ছাত্র অবস্থায় শাহবাগের 'সিনোরিটা' চায়ের দোকানে নিয়মিত আড্ডা ছিলো। এক পড়ন্ত বিকালে কী মনে করে যেনো সিনোরিটায় ঢুকে যাই। দেখি উমা আর তার লেখক বন্ধু। দুজনেই খুব বিষন্ন, ঝড়ো বিদ্ধস্ত। আমি কথা বাড়াই না। দ্রুত চা শেষ করে উঠে পড়ি। বুঝি, এখন ওদের একান্ত সময় প্রয়োজন।
এর মাঝে খবর পাই, উমা পুরনো ঢাকায় একটা কলেজে বাংলার শিক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। পরিবারের অমতে বিয়ে করেছেন ওর সেই লেখককে। বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন স্বামীর ঘরে। ওর লিটল ম্যাগাজিনটা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগে--ইত্যাদি ইত্যাদি।
আরেকদিন বসুন্ধরা শপিং মলের সামনে উমার সঙ্গে দেখা। ও আমাকে দেখে চমকে যায়। আমি জিগেষ করি, কেমন আছেন? উমা খুব বিষন্ন গলায় বলেন, ভাল। চোখের কোনায় জ্বলে উঠে অশ্রু কনা। আমার অনুরোধে সে বসুন্ধরার টপফ্লোরে কফি শপে বসেন। ধুমায়িত কফির কাপ ঠান্ডা হতে থাকে।... উমা নিশ্চুপ।
এক সময় নিজে থেকেই বলতে শুরু করেন, ওর প্রেম, বিয়ে, সংসারের কথা। বলেন, বাবা-মার অমতে বিয়ে করে স্বামীর ঘরে এসে বুঝলাম, ওর কোনো নির্দিষ্ট আয় নেই। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে দু’চার হাজার টাকার অনিয়মিত রোজগারই ওর ভরসা। অথচ বিয়ের আগে আমাকে বলেছিল, ও একটা বিখ্যাত দৈনিকে চাকরী করে! এখন সব জেনে আমিও সবকিছু মেনে নিয়েছি, কারণ আমার তো চাকরী আছে। এরপর ও কোনো রকম নিরোধক ছাড়াই আদর করতো। আর গর্ভবতী হলে আমার বাচ্চাকে নষ্ট করতে চাপ দিতে শুরু করে। খুব মানসিক চাপের মধ্যে আমি প্রথম বাচ্চাটিকে নষ্ট করি। পরের বার আবারো একই রকম চাপ আসলে আমি রুখে দাঁড়াই। আর না, এবার আমি বাচ্চাটাকে বাঁচাবোই।...
তো এর পর আমার লেখক স্বামী শুরু করে, আরেক অত্যাচার। কথায় কথায় বলে, তোমাকে বিয়ে করে কী পেলাম বলতো? পারিবারিকভাবে বিয়ে হলে আমি কতো টাকা যৌতুক পেতাম! আর ও বাড়িও ফেরে না ঠিকমত। মোবাইলে ফোন করলে দেখি ফোন বন্ধ। হঠাৎ হঠাৎ আবার নিজেই ফোন করে বলবে, আমি এখন ফরিদপুর। একটা সাহিত্য সম্মেলনে এসেছি। আমার ফিরতে দেরী হবে।...
উমা বসুন্ধরার কফি শপের পরিবেশ, চারপাশ, ভুলে গিয়ে চাপা কান্নায় মাতেন। আমি তাকে থামাই না। খানিক পরে বলি, বাবা-মার কাছে ফিরলে হয় না? উমা বলেন, এখন সেখানেই উঠেছি। কারণ আমার বাচ্চাটার জন্যই আমাকে এখন বাঁচতে হবে; আর সেজন্য পারিবারিক যতœ আমার প্রয়োজন।
আমি জিগেষ করি, বাড়ির লোক সবাই সব কিছু মেনে নিয়েছে তো? উমার জবাব, বিপ্লব, বাবা-মা আসলে কখনো ছেলেমেয়েদের ফেলে দেয় না। আমি মা হতে চলেছি, এই সব এখন আমি খুব ভাল বুঝি। আমার সব কথা শুনে ঠাকুমা শুধু একটাই কথা বলেছেন, উমা, তুই এখন গর্তে পড়েছিস!....
বেশ কিছুদিন পরে আমার সাবেক কর্মস্থলের কেন্টিনে চা খেতে খেতে আলাপ করছিলেন সাহিত্য পাতার কয়েকজন সাংবাদিক-লেখক। আমি চুপ করে শুনছিলাম তাদের কথা। একজন বললেন, তার শিশুর নাম রাখবেন, চর্যা। আরেকজন বললেন, এই নাম তো রাখা হয়ে গেছে। অমুক লেখক (উমার স্বামী) তার ছেলের নাম রেখেছে, চর্যা। আমি উমার সন্তানের খবর পেয়ে যাই, আকস্মিকভাবে এইভাবে।
অনেকদিন আর উমাকে দেখি না। এখনো চোখ বুজলে দেখতে পাই, আগের সেই লিটল ম্যাগাজিন করা হাসিখুশী উমার মুখ। আমাকে দেখলেই বলবেন, এই বিপ্লব, এই...জলদি জলদি কিছু চাঁদা ছাড়ুন তো। আমাদের পত্রিকা বেরুবে শিগগিরই!...
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




