somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

ইরানে দরীদ্রদের হাতে নগদ টাকা পৌঁছানোর নীতি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইরানের ২০১০ সালে প্রবর্তিত 'টার্গেটেড ক্যাশ ট্রান্সফার' বা সরাসরি গরিবের হাতে নগদ টাকা পৌঁছানোর নীতিটি বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সাহসী পরীক্ষা হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও এই কর্মসূচির প্রাথমিক সফলতার উচ্চ প্রশংসা করেছে।

নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যস্ফীতির মাঝেও এই অনন্য নীতিটি যেভাবে কাজ করছে এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক দারিদ্র্য দূর করেছে, তার বিশদ বিবরণ আমাদের জানা প্রয়োজন।


ঢালাও ভরতুকি থেকে নগদ অর্থে রূপান্তর

২০১০ সালের আগে ইরান সরকার দেশের তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি এবং রুটির মতো মৌলিক পণ্যগুলোতে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ভরতুকি দিত। এর ফলে দেশের ধনী শ্রেণী (যাদের একাধিক গাড়ি বা বড় বাড়ি ছিল) সস্তা জ্বালানির সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করতো, আর গরিবরা পেতো নামমাত্র সুবিধা। ইরান সরকার এই অন্যায্য ও ঢালাও ভরতুকি রাতারাতি তুলে দেয় এবং জ্বালানির দাম মুক্ত বাজারের মূল্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এর ফলে সরকারের হাতে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল বেঁচে যায়, তা সরাসরি দেশের সাধারণ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থ হিসেবে ভাগ করে দেওয়া শুরু হয়।



সর্বজনীন এবং সরল ব্যাংকিং সিস্টেম

এই নীতিটি সফল করার জন্য ইরান সরকার দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। তখন পর্যন্ত দেশের একটি বড় অংশের দরিদ্র মানুষের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না।

বাস্তব পদক্ষেপ: সরকার প্রতিটি পরিবারের প্রধানের জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বাধ্যতামূলক করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দেশের ৯৫% এরও বেশি নাগরিককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা হয়, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য একটি রেকর্ড। প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে সরকার সরাসরি এই অ্যাকাউন্টগুলোতে নগদ রিয়াল (ইরানি মুদ্রা) জমা করে দেয়, যার ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা কোনো দুর্নীতি ছাড়াই শতভাগ টাকা প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছায়।


গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন

শহরের মানুষের তুলনায় এই সরাসরি নগদ অর্থ গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবনে অলৌকিক পরিবর্তন এনেছিল।
আয়ের সমতা: ২০১০ সালে যখন এই স্কিম শুরু হয়, তখন প্রতি মাসে একজন নাগরিককে ৪৫,৫০০ রিয়াল (তৎকালীন মূল্যে প্রায় ৪০ মার্কিন ডলার) দেওয়া হতো। চার-পাঁচ জনের একটি দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্য এই মাসিক আমানতটি ছিল তাদের প্রথাগত কৃষি আয়ের চেয়েও অনেক বেশি। এর ফলে গ্রামীণ অঞ্চলের পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাবার কেনা, সন্তানদের শিক্ষা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবার পেছনে ব্যয়ের সামর্থ্য লাভ করে, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য সূচক এক ধাক্কায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসে।


শ্রমবাজার ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর ইতিবাচক প্রভাব

সমালোচকরা শুরুতে দাবি করেছিলেন যে, ঘরে বসে বিনামূল্যে টাকা পেলে মানুষ অলস হয়ে যাবে এবং কাজ করা ছেড়ে দেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় দেখা গেছে এই ধারণাটি ভুল ছিল।

ব্যবসায়িক পুঁজি: ইরানের দরিদ্র ও মাঝারি আয়ের মানুষেরা এই নিশ্চিত মাসিক ক্যাশ ট্রান্সফারের টাকা জমিয়ে গ্রামীণ এলাকায় ছোট ছোট হাঁস-মুরগির খামার, হস্তশিল্প, টেইলারিং বা ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করে। এই নিয়মিত অর্থ প্রবাহ গ্রামীণ বাজারে তারল্য বা ক্যাশ ফ্লো সচল রাখে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলে।



বর্তমান ২০২৬ সালের বাস্তবতা ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ

যদিও এই নীতিটি প্রথম কয়েক বছর ইরান থেকে চরম দারিদ্র্য দূর করতে শতভাগ সফল হয়েছিল, তবে বর্তমান ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং এর ফলে সৃষ্ট উচ্চ অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির কারণে নগদ টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরানের বর্তমান রাষ্ট্রনায়করা নীতিটি আরও আধুনিক করেছেন। এখন ধনী ও উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোকে এই তালিকা থেকে বাদ দিয়ে কেবল সমাজের সর্বনিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত (B40 গ্রুপ) নাগরিকদের চিহ্নিত করে তাদের ভাতার পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সাথে নগদ টাকার পাশাপাশি দরিদ্রদের জন্য 'ইলেকট্রনিক ফুড স্ট্যাম্প' বা ডিজিটাল খাদ্য রেশন কার্ডের সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে মূল্যস্ফীতির বাজারেও গরিব মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বজায় থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮
৭টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের রসায়নবিদ

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


লেখকের নোট:
এই গল্পের পটভূমি ১৯৭৭ সালের ঢাকায় সংঘটিত জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×