আমার নিজের কথা বলব? তার আগে বলি বিদেশ কেন এলাম। বিদেশ এলাম অর্থ উপর্াজন করতে। পূর্ব কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বলতে হয় মামার জোড়ে আসা। মামা সৌদি আরব থাকেন, পেশায় ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আমার মা বাবা নিজেদের পছন্দ মত বিয়ে করার কারনে বড় মামাদের সাথে সবসময় একটা দূরত্ব ছিল। হয়তো অনেক বছর পর বোনের জন্য কিছু করার চিন্তা তার মাথায় আসে বা অন্য কিছুও হতে পারে যাই হোক তিনি আমাকে একদিন ফোন করে বললেন সৌদি আরব আসব কিনা? আমি ভাবলাম আমার মতো বকলম দেশে এখন (2001 সাল সম্ভবত) এনজিও তে কাজ করছি 5,000 টাকা বেতনে, বিদেশ গেলে হয়তঃ মাসে 15,000 টাকা কামাবো। তার চেয়েও বড় কথা হলো এই চিকনা স্বাস্থ্যটার উন্নতি হবে। আল্লার ঘর দেখারও একটা সুযোগ পাব। যারা চাকুরী সূত্রে হজ্জ করে তাদের আমি ট্রাভেল হাজী বলতাম, সেই অর্থে আমিও হয়তঃ ট্রাভেল হাজী হয়ে যাব। তবে মনের ভেতর একটা সুপ্ত আকাঙ্খাও ছিল, আর তা হলো ভ্যানগগের সেই ছবিটার মতো একটা জীবন পাওয়া, যেখানে থাকবে এক খাটের, এক বালিশের, এক জানালার একটা ঘর যেখানে আমি একা হতে পারব। নিজের সব কাজ নিজে করব । আন্তনির্ভরশীল হতে পারবো।
যাই হোক, তিনমাস ঢাকা চট্টগ্রাম দৌড়াদৌড়ি করে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের দাম্মাম এয়ারপোর্টে পা রাখলাম। আমার সঙ্গে মামী, কাজিন সহ আরও দুইজন ছিল এই যাত্রাতে। এয়ার পোর্টে আমি, মামী ও কাজিনের এয়ারপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেলেও বাকী দুজনের প্রসেসিং হচ্ছিল এয়ার পোর্টে । আমরা তাদের জন্য কিছু দূরেই অপেক্ষা করছিলাম, এমন সময় এক সাউদি পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের উদ্দেশ্য করে বললো 'ইয়াল্লা ইয়াল্লা'। শুনে আমার বড্ড হাসি পেল, ভাবলাম বেটায় আল্লারে কেন ডাকে!! আমার হাসি দেখে বেটা চেহারা শক্ত করে আবার বললো 'ইয়াল্লা ইয়াল্লা'। তখনও জানতাম না ইয়াল্লা মানে হলো জলদি। পুলিশ বেটা আমাদের বলছিল কাজ হয়ে গেলে যাতে ঐ জায়গাতে অযথা দাড়িয়ে না থেকে চলে যাই। সৌদিদের আমাদের সম্পর্কে কি ধারনা সেই অপমান লজ্জার কথা আর একসময় বলা যাবে। যাই হোক সবার আনুষ্ঠানিকতা সেরে যখন আমরা অভ্যার্থণার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম তখন দেখলাম কিছু অল্প শিক্ষিত সদ্য আসা বাঙালী ছেলে আমাদের কাতর কন্ঠে বলছে "ভাই একটু শোনেন" মামী আমাকে বল্লেন চলে আস, বেচারারা অবৈধ্যভাবে এসে প্রতারিত হয়েছে আমরা তাদের কোন সাহায্যই করতে পারব না। উল্লেখ্য মামী প্রায় আসা-যাওয়া করেন বলে এসব ব্যপারে অভ্যস্ত। তাদের অসহায়ত্ব আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল, কিন্তু অসহায় আমি তখনও নিজের ভবিষৎ সম্পর্কেই ভাল করে জানি না। জানি না এ কারনে বলছি যে আমাকে কোন কোম্পানীতে কি পোষ্টে কাজ করতে হবে এসব ব্যাপারে কোন ধারণাই দেয় নি মামা, বলেছেল আগে আস তারপর নিজেই দেখবা। যাই হোক মামার উপর ভরসা করে আমিও কোন কথা বাড়াইনি। অভ্যর্থনার জায়গায় মামা আমাদের রিসিভ করার জন্য এসেছিলেন। মামার কাছে যাওয়া মাত্র চিন্তা করলাম মামাকে সালাম করি । কৃতজ্ঞতা প্রকাশে পায়ে ধরে সালাম করতে যাব বলে ঝুকতেই মামা দিলেন এক হুঙ্কার! বললেন এইক! কি করো!! সাউদী আরবে এসব পায়ে ধরে সালাম করতে হয়না। নিজেকে তখন নাটকে দেখা গ্রাম থেকে আসা ক্ষ্যাত যুবক বলে মনে হচ্ছিল। চট্টগ্রামের ছেলে বলে এমনিতেই একটু রক্ষণশীলতা কাজ করে। মুরুব্বীদের পায়ে ধরে সালাম করতে হয় এই ধর্মীয় গোড়ামী টুকু ছিল। যদিও জানতাম এটা শুধুমাত্র একটা হিন্দুয়ানী রীতি ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসলামে কোথাও পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার কথা বলা হয়নি। যা করতে যাচ্ছিলাম তা শুধুই অবচেতন ভাবে।
এইসব ঘটনার পর যখন দাম্মাম এয়ারপোর্টের পর্াকিং এরিয়াতে এলাম, দেথি আমার অফিসের ড্রাইভার আমাকে রিসিভ করতে এসেছে। মামা আমিসহ বাকী দুজনকে কোম্পানীর গাড়িতে তুলে দিয়ে তিনি মামী আর কাজিনকে নিয়ে চললেন তার বাসস্থান জুবেইল শহরের দিকে, আর আমরা চল্লাম তার বীপরিত দিকে আল খোবার শহরের দিকে।
চলবে... (অনিশ্চিত)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




