
আমাদের সামার ভেকেশন চলছে এখন। প্রায় তিন মাসের ছুটি। এই ছুটিতে বসে না থেকে নিউইয়র্কের একটি ন্যাশনাল ল্যাবে জয়েন করলাম ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে! গবেষণা করে যে পৃথিবীকে উদ্ধার করব, এজন্য জয়েন করিনি! আমার উদ্দেশ্য ক্লিয়ার কিছু এক্সট্রা মাল-পানি কামানো আরকি! মানিব্যাগের স্বাস্থ্য সুবিধার না। তারপর আমার বউ আর ছেলেকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছি ডলার খরচ করে। মানিব্যাগের স্বাস্থ্যের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই এখানে জয়েন করা! তার উপর আমি আমেরিকার গ্রাম ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার আদম, নিউইয়র্ক দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক দিন। তাই ভাবলাম এক ঢিলে দুই বার্ড মেরে আসি, নিউইয়র্কও ঘুরে আসি, সাথে কিছু মাল-পানিও কামাই! আসলে ইউনিভার্সিটির শিক্ষকতার এই এক সুবিধা, বছরে প্রায় চার মাসের মতো ছুটি পাওয়া যায়। আসলে ছুটি বলতে একেবারে ছুটি না, ষ্টুডেন্টদের সুপারভাইজড করতে হয়। যেমন এই সামারে আমার কয়েকজন ষ্টুডেন্ট ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় কাজ করছে, তাদের সাথে সপ্তাহে একদিন অনলাইনে মোলাকাত করে খোঁজ-খবর নেই।
যাইহোক, আমাদের ল্যাব নিউইয়র্কের লং-আইল্যান্ডে। ল্যাব থেকেই আমাকে বাসা দিয়েছে। আমাকে অপশন দিয়েছিল, তাদের বাসায় উঠলে আমাকে কোনো ডলারের খরচ করতে হবে না, ফ্রি। আর যদি বাইরে থাকতে চাই তাহলে আমাকে তিন হাজার ডলার দেবে থাকা বাবদ। আমি প্রথমে ভাবছিলাম তিন হাজার ডলার খারাপ না, কিন্তু বাসা খুঁজতে গিয়ে দেখি অবস্থা ডাইল! এই টাকায় বাসা পাওয়া না-মুমকিন! অগত্যা তাদের দেওয়া বাসাতেই উঠলাম। বাসা ভালো, তবে সমস্যা হলো ফেডারেল গভর্নমেন্টের সাইট। এখানে গেস্ট আসা কঠিন কর্ম। গ্রিন কার্ড হোল্ডার হলে দেড় মাস আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়, আর পাসপোর্ট হোল্ডার হলে এক দিনেই ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে ঢুকতে দেয়!
আমাকে দুই বেডরুমের একটি শেয়ার্ড অ্যাপার্টমেন্ট দিয়েছে আরেকজন ভিজিটিং ফ্যাকাল্টির সাথে। যার সাথে থাকি তিনি আমেরিকার পুয়ের্তো-রিকো থেকে এসেছেন। আমরা জয়েন করেছি জুনের এক তারিখে। এই অল্প দিনেই ফ্ল্যাটমেটের সাথে ভালো একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমরা দুজনে রাতে একসাথে লিভিং রুমে বসে ফুটবল বিশ্বকাপ উপভোগ করছি। প্রতি উইকেন্ডে দুজনে চলে যাই এই লং-আইল্যান্ড ঘুরতে। এখানে অনেক ছোট-বড় সি-বীচ আছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে গিয়েছিলাম এই আইল্যান্ডের একেবারে সর্বশেষ মাথা মনটাউকে। সময় খারাপ কাটছে না। সব চেয়ে বেশি ভালো লাগে শুক্রবার। কারন এই দিনে আমি মালামাল হয়ে যাই, ল্যাব থেকে চেক ধরিয়ে দেয়! এক্সট্রা ডলার কামাতে আমার ভালো লাগে!
বলছিলাম, আমি আমেরিকার গ্রামের লোক। গত মাসের শেষের দিকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে ড্রাইভ করে এসেছিলাম এখানে। দূরত্বের হিসেবে প্রায় ছয়শ মাইল, কিলোমিটারে প্রায় সাড়ে নয়শ। নিউইয়র্ক শহরে এসে গাড়ি চালানো কঠিন কর্ম মনে হয়েছে। রাস্তায় জ্যাম মনে হয় ঢাকাকেও হার মানাবে। যে দূরত্ব ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় যেতে লাগে পনের থেকে বিশ মিনিট, সেই একই দূরত্ব নিউইয়র্ক শহরে প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগে, অবস্থা ক্যারোসিন! চারদিকে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। আমার অবস্থা হলো, " নিউইয়র্ক শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে আরে, লাল-লাল, নীল-নীল বাতি দেইখা নয়ন জুড়াইছে!" যাইহোক, নিউইয়র্কে বউ আর ছেলেকে এনে এখানকার এয়ারপোর্ট থেকে দেশের প্লেনে উঠিয়ে দিয়েছি। আমার বউয়ের নিউইয়র্ক ভালো লেগেছে। পুরান ঢাকার মানুষ, গিজগিজ মানুষ তার ভালো লাগে! নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসে গিয়েছিল। বাজার করলাম কিছু একটি বাংলাদেশি দোকানে।
নিউইয়র্কে থাকলে সত্যিকার অর্থে ইংরেজি জানা জরুরী না। এখানে আশেপাশে বাংলাদেশিদের অভাব নেই! তাছাড়া খানা-খাদ্যের দামও অনেক কম! বাংলাদেশি মসলা-পাতি, পোলাওর চাল, দেশি মাছ-মাংস হাতের নাগালেই পাওয়া যায়! আমরা ছোট শহরে থাকি, মানে আমেরিকার খ্যাতে! আমাদের কাছে ইহা কল্পনাতেও সম্ভব না! আমি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে কয়েক মাস পরপর তিন-চার ঘণ্টা ড্রাইভ করে ওহাইও স্টেটের কলম্বাস যাই বাংলাদেশি বাজার করতে! ইহা বিরাট কষ্টের কর্ম!

মনটাউকের পথে যাথা।
লং আইল্যান্ড মূল নিউইয়র্ক শহর থেকে ঘণ্টাখানেক দূরে অবস্থিত। এটা বিশাল এক আইল্যান্ড, যা নিউইয়র্কের পূর্ব দিকের সাথে জোড়া লাগানো। সপ্তাহ দুয়েক আগে আমি আর আমার ফ্ল্যাটমেট গিয়েছিলাম একেবারে পূর্বের শেষ প্রান্তে, যার পর আর কিছু নেই। জায়গার নাম মনটাউক! অসাধারণ ছবির মতো জায়গা। শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে লাইটহাউস, পাশে সি-বিচ। অনেক মানুষ এসেছিল। সুন্দর বাতাস, চারদিকে সবুজ, আর রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ। মানুষের সুখী হবার জন্য কি আর কিছু প্রয়োজন আছে!

লঙ্গ-আইল্যান্ডের শেষ প্রান্ত মনটাউক!

বিখ্যাত গায়ক পার্সি হিথের উক্তি!
বিভিন্ন দেশের পর্যটক প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হচ্ছিল। আমরা ছবি তুলছিলাম। মনটাউকের সি-বিচের পাশে পাথরে খোদাই করা একটি ইংরেজি লেখা নজরে এলো। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, “আমি পৃথিবী নয়বার ঘুরে বেড়িয়েছি, তবুও মনটাউকের এই স্থান ছাড়া অন্য কোথাও থাকতে চাই না।” লিখেছেন পুরোনো দিনের বিখ্যাত গায়ক পার্সি হিথ! আমার মনে পড়ে গেল জীবনানন্দ দাশের সেই অমর কবিতা, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।” দুজন ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন ভূখণ্ডের বাসিন্দা, কিন্তু জন্মভূমির প্রতি তাঁদের আবেগ যেন একই জায়গায় এসে মিলে গেছে।
এই শনিবার আমার ফ্ল্যাটমেটের সাথে বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থানে ঘুরলাম, যেমন ফায়ার আইল্যান্ড, পোর্ট জেফারসন, স্টোনি ব্রুক বিচ ইত্যাদি। প্রথমে ফায়ার আইল্যান্ডে গেলাম। আটলান্টিক পাড়ের বীচে পর্যটক মনে হয় গিজগিজ করছে! মাথার উপর সূর্য খা-খা করছে, তবে বিচের সামনে থেকে ঠান্ডা বাতাস শরীরে আচড়ে পড়ছে। খারাপ লাগছিল না! নিউইয়র্ক আমেরিকার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত, তাই এখানকার আটলান্টিক সাগরের পানি ঠান্ডা। অন্তত পা-ভেজানো পর্যন্ত ঠিক আছে, তবে আমার পক্ষে এই পানিতে নামা, মুশকিলই নেহি, না-মুমকিন হে! তবে এই পানিতেও অনেক বাচ্চা নেমে খেলা করছে।
আটলান্টিকের পানি মানেই ঠান্ডা, ব্যাপারটা এরকম না। নিউইয়র্ক যেহেতু উত্তরে, তাই এখানকার পানি কিছুটা ঠান্ডা। আবার ফ্লোরিডা আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। সেখানকার বিচের পানি আমাদের বাংলাদেশের মতোই। নামা যায় ইচ্ছেমতো, সেটাও আটলান্টিক! কয়েক বছর আগে ফ্লোরিডা ঘুরতে গিয়েছিলাম, জলকেলি করেছিলুম আরকি! তবে আমেরিকার পশ্চিমের ক্যালিফোর্নিয়ার সি-বিচের (প্যাসিফিক) পানিও এই নিউইয়র্কের মতই ঠান্ডা, গিয়েছিলাম ২০২৪ এ।
তবে সি-বীচে ঘুরতে দারুণ লাগছিল। শাঁ-শাঁ বাতাস শরীরের এবং প্রাণের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আহা, প্রকৃতি কতই সুন্দর! আমরা ঘুরাঘুরি শেষ করে সন্ধ্যার দিকে চলে যাই একটি ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তানি রেষ্টুরেন্টে, মালিক বোধ-হয় বাংলাদেশের সীলেটের। আমার ফ্ল্যাটমেট আগের সপ্তাহে একটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে আমার সাথে বিরিয়ানি খেয়েছিল। ওর মারাত্মক ভালো লাগায় এবারও তাই বিরিয়ানির অর্ডার দিল! আর আমি নিলাম কাবাব রাইস। ধুমাইয়া খেলাম কারন কথায় আছে "যেখানে খাদ্য, সেখানেই শান্তি।"!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



