somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিউইয়র্কের ডায়েরী ২: এভাবেই জীবন কেটে যাচ্ছে জীবনের নিয়মে

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


লং আইল্যান্ডের একটি রাসবেরি ফার্মে গত সপ্তাহে

এক লোক একটা মাছি মারার জন্য পেপার গোল করে তাড়া করছে। মাছিটি উড়ে গিয়ে দেয়ালে বসল। লোকটা যেই মারতে যাবে, মাছিটি হাতজোড় করে বলল, “দয়া করে আমাকে মারবেন না! আমার একটা শেষ ইচ্ছা আছে।” লোকটি অবাক হয়ে বলল, “কী ইচ্ছা?” মাছি বলল, “আমি মরার আগে একবার শেষবারের মতো আপনার টাক মাথায় বসে পিছলে পড়ার আনন্দ নিতে চাই!” লোকটি মন খারাপ করল, সামান্য মাছিটা তার সাথে মশকরা করছে, ভাবা যায়! সন্ধ্যা তখন, কিন্তু ক্ষুধায় পেট চো চো করছে, তিনি রেস্তোরাঁয় ঢুকে স্যুপ অর্ডার করলেন। স্যুপ আসার পর সে দেখল ভেতরে একটা মাছি ভাসছে। তার চান্দি এমনিতেই মাছির মশকরায় গরম ছিল, এবার আরো রেগে গিয়ে ওয়েটারকে ডাকল, “এই যে ভাই, এদিকে আসুন! আমার স্যুপের কাপে এই মাছিটা কী করছে?” ওয়েটার কাপের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলল, “স্যার, আমার তো মনে হচ্ছে ও ব্যাকস্ট্রোক সাঁতার কাটছে!” স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন "জীবে দয়া করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর"। স্বামী বিবেকানন্দের কথায় মাছিটিকে ক্ষমা করা ঠিক হয়নি, বেটা তার পিছু নিয়ে তার স্যুপে সাঁতার কাটছে, একেই বোধ হয় বলে "যে পাতে খায়, সে পাতেই ছিদ্র করে" !

ভদ্রলোক একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওয়েটারকে ডেকে এক কাপ গরম চায়ের অর্ডার দিলেন। চুমুক দিতে গিয়ে পড়লেন বিপদে, দেখলেন সেই মাছি চায়ে চুমুক দিচ্ছে! তিনি পুনরায় ওয়েটারকে ডেকে বললেন, “শোনেন! আমার চায়েও মাছিটি বসে চা খাচ্ছে।” ওয়েটার মাথা চুলকে বললেন, “তাহলেই বুঝে নেন স্যার, মাছিটা পর্যন্ত টের পেয়েছে এটা কত ভালো চা!” ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে টাকা দিয়ে বাসায় চলে গেল। রাতে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মাছি নিয়ে চিন্তা করছিলেন। স্ত্রী ঘরে ঢুকে তাকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, তুমি কী করছ?” ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে বলল, “মাছি মারছি।” স্ত্রী কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল, “বাহ! কয়টা মারলে?” লোকটি জবাব দিল, “মোট ৫টা—এর মধ্যে ৩টা পুরুষ আর ২টা স্ত্রী মাছি।” স্ত্রী অবাক হয়ে বলল, “কী করে বুঝলে কোনটা পুরুষ আর কোনটা স্ত্রী?” লোকটি টাক মাথা হাতরাতে হাতরাতে মুচকি হেসে বলল, “সহজ হিসাব! ৩টা মাছি মদের বোতলে বসেছিল, আর ২টা বসেছিল মোবাইলে!”

যাইহোক, মাছি নিয়ে অনেক আজাইরা আলাপ হলো। এবার মূল বিষয়ে আসা যাক। আমার আগের লেখায় বলেছিলাম, সামারের এই ছুটিতে নিউইয়র্কে এসেছি কিছু এক্সট্রা মালপানি কামানোর জন্য। বউ-ছেলেকে দেশে পাঠিয়ে আমি সত্যিকার অর্থেই মাছি মারছি! গতকাল শুক্রবার ছিল। আমি বলেছিলাম, শুক্রবার আমার পকেট গরম থাকে—ল্যাব থেকে বেতন পাই প্রতি শুক্রবার। পকেটে মাল থাকলে ভালো লাগে! তাই গতকাল একটি তুর্কি রেস্টুরেন্টে গিয়ে আদানা কাবাব উইথ রাইস খেলাম—এটা আমার প্রিয় খাবার। বাসায় ফিরে সন্ধ্যায় খেলা দেখতে বসেছি আর্জেন্টিনার, তখন ঘরে মনে হলো মাছির মেলা বসে গেছে! নিউইয়র্কে এক মাস হয়ে গেল, এত মাছি একসাথে দেখিনি, মনে হচ্ছিল মাছিরা আন্দোলনে নেমেছে! আমি সত্যিকার অর্থেই গুনে গুনে পনের থেকে বিশটি মাছির সান্ডে-মান্ডে ক্লোজ করলাম। যারা নিয়মিত মাছি মারেন তারা বুঝবেন কর্মটি এত সহজ না। কিন্তু কথায় আছে, “যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে—জয় হবেই হবে!”

এতগুলো মাছি মেরে কিছুটা খারাপও লাগল। আবার মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, কার মরন যে কার হাতে লেখা থাকে, সেটা উপরওয়ালা ছাড়া কে বলতে পারে? হয়তো এই মাছিগুলোর মৃত্যু আমার হাতেই ছিল। মাছির মৃত্যুতে “ইন্না লিল্লাহ” বলা জায়েজ কি না জানি না, যদি থাকে তাহলে ইন্না লিল্লাহ। যাইহোক, কোনোভাবেই মনকে শান্ত করতে না পেরে মাছি নিয়ে একটু পড়াশোনা করতে লাগলাম। মাছি গড়ে পনের থেকে ত্রিশ দিন বাঁচে। অর্থাৎ প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী একটি মাছি ২৪ ঘণ্টা বাঁচে, এমন কোনো সহি বিজ্ঞান নেই! তবে খাদ্য ছাড়া মাছি দুই থেকে তিন দিনের বেশি বাঁচতে পারে না। তবে এজন্য মাছিরা "ছোট্ট একটা জীবন নিয়ে পৃথিবীতে কেন আসা?" ইত্যাদি গান গেয়ে সময় অপচয় করে না। বরং এই স্বল্প জীবনে প্রায় পাঁচশোটি ডিম পেড়ে নিজের বংশগতির ধারা বজায় রাখে।

মাছির ব্রেইন ছোট, মাত্র লাখ খানেক নিউরন, যেখানে মানুষের ব্রেইনে প্রায় ছিয়াশি বিলিয়ন নিউরন। তাই মানুষের কনশাসনেস আছে, আমরা চিন্তা করতে পারি, রাগ, দুঃখ, অভিমান, ভয় সব অনুভব করি। মাছিদের সেরকম “মাছিবীয়” আবেগ নেই। তাদের কনশাসনেস বলতে আমরা যা বুঝি, তা তাদের নেই। তাদের রাগ, অভিমান, কষ্ট ইত্যাদি নেই বলেই ধরা হয়। অনেকটা মেশিনের মতো চলে—বায়ো সেন্সরের মতো, খাদ্য ডিটেক্ট করে গ্রহণ করে, কেউ মারতে এলে সেন্সর তাকে সরতে বলে। এখানে ভয় বা আতঙ্কের মতো কিছু নেই—অনেকটা রোবট বা এআইয়ের মতো। আমরা এআইয়ের সাথে কথা বলি, কিন্তু এআই ইমোশন প্রসেস করতে পারে না। যদিও ভবিষ্যতে যদি কনশাসনেস দেওয়া সম্ভব হয়, সেটা হবে কি না আমরা জানি না। যাইহোক, মাছিতে ফিরে আসি। মাছির ব্রেইন ছোট হলেও তাদের কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা আছে—যা আমাদের নেই। তাদের ব্রেইন আমাদের তুলনায় প্রায় দশ গুণ দ্রুত প্রসেস করে। আমাদের ব্রেইন সেকেন্ডে প্রায় ৩০ ফ্রেম প্রসেস করে, মাছি পারে প্রায় ৩০০ ফ্রেম। অর্থাৎ তারা পৃথিবীকে স্লো মোশনে দেখে। ভাবুন, আপনি এমন এক পৃথিবীতে আছেন যেখানে আপনি ছাড়া সবকিছু স্লো মোশনে চলছে, অনেকটা ডিসি সুপার হিরো ফ্লাশের মত!

নিউইয়র্কে এসেছি পকেট ভারি করতে। এখন দেখা যাচ্ছে মাছি নিয়ে পড়ে আছি, আর সত্যিই মাছি মারছি! তবে শুধু মাছি মারা না—ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় আমার কয়েকজন স্টুডেন্ট ল্যাবে কাজ করছে। প্রতি শুক্রবার তাদের সাথে মিটিং করে খোঁজখবর নেই। একজন মাস্টার্স, তিনজন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট, আর গত সপ্তাহে আরেকজন হাইস্কুল স্টুডেন্ট যোগ হয়েছে। তার বাবা আমার ক্লোজ কলিগ, একজন প্রফেসর, তিনি রিকোয়েস্ট করলেন যেন এই সামারে তার ছেলে AI প্রজেক্টে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইস্কুল প্রোগ্রামের মাধ্যমে কিছু ফান্ডও দেওয়া হয় ষ্টুডেন্টদের। গতকাল স্টুডেন্টদের সাথে অনলাইনে মিটিং করে খোঁজখবর নিলাম। আজ উইকেন্ড, যখন ছাত্র ছিলাম, উইকেন্ডে প্রফেসরের ইমেইল এলে চান্দি গরম হয়ে যেত। আজ শনিবার আমি নিজেই স্টুডেন্টদের ইমেইল করে কাজ দিচ্ছি, কথায় আছে উপায় নাইরে, গোলাম হোসেন!

আমার ফ্ল্যাটমেট দক্ষিণ আমেরিকার, প্রায় প্রতিদিনই একসাথে ফুটবল খেলা দেখি। সময় খারাপ যাচ্ছে না, মাছি মারতে মারতে চলছে আরকি! ও আচ্ছা, রান্নাবান্নাও করতে হচ্ছে। গতকাল ইলিশ মাছের ডিম রান্না করলাম, একটি বাংলাদেশি গ্রোসারি থেকে ১২ ডলারে ইলিশের ডিম এনেছিলাম, পেঁয়াজ দিয়ে ভুনা করে রাতে পেটপূজা করেছি। এখন দুপুর আমাদের এখানে, ইলিশের ডিম দিয়েই দানার দান খানা-খাদ্য খেতে হবে কারন বিখ্যাত মুনিষী ভ্যান ল্যান্সকট সাহেব বলেছে "ক্ষুধার অগ্নিপ্রবাহ আণবিক অস্ত্র অপেক্ষাও ভয়ংকর।"

আজ এ পর্যন্তই। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: কৌতুকগুলো অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা। ভিন্ন ভিন্ন কৌতুক এক সাথে জোড়া দিয়ে এক মালায় গেথেছি গল্প আকারে!

নিউইয়র্কের ডায়েরী ১: ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে লং-আইল্যান্ড
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:০০
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রিলিফ ওয়ার্ক - আবুল মনসুর আহমেদ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৩ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০৮




রিলিফ ওয়ার্ক
- আবুল মনসুর আহমেদ


বন্যা ।
সারা দেশ ভাসিয়া গিয়াছে। গ্রামকে গ্রাম ধুধু করিতেছে। বিস্তীর্ণ জলরাশির কোথাও কোথাও ঘরের চাল ও বাশের ঝাড়ের ডগা জাগাইয়া লোকালয়ের অস্তিত্ব ঘোষণা করিতেছে। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধের হাতি দেখা ও আধুনিক ব্লগারির এক করুণ রম্যকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১


মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি প্রাচীন উপকথা যুগে যুগে নতুন অর্থে ফিরে এসেছে অন্ধের হাতি দেখা। কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাতির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে প্রত্যেকে নিজেকে সত্যের একমাত্র অধিকারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজীর বয়ানে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৩৭



গাজী সাহেব বলেছেন, এই ছবির একদম পেছনে যাকে দেখছেন, তিনি ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একই পরিবারের আত্নীয়সহ আরও পাঁচজন ৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। পরিবারের যিনি কোনোভাবে বেঁচে আছেন, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসুন দেখে আসি, রাজাকার, লালবদর,ছাত্রদল ও শিবিরের উত্তরাধিকারীরা পাকিস্তানে কেমন আছে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:০১



কেমন আছে পাকিস্তানে বসবাসরত ৪০ লক্ষ বাঙালী?

১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে দাড়িয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিচার করার হুঙ্কার দিলেন। পাকিস্তানে বসে তখন খুনি জুলফিকার আলী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কি করে কি করি, কি যে করি !

লিখেছেন মেহবুবা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৫




আজ বেশ ক'দিন হোল আমার ব্লগবাড়িতে জ্বীন ভূতের কারসাজি চলছে! আধা পৃষ্ঠা জুড়ে কয়েকটি পোষ্ট আসছে, সব আসছে না।নিজ ব্লগবাড়িতে কত কি আয়োজন থাকে ; যেমন মন্তব্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×