (মিনিস্ট্রি অব ট্রুথ) কাজ ছিল ইতিহাস পুনর্লিখন। বাংলাদেশে সেই কাজটি আরও সূক্ষ্মভাবে হচ্ছে—শুধু ইতিহাস মুছেই নয়, ইতিহাসের ভেতরে নতুন অধ্যায়ও ঢুকিয়ে দিয়ে। এই দুটো সালকে সমান করার চেষ্টায় একই মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত করার মানে দুটোরই মান পরিবর্তন করার মত এক ঢিলে দুই পাখি—১৯৭১ ছোট হয়, এবং ২০২৪ও মিথ্যা মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

মুসলিম লীগ ৭০ সালে পরাজিত হয়েছিল কারণ তার রাজনৈতিক প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু যে সামাজিক ভিত্তির উপর সে দাঁড়িয়েছিল—ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার—সেটা ব্যর্থ হয়নি। এটাই পরাজিত আদর্শের টিকে থাকার রহস্য। আদর্শ তখনই মরে যখন তার সামাজিক ভিত্তি মরে। ভিত্তি টিকে থাকলে আদর্শ শুধু ঠিকানা বদলায়। বাংলাদেশে সেই ভিত্তি টিকে আছে। তাই মুসলিম লীগ বারবার ফিরে আসে—কখনো লাল পতাকায়, কখনো ডিজিটাল নিউজপোর্টালে, কখনো বিপ্লবের ভাষায়। নামটা নতুন। গানটা পুরনো।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা ভয়ংকর

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



বাঙালির উদরঘাটতি থাকলেও উৎসবে সদা মশগুল!
দ্যাশ নতুন কইরা স্বাধীন হইছে গো!
রঙবেরঙে পতাকায় বিলুপ্ত স্বজাতির মানচিত্র!

শুধু পতাকায় সীমাবদ্ধ নেই!
মনে হচ্ছে পাল্টে গেছে জাতীয়তা!
মধ্যরাতে ভেঙে যায় সুনিদ্রা কর্কশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×