শেষ পর্যন্ত কাজটা ঠিকঠাক মত প্রেসে উঠলো কিন্তু দূঃশ্চিন্তার অনেক কিছু তখনো বাকী। ব্যাংকের প থেকে বেশ কিছু বিষয়ে মান নিয়ন্ত্রনের জন্য বলা হয়েছিল যেগুলি ঠিকঠাক না হলে যে কোন সময় কাজ বাতিল করে দিতে পারে তারা। বিশেষ করে তারা খুবই গুরুত্ব দিচ্ছিল তাদের লোগোর রংয়ের উপর। এ বিষয়ক পূর্বাপর কিছু ঘটনা আমাকে জানিয়েও দেয়া হয়েছে। প্রথম দিন পুরো সময়টাই প্রেসে থাকলাম আমি। সবকিছু সঠিক ভাবেই এগোলো। তবে একদিন ঠিক চললেই তো হয়ে গেলো না। ৪ পাতার ক্যালেন্ডারই হচ্ছে ১ লাখ। ৪ রংয়ের ছাপা। অর্থাৎ মোট ১৬ লাখ ইমপ্রেশন। তার মানে দাড়ায়, শুধু ক্যালেন্ডারই ছাপা হবে ১০/১২ দিন ধরে। সময়ও একটা ব্যাপার। ঠিক সময়ে মাল ডেলিভারী দিতে হবে। খুব খেয়াল করে, খুব খেয়াল করে.. জেসিকাকে ব্যাপারটা আমি বুঝিয়ে বলতে পেরেছি যে কারনে একটা বিপত্তি থেকে অন্তত রা পাওয়া গেছে। ঝামেলাটা হয়েছে ওর এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বিয়ে পড়ে গেছে এর মধ্যেই। এ নিয়ে তেমন কোন চাপ ও আমাকে দেয় নি। শুধু একদিন আমি ওর সাথে থেকে বিয়ের দিনে ও কোন পোশাকটা পরবে তা পছন্দ করে দিয়েছি। পোশাকটা দারুন! অনেকটা আকাশীর মতো রং, আবার ঠিক আকাশীও নয়।
আসল বিপত্তি হলো অন্যখানে। অনেক চেষ্টা করেও জেসিকার পোশাকের রংয়ের শেডের লিপস্টিক খুজে পেলো না। এ নিয়ে ওর খুব মন খারাপ হলো। এতটা দূঃখ করে আমাকে কথাটা বললো সে যে আমার মনে হলো, যদি এই রংয়ের লিপস্টিক খুজে বের করতে না পারি তাহলে আমার জীবনটাই বৃথা। প্রথমে শুনে নিলাম, খোজা হয়েছে কোথায় কোথায়? যেসব শপিং সেন্টার এখনো খুজতে বাকী সেগুলো টার্গেট করে খুজতে থাকলে পাওয়া যেতেও পারে, ভাবলাম আমি। প্রেসে ঐ গুরুত্বপূর্ণ ছাপাটা চলতে না থাকলে এটা কোন ব্যাপারই ছিলো না, আকাশী রংয়ের লিপস্টিক প্রয়োজনে পয়দা করতাম। একটু দরিদ্র বন্ধুবান্ধব যারা ছিলো, ফোন করে প্রায় তাদের সবাইকেই কাজে লাগিয়ে দিলাম, লোভ দিলাম কাজ হাসিল হলে বিরাট পার্টি হবে। কাপড়ের স্যাম্পল ছিলো আমার কাছে। কাপড়টা স্ক্যান করে ইনজেক্ট পেপারে প্রিন্ট নিয়ে ধরিয়ে দিলাম সবাইকে, এই রংটারই শেড মিলাতে হবে। জেসিকার বান্ধবীর বিয়ের ঠিক আগের দিন দুপুর পর্যন্ত লিপস্টিকের কোন হিল্লে হলো না। এ সময়টাতে আমি প্রেসে ছিলাম। ক্যালেন্ডারের দুই রং ছাপা ইতিমধ্যে ঠিকঠাক মতো হয়ে গেছে। এখন হলুদ ছাপা হবে। লোগোর রং মেলাতে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরমধ্যে জেসিকার ফোন এলো, জানতে চাইলো আমি কোন খোজ পেয়েছি কিনা। তখন পর্যন্ত আমার কাছে কোন খবর এসে পৌছায় নাই, ’তুমি অন্য একটা ড্রেস পরো বরং’ বললাম আমি। টের পেলাম ওপাশ থেকে গলাটা কেমন ধরে এসেছে তার। বুকটা ভারী হয়ে গেল আমার, কোথা থেকে উড়ে এসে এক অযাচিত মর্দামী ভর করলো । বললাম, কোন চিন্তা না করে তুমি তোমার প্রস্তুতি নাও, কাল বেলা ১২ টার মধ্যে পৌছে যাবে তোমার কাঙ্খিত বস্তু’। বললাম তো বটে, কিন্তু কিভাবে এটাকে কার্যকর করা যাবে তা ভেবে বিরাট টেনশনে পড়ে গেলাম। কোয়ালিটি প্রিন্টার্সের ম্যানেজার সুজনের কথাতেও মনযোগ দিতে পারলাম ঠিকমতো। বিকেলে টঙ্গী থেকে ফোন করলো আমার পুরোনো বন্ধু স্টক লটের ব্যবসায়ী আযম। সে আছে চেরাগ আলী আলাউদ্দিন সুপার মার্কেটে। সে খবর দিলো, আমার চাহিদা অনুযায়ী রংয়ের লিপস্টিকের একটা লিংক পাওয়া গেছে। তবে ব্যাপারটা অতো সহজ না, তার ভাষায় চরম জটিল। আমাকেই যেতে হবে যদি কাজ হাসিল করতে চাই। দুপুরের পর থেকে ইলেকট্রিসিটি না থাকায় হলুদ রংয়ের ছাপাটা এখনো উঠানো যায় নাই, এটা নিয়েও আরেক টেনশন। ইলেকট্রিসিটির এ অবস্থা থাকলে সময়মত মাল ডেলিভারী যে কিভাবে হবে? হয়ে যাবে, কাজ আটকাবে না, নিজেকে ভরসা দিলাম আমি। টঙ্গীর পথে রওনা দিতে গেলে সুজন আতকে উঠলো, বললো, করেন কি? ছাপাটা তো শুরু হোক, তারপর যান।’ আল্লাহর নাম নিয়ে ছাপা শুরু করে দ্যান, উপরে আল্লাহ, নিচে আপনি, বলতে বলতেই রওনা হলাম আমি। বিকেল ৫ টার দিকে চেরাগ আলী আলাউদ্দিন সুপার মার্কেটে পৌছালাম। আযম আগে থেকেই ওখানে ছিলো। মার্কেটের ৩ তলায় বিউটি কর্নারের সত্বাধিকারী আলী বাহাদুরই হচ্ছেন সেই লোক যাকে কেন্দ্র করে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলো দেখা যাচ্ছে অর্থাৎ আকাশী রংয়ের লিপস্টিক প্রাপ্তির েেত্র এ মুহুর্তের খোদ লোক যাকে বলে। কিন্তু আলী বাহাদুর সাহেবের সাথে কথা বলে আমার প্রত্যাশার বেলুনটা চুপসে যেতে ধরলো। ঘটনা হচ্ছে, চীন থেকে কিছু কসমেটিক আইটেম আমদানী করছে আলী বাহাদুর। ধারণা করা হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশার বস্তু এই লটে থাকবে। কিন্তু লট এসে পৌছবেই আজ রাতে। বিভিন্ন লোকের অর্ডারের মাল, কোনটা কোথায় কিভাবে আছে তা ভালোভাবে সনাক্ত করাই অন্তত দুদিনের কাজ। অথচ এরই মধ্যে রয়েছে আমার কাঙ্খিত বস্তু। আলী বাহাদুরের মতে, এটি অবশ্যই পাওয়া যাবে কিন্তু তার জন্য আমার সময় নিতে মাত্র তিনদিন। মনে মনে গালি পাড়লাম, আরে ব্যাটা তিনদিনই যদি সময় থাকতো তাইলে তোর ধামা ধরে বসে থাকা কেন? সমাধানের অন্য আরেকটি রাস্তা বাৎলে দিলেন আলী বাহাদুর। মধ্য রাতে মাল এসে পৌছনোর পর গোডাউনে ঢুকবেন আমাকে নিয়ে। যদি খুজে পাওয়া যায়। সময় আছে আগামীকাল বেলা ১২টা পর্যন্ত।
সকাল ৭টার দিকে বহু সাধনার ধন যখন হাতে পাওয়া গেল, আনন্দে এত জোরে চেচিয়ে উঠলাম যে ঢুলুঢুলু চোখে ঝিমাতে থাকা আলী বাহাদুরের ঝিম পুরোপুরি ছুটে গেল। বললো, করেন কি মিয়া? ভয় পেয়ে গেছি না! দু চোখ ঘুমে ভেঙ্গে আসলো আমার। রাতে সুজন ফোন দিয়ে কি একটা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে ব্যাটারী ডাউন হয়ে মোবাইল বন্ধ হয়ে গেলো। যে জাজ্বল্যমান সমস্যা তখনো আমার সামনে উপস্থিত ছিলো তাতে অন্য কোন সমস্যা নিয়ে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থাও ছিলো না। ওদিকে কি অবস্থা কে জানে? ভাগ্য আমার সহায় হবে, যেমন হয়ে এসেছে আগে পরে, এ ভেবে আবারো নিজেকে প্রবোধ দিলাম। মনে চাইলো এখনি জেসুকে ফোন করে খবরটা দেই, কিন্তু মোবাইলে কোন চার্জ নেই তাছাড়া এত সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গে না ওর। কি দরকার, একবারে পৌছে ওকে বিস্মিত করে দেবো। কান্তিতে পারলে গোডাউনেই ঘুমিয়ে পড়তাম, কিন্তু আলী বাহাদুর প্রায় ঘাড়ে করে নিয়ে তার বাসায় শুইয়ে দিলো। সাড়ে ১১টার আযম এসে ঘুম ভাঙ্গালো। কপাল ভালো, তার মাথায় ছিলো, নচেৎ তীরে এসে তরী ডুবতো। দেখার মতো উস্কোখুস্কো চেহারা নিয়ে একটানে পৌছে গেলাম আদাবর। আযমের ফোন থেকে জেসিকাকে বাইরে আসতে বললাম, মনে আমার দিগ¦ীজয়ের আনন্দ। ছোট্ট প্যাকেটটা হাতে পেয়ে ও বুঝতে পারলো এতে কি আছে, কিন্তু চোখেমুখে অবিশ্বাস। খুলে যখন নিশ্চিত হলো যে সব ঠিকই আছে, কেঁদে ফেললো সে। আমি ভাব ধরলাম যে এ আর এমন কি, এ নিয়ে এত উচ্ছাসের কি আছে।
বাসায় ফিরে চোখেমুখে পানি দিয়ে কড়া এক কাপ চায়ে দু চুমুক দিয়েই যেন ২৪ ঘন্টার ঘোর কাটিয়ে ফিরে এলাম বাস্তবে। নিজের প্রতি যারপরনাই বিরক্ত হলাম, অবাক হলাম এইভেবে যে এতখানি বাড়াবাড়ি করার মত একটা স্বত্তা আছে আমার তাতো জানতামই না। তবে সবচেয়ে বেশি হলাম দূঃশ্চিন্তাগ্রস্থ। দ্রুত ফোনটা সচল করে সুজনকে কল দিলাম। সুজনের গলার স্বর শুনে বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো। ’ফোনে কথা বইলা লাভ নাই, তাড়াতাড়ি প্রেসে আসেন’ ঠান্ডা গলায় বললো সে। মনের মধ্যে কু ডাক ডাকতে লাগলো বিষমভাবে। আল্লাহকে ডাকতে থাকলাম, আল্লাহ এবার আমাকে রা করো, নিজের কাজেতো বটেই নামায রোযার েেত্রও আর কোন গাফিলতি করবো না। সবকিছু সহিসালামতে হয়ে গেলে বাবা খানজাহানের দরগায় একটা ছাগল দেবো বলে মানত করলাম। কিন্তু ছাপার যে পরিনতি হয়েছে তাতে কোন মানত কাজে আসবে বলে মনে হলো না। লোগোর রং দেখে আমি স্বামীহারা বিধবার মত বিলাপ করে উঠলাম। মাথাটা ঘুরতে লাগলো, মনে হলো পড়ে যাবো। সুজন এস আমাকে ধরলো।
’ কোন উপায় ছিলো না, যে পার্সেন্টেজ এ প্লেট বানানো হইছে তাতে ছাপার রং এরকমই হয়,বলা শুরু করলো সুজন, ’ ডিজাইন, আউটপুট, প্লেট সবকিছু নতুন করে করা লাগতো, কিন্তু আপনের ডেলিভারীর ডেটে তাইলে কুলাতো না। এদিকে আপনের মোবাইলে পাইলাম না, দূঃখিত কয়। শেষে কি করা, ভাবলাম পার্টিপুর্টির সাথে ভালোইতো খাইখাতির আপনের, এইটুক উনিশ-বিশ মানায় নিতে পারবেন না। দিলাম ছাপা রানিংয়ে তুলে, তেমন অসুবিধা হয় নাই, কি বলেন? এর চেয়ে কতো বড়ো বড়ো ঝামেলাওয়ালা কাজও চলে যায়, এতো মামুলি ব্যাপার।’
’সময় লাগলে সময় দুইদিন বাড়ায় নিতাম, লোগোর রং ঠিক হয় নাই, এ দিয়ে এখন কি হবে’ হাহাকার করে উঠলাম আমি।’ তুই হারামী আমার এ কি সর্বনাশ করলি’ রাগের চোটে নিজের মাথার চুল টানতে থাকলাম গায়ের জোরে। ’ভালো করতে গিয়া মন্দ হইলাম, এ কারণেই তো বললাম, থাকেন। আপনে থাকেন নাই, ফোন বন্ধ করে রাখছেন, আমার কি করা’ যান্ত্রিক গলায় বলে দ্বাািয়ত্ব শেষ করলো সুজন।
পরের দু দিন উন্মাদের মত মতিঝিলে ঐ ব্যাংকের হেড অফিসে দৌড়াদৌড়ি করলাম। ফায়দা হলো না। ছাপাটা বাতিল হলেও অফিস থেকে আমাকে বলা হলো, কাজটি আমার প্রতিষ্ঠানই করবে, এমনকি এক সপ্তাহ সময়ও বাড়িয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু তারা তো জানেনা বা জানলেও বুঝে উঠতে পারছে না যে ১২ লাখ টাকার কাগজের ছাপা বাতিল হয়ে গেলে আমার পে এ কাজটি আবারো করা সম্ভব না। বারবার এ ছাপাটি চালানোর অনুরোধ জানিয়ে আমি অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিরক্ত করতে সমর্থ হলাম কিন্তু কাজ আদায় করতে পারলাম না।
দ্রুত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলো আমাকে। অফিসের বাড়ীওয়ালা কে জানিয়ে দিলাম, সামনের মাস থেকে অফিস ছেড়ে দিচ্ছি। অগ্রীম জামানতের টাকা ফেরৎ নিয়ে ডিজাইনার, একাউন্ট্যান্ট ও পিয়ন এই তিন কর্মচারীর বকেয়া বেতন শোধ দিয়ে জানিয়ে দিলাম, তাদের চাকরি শেষ। ফার্নিচার ও কম্পিউটার গুলি বিক্রির টাকা এবং হাতে থাকা নগদ ক্যাশ যা ছিলো তা দিয়ে বাকী বকেয়া পরিশোধ করলাম যতদুর সম্ভব। তারপরেও মার্কেটে প্রায় চার লাখ টাকা দেনা থাকলো। উপায়ন্তর না পেয়ে ভুতের গলির বাসা ছেড়ে দিয়ে ফেরারী হয়ে গেলাম। তবে এরপরেও আমি আবার ঘুরে দাড়ানোর সাহস পেলাম জেসিকার কারণে। চরম এই বিপদে সে বিরাট শক্তি হয়ে আমার পাশে দাড়ালো। অনেক দূঃখ যন্ত্রনার মধ্যেও সে আমাকে নিরাশ হতে দিলো না। এমনকি ফ্যাশনে-শপিংয়ে অনেক কাটছাট করে আমার রুটি-রুজির ব্যবস্থাও করলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




