রাজনীতির রুই কাতলারা যখন বন্দি হন পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে ছাপানো হয়। আবার অবমুক্ত হবার খবরটিও একইভাবে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়। ভবিষ্যতের কাণ্ডারি এসব রাজনীতিকদের ঘিরে আমাদের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে বলেই পত্রিকাগুলো তাঁদের ব্যাপারে এতটা স্পর্শকাতর। আমাদের যথেষ্ট আগ্রহ আদপে এটা প্রমাণ করে না যে তাঁরাও আমাদের প্রতি সমভাবে সংবেদনশীল। আমজনতার অনুভূতির পারদ অনেকটাই উঠানামা করে পারিবারিক বাজেট সংকুলানের গতি প্রকৃতির উপরে। এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করা সাধারণের ভাগ্য নিয়ন্তা সরকারযন্ত্রের পক্ষে বেশ কঠিন বৈকি!
এই কিছুদিন আগে জোট সরকারের ডালভাত তত্ত্বের হাস্যকর পরিণতির কথা আমাদের বেশ মনে আছে। ডালের অভূতপূর্ব মূল্য বৃদ্ধি মানুষের বিরক্তির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দ্রব্যমূলের মূল্য বিস্ফোরণ মানুষের সীমাহীন দূর্ভোগের কারন হয়ে দাঁড়ালেও এই জন-দূর্ভোগ জোট সরকারের সীমাহীন দূর্ণীতিকে কোনভাবেই প্রভাবিত করতে পারেনি। বরং দূণীতির সর্বব্যাপী বিস্তারে লাল্টু-বল্টু নামধারী ব্যক্তিবর্গের ভাগ্যের চাকা দ্রুততার সঙ্গে ঘুরতে থাকলেও সাধারণের জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।
জনগনের দূর্ভোগের মাত্রার চরম পরিণতি নিশ্চিত হয়েছে বর্তমানের এই শিক্ষিত সমঝদার সরকারের আমলেই। হালের এই দূর্গতির কারন হিসেবে সরকারের তরফ থেকে হাজারো যুক্তি উত্থাপিত হওয়ার অবকাশ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূদ্রাস্ফীতির অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ এই চরম অধোগতির মূখ্য কারন। জাতিসংঘের বিবচেনায় ২০০৭ সালে চাল, আটা ও সয়াবিনের গড় মূল্য বৃদ্ধি যথাক্রমে ৭৬%, ১৩০% ও ৮৭%। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্টভাবে খাদ্যসামগ্রীর গড় মূল্যবৃদ্ধি ৪০-৪৫% হলেও কোন কোন পণ্যের ক্ষেত্রে তা ১০০-১৫০% ছাড়িয়ে গেছে। এটি সর্বজন স্বীকৃত যে খাদ্যসামগ্রীর ব্যাপক মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব ধনী দেশের তুলনায় গরিব দেশের জনগণকে পর্যুদস্ত করে বেশি। ধনী দেশে পারিবারিক আয়ের মাত্র ১৫% খাদ্য যোগানে ব্যয়িত হলেও গরিব দেশে এর পরিমান ৮৫%। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ বিণয় স্বরূপের মতে মূল্যবৃদ্ধির কারনে দেশের প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ নুতন করে দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে প্রতি বছর অন্ততঃ দুই লক্ষ মানুষ মোট জনসংখ্যার সাথে যুক্ত হচ্ছে। এমতাবস্থায় খাদ্য পণ্যের উত্পাদন বৃদ্ধির সম্ভব সকল ব্যবস্থা সরকারের তরফ থেকে গৃহিত হবে এটাই স্বাভাবকি। কিন্তু বাস্তবে সরকারের তরফে ঠিক উল্টো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়েছে।
১. সারের অস্বাভাবিক ও অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি উত্পাদন প্রক্রিয়াকে নিরুত্সাহিত করবে এটা বোঝার জন্য পি.এইচ.ডি ডিগ্রিধারি হতে হয় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি সরকার এই সহজ সমীকরণটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। কী উদ্দেশে কৃষককে গত মৌসুমের ১৪০০ টাকার টি.এস.পি বর্তমানে ৩৫০০ টাকায় কিংবা ৩১০ টাকার ইউরিয়া ৬১০টাকায় কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে তা মোটেও বোধগম্য নয়। তিন মাসে সারের এই অবাঞ্চিত মূল্য বৃদ্ধি কিসের ইঙ্গিত?
২. দেশে বিঘাপ্রতি ইউরিয়া সারের ব্যবহার প্রতি ডোজে ১০-২০ কেজি। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে সরকার বিঘাপ্রতি বরাদ্দ রেখেছে ৩-৪ কেজি। উত্পাদন প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব সহজেই অনুমেয়।
৩. সার সংগ্রহে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অশুভ হস্তক্ষেপ প্রান্তিক কৃষককে প্রতিনিয়ত কোনঠাসা করছে।
এই পুরো প্রক্রিয়া উত্পাদন ব্যবস্থাকে দুইভাবে প্রভাবিত করছেঃ
১. উত্পাদন ব্যবস্থায় টিকে থাকার সংগ্রামে প্রান্তিক কৃষক ক্রমাগতভাবে ঋণগ্রস্থ হয়ে এন.জি.ওদের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করছে;
২. পুরো কৃষি উত্পাদন প্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত সামর্থবানদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে প্রান্তিক কৃষকের উত্পাদন ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়ার সমুহ সম্ভাবনা। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
বোরো মৌসুমে বর্তমানের বর্ধিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি বিঘা জমিতে উত্পাদন খরচ দাঁড়াবে ৬০০০ টাকা। একজন প্রান্তিক কৃষক ৫ বিঘা জমি চাষের পরিকল্পনা করলে তাঁর অন্ততঃ ৩০০০০ টাকা বিনিয়োগের সামর্থ থাকতে হবে। পাঠক মাত্রই উপলব্ধি করবেন যার 'নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা' তাঁর পক্ষে ৩০০০০ টাকার যোগান দেয়া কতখানি কষ্টকর। কিংবা এই ৩০০০০ টাকার উত্স কোন প্রকৃতির ভয়াবহ দানবের অনুকম্পা হতে পারে সেটি কল্পনা করা মোটেও কষ্টসাধ্য নয়।
কৃষির এই বেহাল দশা এখনও পর্যন্ত সরকারসহ চিহ্নিত সুশীল সমাজের (!) মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কি? নাকি প্রশিক্ষিত আনসার বাহিনী বাজারে লাঠি ঘুরালেই খাদ্যপণ্যের মূল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিয়ন্ত্রিত হবে, বোধগম্য নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


