
বছরের সব দিন সমান নয়। কোন কোন দিন রৌদ্রজ্জ্বল, কোন কোন দিন মেঘ-টলমল। কোন কোন দিন দাহগুণবিশিষ্ট, কোন কোন দিন ঝড়-বৃষ্টিযুক্ত।
দৈর্ঘ্যের মাপকাঠিতেও পরিমাপ হয় দিনের। ২১ জুন বছরের সবচাইতে বড় দিন। আবার বছরের সবচাইতে ছোট দিনটি ডিসেম্বরে।
দৈর্ঘ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী সবচাইতে ছোট দিন হল ২২ ডিসেম্বর। যদি তাই হয়, তবে ২৫ ডিসেম্বর কীভাবে বড়দিন হয়!
আসলে ২২ ডিসেম্বরের পর থেকে কমতে থাকে রাতের দৈর্ঘ্য। বড় হতে থাকে দিন। গবেষণাধর্মী কিছু প্রতিষ্ঠান খ্রিস্টানদের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব বড়দিনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এধরনের একটি বিষয়কে গুরুত্ব প্রদান করলেও ২৫ ডিসেম্বর উদযাপিত বড়দিনের সঙ্গে সম্ভবত দিন বড় কিংবা ছোট হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। ২৫ ডিসেম্বর অবশ্যই ‘বড়দিন’। সেই বড়দিন মানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। মহামানব যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন।
মহামানব যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন বা খ্রিস্টমাস খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আদিযুগীয় খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, খ্রিস্টমাসের এই পবিত্র তারিখের ঠিক নয় মাস পূর্বে মেরির গর্ভে প্রবেশ করেন যিশু।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা সংক্রান্ত একাধিক ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে, কুমারী মেরির গর্ভে তাঁদের মসিহা বা ত্রাণকর্তার জন্ম হয়। নুতন বাইবেলের ‘মথি-লিখিত সুসমাচার’ এবং ‘লূক-লিখিত সুসমাচার’-এ বর্ণিত যিশুর জন্মকাহিনী খ্রিস্টমাস উৎসবের মূলভিত্তি। সেই কাহিনী অনুসারে, বেথলেহেম শহরে যিশুর জন্ম দেন মেরি। জনবিরল একটি এলাকার একটি আস্তাবলে গবাদি পশু পরিবৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহামানব। লূক-লিখিত সুসমাচার-এ উল্লেখ আছে, ‘-তিনি আপনার প্রথমজাত পুত্র প্রসব করিলেন এবং তাঁহাকে কাপড়ে জড়াইয়া যাবপাত্রে শোয়াইয়া রাখিলেন- ‘
যিশুর জন্ম-সংক্রান্ত বিভিন্ন চিত্রে যাবপাত্র ও গবাদি পশু পরিবৃত একটি স্থানে যিশুর জন্মদৃশ্য দেখা যায়। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, এক স্বর্গদূত বেথলেহেমের পারিপার্শ্বস্থ মাঠের মেষপালকদের যিশুর জন্ম সম্বন্ধে অবহিত করেন। সেই মেষপালকরাই দিব্য শিশুকে প্রথম দর্শণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, যিশুর জন্ম আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীগুলিকে পূর্ণতা দেয়। মথি-লিখিত সুসমাচার অনুসারে, কয়েকজন জ্ঞানী ব্যাক্তি স্বর্ণ, গন্ধতৈল ও ধূপ নিয়ে শিশুটিকে দর্শন করতে যান। একটি রহস্যময় তারা জ্ঞানী ব্যাক্তিদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় দিব্য শিশুটির কাছে। তারাটি বেথলেহেমের তারা নামে সুপরিচিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কাছে।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব খ্রিস্টমাস শব্দটি ইংরেজী। ইংরেজী খ্রিস্টমাস(Christmas) শব্দটির উৎপত্তি আদি ইংরেজি Cristes maesse শব্দবন্ধ থেকে। Cristes শব্দটি গ্রিক Christos এবং Maesse শব্দটি লাতিন Missa (পবিত্র উৎসব) থেকে উদগত।
আবার প্রাচীন গ্রিক ভাষায় X হল Christ বা খ্রিস্ট শব্দের প্রথম অক্ষর। এই অক্ষরটি লাতিন অক্ষর X এর সমরূপ। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে X অক্ষরটি খ্রিস্ট শব্দের নামসংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে খ্রিস্টমাসের নামসংক্ষেপ হিসেবে এক্সমাস শব্দটিও বহুল প্রচলিত হয়।
গবেষকদের মতে, খ্রিস্টমাসকে উৎসবের রূপ দেবার সূচনা প্রাচীন রোমে। রোমান ফসল উৎসব অথবা উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ অয়নান্ত দিসের অনুষঙ্গেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুর জন্মদিন পালনের প্রথাটির সূত্রপাত হয় উৎসবমুখরতার সাথে। খিস্টান ধর্মাবলম্বীদের এই উৎসব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে।
আমাদের এই অঞ্চলে খ্রিস্টধর্মের প্রচলন হয় প্রধানত ঔপনিবেশিক শাসনের সূত্র ধরেই। ১৬ শতকে অবিভক্ত বাংলায় পর্তুগীজদের মাধ্যমে ভিত্তি স্থাপিত হয় খ্রিস্টান ধর্মের। এই অঞ্চলে প্রথম চার্চটিও স্থাপন করে পর্তুগীজরা। ১৫৯৯ সালে বৃহত্তর যশোর জেলার কালিগঞ্জে স্থাপিত হয় সেই চার্চটি।
পর্তুগীজদের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হলেও বাংলায় খ্রিস্টমাস উৎসবের প্রচলন করেন আধুনিক কলকাতা নগরীর পত্তনকারী হিসেবে সুবিখ্যাত জব চার্ণক।
১৬৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কার্যোপলক্ষ্যে হিজলি যাচ্ছিলেন জব চার্ণক। হিজলি যাবার পথে সুতানুটি গ্রামে আসার পর জব চার্ণক দেখলেন খ্রিস্টমাসের সময় প্রায় সমাসন্ন। অতএব সেখানেই যাত্রাবিরতি করলেন তিনি। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে প্রথানুযায়ী পালন করলেন খ্রিস্টমাস উৎসব। তারপর থেকেই আমাদের এই ভুখণ্ডে খ্রিস্টমাস উৎসব পালনের প্রথা শুরু হল। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক প্রবৃত্তিও আনন্দিতচিত্তে অংশগ্রহণের উপলক্ষ্যে পরিণত করল খ্রিস্টমাসকে অর্থাৎ বড়দিনকে।
ছবি: সংগৃহীত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


