somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে নির্মিত স্মৃতির দুর্গ।
ফ্যাসিবাদের ষোলো বছরের গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দমন-পীড়ন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের ইতিহাসকে ধারণ করতে ষোলোজন গুমের শিকার ব্যক্তিকে বাছাই করে তাঁদের প্রত্যেকের ওপর ১৫ মিনিটের একটি করে ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

ষোলোজনের মধ্যে যাঁদের আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তাঁদের মধ্যে রয়েছেনঃ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আযমী, ব্যারিস্টার আরমান, সাবেক সেনাকর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত Zaman M Zaman, কর্নেল (অব.) Hasinur Rahman, হুম্মাম কাদের চৌধুরী এমপি, সাজেদুল ইসলাম সুমন (ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলি এমপির ভাই, আনিসুর রহমান খোকন এমপি এবং গুম পরিবারের সদস্য Jahid Hasan Amena Akter Bristy, Nasrin Jahan Smrity সহ কয়েকটি গুম পরিবারের বেদনাদায়ক কাহিনিও এই সিরিজে উঠে এসেছে।
আমার পর্বটির নাম-
“Aynaghar Files, Episode 6: Price of Truth - Humayun Kabir”

মুনসুন থিয়েটারঃ
জুলাই মিউজিয়ামে রয়েছে দুটি থিয়েটার হল। এর একটি মুনসুন থিয়েটার।
এই থিয়েটারেই প্রদর্শিত হচ্ছে আমাদের ওপর নির্মিত ‘আয়নাঘর ফাইলস’ সিরিজের ডকুমেন্টারিগুলো। পাশাপাশি দেখানো হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ ভিডিওচিত্র- যেগুলো সেই সময় দেশি-বিদেশি সংবাদকর্মী এবং সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ধারণ ও লাইভ সম্প্রচার করেছিলেন।

আমার বিশ্বাস, মুনসুন থিয়েটার জুলাই মিউজিয়ামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে। এখানে একজন দর্শক শুধু ইতিহাস জানবেন না- ষোলো বছরের ভয়াবহতা, গুম, নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পাবেন।

আয়নাঘরঃ ভয়াবহতার বাস্তব প্রতিরূপ....
জুলাই মিউজিয়ামের সবচেয়ে শীতল অনুভূতির জায়গাগুলোর একটি হলো আয়নাঘর।
পুরো প্রকল্পে এটাই একমাত্র নতুন স্থাপনা। বিভিন্ন বাহিনীর গোপন আটক ও নির্যাতনকেন্দ্র- ডিজিএফআই, র‍্যাব, এনএসআই, ডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার গুমঘরের আদলে তৈরি করা হয়েছে এর বিভিন্ন অংশ।
সেখানে প্রবেশ করলেই শরীর যেন হিমশীতল হয়ে আসে।
বড় স্ক্রিনে চলতে থাকে গুম হওয়া মানুষদের নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি। একজন দর্শক একদিকে একটি ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন, অন্যদিকে সেই ঘরেই নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠ, মুখ এবং স্মৃতি পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠছে।
ইতিহাস তখন আর বইয়ের কোনো অধ্যায় থাকে না-
ইতিহাস তখন আপনার চোখের সামনে জীবন্ত দাঁড়িয়ে যায়।

শূন্য থেকে শুরুঃ
যে বাড়িতে বসে ষোলো বছর ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বাচন বানচাল, দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নানা সিদ্ধান্ত ও ষড়যন্ত্র হয়েছিল- সেই বাড়ির বাসিন্দাকেই শেষ পর্যন্ত জনতার প্রতিরোধের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।
গণভবন একসময় ছিল ক্ষমতার প্রতীক।
আজ সেই জায়গাই হয়ে উঠেছে নির্মম ইতিহাসের সাক্ষ্য।
উন্মত্ত জনতা একদিন সেই বাড়ির দেয়াল ভেঙে-চুরে তছনছ করে দিয়েছিল- সেই ধ্বংসস্তূপের জায়গাতেই এখন স্থান পেয়েছে ষোলো বছরের দুঃসহ স্মৃতি।

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস!
যে ক্ষমতা মানুষকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতার আস্তানাতেই মানুষের স্মৃতি জায়গা করে নিয়েছে। স্মৃতির এই প্রতিরোধই এখন আমাদের লড়াই।
কারণ- ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে একমাত্র লড়াই হলো ভুলে না যাওয়া।

বিহাইন্ড দ্য সিনঃ
জুলাই মিউজিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেমোরিয়ালটির দিকে তাকালে এই কথাটিই সবচেয়ে বেশি মনে হয়-
যাদের গুম-খুন করে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁদেরই স্মৃতি আজ দাঁড়িয়ে আছে সেই ক্ষমতার প্রাসাদের সামনে প্রতীকী কবর হয়ে।
সবচেয়ে অমোঘ সত্য হলো-
যাদের মুছে ফেলতে চেয়েছিল ক্ষমতা, শেষ পর্যন্ত তারাই এসে সেই বাড়ির দখল বুঝে নিয়েছে।
মেমোরিয়ালটির স্থাপত্য শুধু নান্দনিক নয়; এটা সব শ্রেণীর মানুষকে আবেগতাড়িত করে, ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
একজন দর্শক যখন সেখানে দাঁড়াবেন, তাঁর চোখের সামনে একই সঙ্গে ভেসে উঠবে ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন-নির্যাতনের ইতিহাস এবং জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান।
গুমের শিকার মানুষ এবং জুলাইয়ের শহীদ- সব মিলিয়ে প্রায় ৪,২০০ মানুষের নাম এই স্মৃতির তালিকায় স্থান পেয়েছে।
প্রতিটি নাম একটি পরিবার।
প্রতিটি নাম একটি গল্প।
প্রতিটি নাম একটি ক্ষত।
আর প্রতিটি নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ইতিহাস কখনো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে থাকে রক্ত-মাংসের মানুষ, তাঁদের পরিবার, তাঁদের স্বপ্ন এবং তাঁদের অসমাপ্ত জীবন।


জুলাই মিউজিয়ামের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এখানেই-
এটি শুধু অতীতকে সংরক্ষণ করছে না; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সতর্ক করছে। যাতে কোনোদিন কোনো ক্ষমতাবান আবার মনে না করে-
মানুষকে গুম করা যায়, সত্যকে সাময়িক চাপা রাখা যায়, ইতিহাসও মুছে ফেলা যায়।
ইলিয়াস আলী, চৌধুরী, সাজেদুল ইসলাম সুমন, হুমায়ুন কবির হিরু, নুর, আবু সাঈদ, ওয়াসীম, মুগ্ধদের মেরে ফেললেও তাদের স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না।
আর যতদিন স্মৃতি বেঁচে থাকবে, ততদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, প্রশ্নও বেঁচে থাকবে।
জুলাই মিউজিয়াম তাই শুধু একটি জাদুঘর নয়- এটি আমাদের স্মৃতির প্রতিরোধ।
ভুলে যাব না।
ভুলতে দেব না।

কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা Mostofa Sarwar Farooki এবং তার টিমকে।
আপনার সৃজনশীল সৃষ্টিতে জুলাই বেঁচে থাকুক।
স্মৃতি বেঁচে থাকুক।
সত্য বেঁচে থাকুক।
আর যারা সত্যের মূল্য দিয়েছি-
তাদের গল্পও বেঁচে থাকুক।
Humayun Kabir
#julymemories
United for the Victims of Enforced Disappearances
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগের পরিবেশ এখন যথেষ্ট ভালো

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৫




ব্লগে মাঝে মাঝে কোন লোক থাকে না। মাঝে মাঝে কম লোক থাকে। সাইলেন্স ইজ গোল্ডেন-নিস্তব্ধতা হিরম্ময়।এ অবস্থা বিরাজমান হওয়াতে ব্লগের পরিবেশ এখন যথেষ্ট ভালো। কোখাও কেউ নেই। ব্লগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

একলা বিকেল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৫

-একা থাকো?
-না।
-কে থাকে সাথে?
-কেউ না।
-তাহলে কিভাবে বলছো একা থাকো না?
-থাকি না তো।
-কিভাবে?
-তুমি থাকো যে পাশে।
-বাহ! ………কতক্ষণ থাকি?
-সারাক্ষণ। টেবিলে বসে খাচ্ছি, তুমি সামনে। রান্না করছি, তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

না ফেরার দেশে চলে গেলেন রথো রাফি

লিখেছেন ফেনা, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩



আজ অনেক দিন পর ব্লগে আসলাম। আসলে চাকুরী জীবনের প্রেসার সামলাতে সামলাতেই সময় চলে আয়, নেটে আর তেমন আসা হয় না। আজ আসলাম রাফি ভাই এর মৃত্যু সংবাদটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পোষ্টে ব্লগার অপু তানভীরের এআই আপত্তি এবং এর এআই জবাব

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩০





কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া কি ছিল?

অপুতারভীরের এআই আপত্তি-
আপনার লেখা সম্পর্কে এআই মূল্যায়ন নিচে দিলামঃ
১. শূন্যতা ও উদ্ভবের ভুল ব্যাখ্যা (Misinterpretation of Void and... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের লেবাস নয়, শিশুর নিরাপত্তাই হোক আমাদের প্রথম দায়িত্ব!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫১

ধর্মের লেবাস নয়, শিশুর নিরাপত্তাই হোক আমাদের প্রথম দায়িত্ব!

একজন বাবা তাঁর ছয় বছরের কন্যাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিকতা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায়। তিনি কি কখনো কল্পনা করেছিলেন, ধর্মীয় শিক্ষকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×