১৯৭২ সালে বাংলদেশের মুদ্রাস্ফীতি ৫০% - এ স্থির হইয়াছিল। মানুষকে ক্রমান্বয়ে দূর্ভিক্ষের স্বাদ উপলব্ধি করিতে হইয়াছিল এবং দূর্ভিক্ষের স্বাদ যতই সুমিষ্ট বা তেতো হোক না কেন প্রজন্ম-৭০ তাহা বাস্তবে অনুভব করিয়া তাহাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি আরও সমৃদ্ধ করিয়াছিলেন বলিয়া শুনিয়া আসিয়াছি।মহামতি অর্থ উপদেষ্টা মহোদয় সে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বলাই বাহুল্য। এমনকি সম্প্রতি ইতিহাস সচেতন সুপণ্ডিত হিসেবে শায়েস্তা খাঁর সময় কাল দূর্ভাগা জাতিকে স্মরণ করাইয়া তাহার পবিত্র দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হইয়াছেন। যুদ্ধবিদ্ধস্ত অর্থনীতিতে ৫০% মুদ্রাস্ফীতি স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক তাহা বুঝিবার মত বিদ্যা-বুদ্ধি এই অধমের নাই কিন্তু সেই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি এমনকি ২০০% - এ স্থির হইলেও আমার ন্যায় অল্পবিদ্যার কারবারিদের নিকট খুব একটা বেমানান ঠেকিত না। সে যাহাই হোক অর্থনীতির কৌশল নির্মাণ দুরে থাকুক অর্থবছরের বাজেটখানা পড়িয়া তাহাতে কী বলা হইয়াছে তাহা বুঝিবার সামর্থ্য মূর্খ আম-জনতার থাকিবার কথা নহে। সুতরাং কোন কিছু না বুঝিয়া খামোখা আস্ফালনের কী অর্থ থাকিতে পারে?
পৃথিবীব্যাপী মুদ্রস্ফীতি এক চরম রুপ পরিগ্রহ করিতে যাইতেছে বলিয়া অর্থশাস্ত্রের পণ্ডিতগণের ধারণা। এই ধারণা যে একেবারেই অমুলক নহে তাহার অকাট্য প্রমাণ ইতস্ততঃ ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। প্রতিবেশি ভারতের উদাহরণ সর্বাগ্রে উপস্থাপিত হইলে সুবিধাই বটে। গত বছরে আমাদের এই বৃহৎ প্রতিবেশির মুদ্রাস্ফীতি ৩%-এ ঘোরাফেরা করিলেও বর্তমানে তাহা ১১ বা ১২% -এ উন্নীত হইয়াছে। গণচীনের অভিজ্ঞতাও যে সুখকর নহে তাহা বেশ বলা যায়। গত বছরের ৩% তিনগুণ বা ততোধিক বাড়িয়া ৯-১০% ঠাঁই নিয়াছে। আরেক ভ্রাতা পাকিস্তান সর্বকালের রেকর্ড ভাঙ্গিয়া ২০-২২% অবস্থান নিয়াছে। শ্রীলংকা আরেকধাপ আগাইয়া ৩০% - এর কাছাকাছি উপস্থিতির প্রমাণ রাখিতেছে। আবার থাইল্যাণ্ড মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে ৭ বছরের রকর্ড ভঙ্গ করিলেও সিঙ্গাপুর উন্নততর ম্যাক্রো ব্যবস্থাপনা চর্চা করিয়াও ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রস্ফীতির অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছে।
সুতরাং আম জনতার বলিবার কিছুই থাকে না। যদিও বলিয়া ফল হইবার কোন কারণ বর্তমানে উপস্থিত নাই। কারণ আমজনতা টি.এস.পি.'র (রাসায়ণিক সার বিশেষ) গুনাগুন বুঝিতে পারিলেও তাহাদের পি.এইচ.ডি. নাই। অগ্রপশ্চাদ কিংবা সর্বাঙ্গ তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিলেও একখানা ব্যাজও আবিস্কৃত হইবার কোন সম্ভাবনা নাই। কাজেই আম-জনতা বিষয়ে সময় ক্ষেপন বৃথা।
তবে এই অধম আম-জনতার মূর্খ অংশের প্রতিনিধি। পূর্বেই বলিয়া দিয়াছি বিদ্যা-বুদ্ধির জোর বলিয়া কিছুই নাই। স্ত্রী কর্তৃক চাল ক্রয় করিবার হুকুম জারি হইলেই হাত-পা সমেত পুরো শরীর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হইবার ন্যায় থরথর করিয়া কাঁপিয়া ওঠে। শুধুমাত্র চাল বলিয়া শান্ত হইয়া যাবে এমন নহে। ডাল, চিনি, সব্জি, বিস্কুট, নুন, তেল ইত্যকার নানা পদ মন্ত্রের ন্যায় উচ্চারিত হইতেই থাকে। অধমের কাঁপুনি মৃগীরোগে রুপান্তরিত হইলেও স্ত্রীর ফর্দি ছোট হইবার অবকাশ থাকে না। চিহ্নিত মুদ্রাস্ফীতি ১২% সকল পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইলেও ভরসার জায়গা থাকিত। কিন্তু খাদ্য সামগ্রীতে উহা অন্ততঃ ৪০-৫০% -এ হাঁটিয়া বেড়াইতেছে বলাই বাহুল্য। কোন কোন ক্ষেত্রে উহা ১০০-১৫০%-এ উন্নীত হইয়াছে ভূক্তভূগী মাত্রই উপলব্ধি করিয়া থাকিবেন।
এই মুহুর্তে আমাদের মহামাণ্য দূর্ণীতিমুক্ত সরকার দূর্ণীতিযুক্ত সরকারগুলির সম আচরণ কোনভাবেই কাম্য নহে। বরং সঙ্গতকারণেই শিক্ষিত, পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সুদুরপ্রসারি সরকারি সিন্ধান্ত পূর্বের কূপমণ্ডুক সরকারগুলির সঙ্গে একটি স্পষ্ট রেখা টানিয়া দিতে পারিত। কিন্তু মূর্খ আমজনতা চক্ষু গোল করিয়া যাহা পর্যবেক্ষণ করিতেছে তাহা মোটেও সুখকর নহে। বিশেষতঃ খাদ্যশস্য উৎপাদনে খাস নজর প্রত্যাশিত ছিল বলিয়াই মূর্খ আমজনতার বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে তাহার উল্টা কিছু ঘটিয়া চলিতেছে। আমন মৌসুমে কৃষককুল দিশেহারা হইবার যোগাড়। গত মৌসুমে যে ইউরিয়ার মূল্য ৩১০ টাকা নির্ধারিত ছিল বতৃমানে তাহা বাড়িয়া ৬২০ টাকা ছাড়িয়া গিয়াছে। ১৪০০ টাকার টি.এস.পি সার কাহার ইঙ্গিতে ৩৫০০ টাকায় ঠাঁই নিয়াছে তাহা ভাবিবার বিষয়। তিনমাসে কীভাবে সারের মূল্যে এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হইতে পারে তাহা মূর্খ আম-জনতা কিছুতেই বুঝিয়া উঠিতে পারে না। কৃষি উৎপাদন নিরুৎসাহিত করিবার এহেন প্রক্রিয়া স্মরণকালে কাহারও প্রত্যক্ষ করিবার সুযোগ হইয়াছে বলিয়া অন্ততঃ এই অধমের মনে হইতেছে না। উপরন্তু নুতন এক পদ্ধতি যোগ হইয়া এদেশর কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংশের ব্যবস্থা পোক্ত হইয়াছে। কেহ বিশ্বাস করিতে না চাহিলেও ইহাই সত্য যে, কৃষক বিঘা প্রতি প্রত্যেক ডোজে ১০-২০ কেজি সার প্রয়োগে অভ্যস্ত থাকিলেও বর্তমানে তাহাকে দেওয়া হইতেছে ৩-৪ কেজি। ২০ কেজির স্থলে ৪ কেজির বরাদ্দ উৎপাদন ব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলিতে পারে তাহা বিবেচনা করা মোটেই দুরুহ বিষয় নহে। অর্থাৎ খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও এর মূল্য আগামিতে কোন অবস্থানে পৌঁছিবে তাহা সহজেই অনুমেয়। আর কৃষকের মেরুদণ্ড ভাঙ্গিয়া গেলে তাহা কোন মঙ্গলের সূচনা করিবে সেই অঙ্ক কষিবার সময় এখনই। দেরি হইয়া গেলে ক্ষতি যে আমজনতার তাহা বলিবার অপেপক্ষা রাখে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


