শেষ পর্যন্ত যখন তাহাকে পেলাম মনে হলো আমি যেন আসলেই কিছু একটা পেলাম। নিজেকে মনে হলো যেন যুদ্ধজয়ী একজন বীর। তাই পাবার আনন্দে ২ টাকা দান করে একটা “বাংলাদেশ প্রতিদিন” কিনে ফেললাম। না বেশি খুশি হবার কিছু নাই। কোন প্রেমিকা বা চাকুরির কথা বলছিনা। কথা হচ্ছে আমার বাসা থেকে ক্যাম্পাসে যাবার জন্য রিক্সা পাবার বিষয়ে। আমার বাসা থেকে দোয়েল চত্তরে যাবার মোটামুটি ৫ রুটের সবচেয়ে কষ্টের, বিপজ্জনক, লম্বা রাস্তাটাকে রেহাই দিয়ে বাকি সব কয়টা রাস্তাই এখন বন্ধ। হয় ফ্লাইওভারের কাজের জন্য কিংবা ভি.আই.পিদের ঠেলা গাড়ির জন্য। এমন পরিস্থিতিতে খবর পেয়েছিলাম ঢাকা রিক্সাচালক সমিতির নেতারা জরুরি সভা ডেকে পরিবেশের উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ওই রাস্তাটাকেও বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই “দুই চার টাকা বেশি পাবেন ” এই রকম ঘুষের প্রলোভন দেখিয়ে আমার চেয়েও অসহায় কোন চালক ভাইকে রাজি করানোটা প্রতিদিনের রুটিনে পরিনত হয়েছে। যা হোক ক্রমাগত ঝাকুনিতে এমন উচ্চমাত্রার চিন্তা করা যায় না। ফিরে আসতেই হয় বাস্তবে। বাস্তবে আসিয়া দেখলাম মামা (রিক্সাচালক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিং পুলের সামনের রাস্তায় রিক্সাটাকে মোকাররম ভবনের দিকে নেবায় যুদ্ধে ব্যস্ত। কিন্তু মেডিকেল থেকে আসা ভি.আই.পিদের অতি দামি গাড়ির উচ্চপ্রশিক্ষন প্রাপ্ত চালকরা যেন পন করছে তারা এই অবাঞ্ছিত ত্রিচক্রযানটাকে কোন ভাবেই তাদের লেনে ঢুকতে দেবেনা। কিন্তু মানুষ ঠেকেই শিখে। মামাও জানে কোনভাবে খালি রিক্সার মাথাটা ঢুকিয়ে দিতে পারলেই হবে। এরপর তাকে সাইড দিতেই হবে। তাকে ঠোকর মারার সাহস অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন গাড়িচালকের হবেনা। জান মালের মায়া কার না আছে! সায়েন্স লাইব্রেরী পার হয়ে ডিপার্টমেন্টের সামনে থামার পর মনে হলো যেন কয়েক ঘন্টা যুদ্ধ করে এলাম।ভাড়া দিবার সময় মামার প্রশ্ন শুনে আমার মাথায় যেন বাজ পরলো।
“মামা আপনারা এইডা কেমন পড়া পড়েন? বেশির ভাগ সময়তো খালি বাইরেই বয়া থাকতে দেহি। ”
বুঝলাম মামার কার্জন হল আর টিএসসিতে ভালো রকম সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা আছে।
“আরে ওরা বাইরের বা নতুন আইছে ।”
এরুপ ভংচং মেরে অতিদ্রত কেটে পড়লাম। বেশিক্ষন থাকলে পরে আবার কিরুপ প্রশ্ন শুনতে হয় তার কোন ঠিক আছে?? লিফটে দেমাগী মেয়েটার সাথে দেখা হয়ে গেলো। “এই আজ না ল্যাব ভাইভা আছে? কিছু পড়েছিস? ”
সুন্দরীর এরুপ প্রশ্নে আমিতো চোখে আন্ধার দেখতে লাগলাম। গত ল্যাবে স্যার ভাইভা বিষয়ে কিছু একটা বলতেছিলেন, কিন্তু ডাউনলোডের নেশায় মত্ত আমার কানে তখন আর কিছু ঢুকেনাই। তার ফলাফল আজকের এই দুনিয়া আন্ধার হয়ে যাওয়া। যা হোক যথারীতি আসমান থেকে পড়লাম।
“তাই নাকি? কবে বলসিলেন? ”
এইবার সুন্দরীর পালা। সে অবাক হয়ে বলল,
“তুই জানিস না? নাকি স্যার বাতিল করে দিয়েছে, আমি জানি না? ”
ওইযে কথায় আছে না সুন্দরীদের বুদ্ধি একটু কমই হয়। তাদের অতি সহজেই কনফিউজ করে ফেলা যায়। এই ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমার আসমান থেকে পড়া এতটাই ন্যাচারাল হয়েছে যে বেচারীই কনফিউজ হয়ে গেছে। উহার চিন্তিত মুখ খানি দেখিয়া মায়াই হইলো। বললাম,
“নারে আমিই আসলে জানতাম না। স্যার বলে থাকলে আজ হবে।”
যাক তাহার মুখে হাসি ফিরিয়া আসিলো। সাথে সাথে লিফটও আমাদের গন্তব্যে এসে পড়লো। লিফট থেকে নামতেই সিঙ্গেলের কবলে পড়লাম। তাঁর সাথে সিঙ্গেল একটা টিটি ম্যাচ খেলতেই হবে। যাহোক খেলা শেষ করে ক্লাসে গিয়ে দেখি স্যার রোল কল করে ক্লাস শুরুও করে দিয়েছেন। বিষাদমনে ক্লাস করতে হলো। কারন ক্লাসও করতে হবে আবার এটেন্ডেন্সও পাবো না। ক্লাস শেষ করে যাবার আগে বলে গেলেন আগামী সপ্তাহে একটা ইনকোর্স পরীক্ষা হবে। সিলেবাস মেইল করে দিবেন। তার মানেই বিশাল সিলেবাশ। কিন্তু বাশ যে কখনো একা জন্মায় না! পুরা বাশঝাড় একসাথে হয়। কথাটার মান রাখতেই যেনো পরের সবকটা ক্লাসেই পরিক্ষার ডেট দেওয়া হতে লাগলো। তার উপর বোনাস হিসেবে কয়েকটা ল্যাব এসাইনমেন্ট প্লাস ভাইভা তো রইলোই। বসে বসে ভাবতে লাগলাম এরুপ অত্যাচারের মানে কি? এটা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিভাগ না র্যাবের ছদ্দবেশী কোন টর্চারসেল। যেখানে টর্চার এক্সপার্টরা টীচারের রুপে কাজ করে, আর স্পাই হিসেবে আমাদের মাঝে মানবরুপী কিছু রোবটকে ছাত্র ছাত্রী বানিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই স্পাইরা যেমন স্পাইগিরি করে তেমনি নিজেদের রোবট ধর্মের প্রমানও খুব ভালো ভাবে দিয়ে যাচ্ছে। আরে ভাই সব পরীক্ষাতেই যদি তোমরা বিশে বিশ আর ত্রিশে সাড়ে ঊনত্রিশ পাও তবে আমাদের মতো নরমাল ছাত্রদের লাইফ যে কেমন হয় তা কি কখনো ভেবে দেখেছো??
দুপুরে মেডিকেলের সামনে পেট্রলে ভাজা পুরী আর পেয়াজু দিয়ে সিংহ মামাকে কিছুটা শান্ত করে ভাইভা দেবার জন্য ল্যাবে এলাম। ল্যাব শুরু হতে দেরি আছে। তার মাঝেই টাউট মাইয়াটার কবলে পড়লাম। তাহার সাথে কি কথা হলো তা বলে আর বিরক্ত করতে চাইনা। বিশ মিনিটের কথা বার্তার একটাই বিষয়, আমি এতো কিপটা কেন? তাহাকে আমি এখনো কঠিন ভাবে একটা খাওয়া দিচ্ছিনা কেন? অদূর ভবিষ্যতে তাকে খাওয়াবো এই মর্মে কথা দিয়া আমি টুক করে ল্যাবের ঢুকে পড়লাম। স্যার তখনো আসেননি। মনের সুখে বাফারিং ছাড়া YOUTUBE এর ভিডিও দেখতে লাগলাম। কিন্তু ওই যে অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। আমার এই ক্ষনিকের সুখ বিধাতার সহ্য হলো না। তিনি পাশের পিসিতে মুর্তিমান আতংকটাকে এনে বসালেন। উঠে যে সিট চেঞ্জ করবো তারও উপায় নেই। স্যার চলে এসেছেন। আজ মেসেঞ্জারে কি পরিমান পচানিটা যে খাবো বসে বসে তার চিন্তা করতে লাগলাম। তবে হ্যা আমি আবার ক্লাসের সবচেয়ে জেন্টেলবয়। মনে মনে কি হচ্ছে তা মনে রেখেই ম্যাডামের সাথে হাসি মুখে কথা চালিয়ে গেলাম। সুনাম রটে যাবার এই আরেক অসুবিধা।
“ভাইভা কি দিবোরে? কিছুইতো পড়িনি। ” ম্যাডামের কথা।
দেখেন আমাকে কয় কিছু পড়িনি। আরে আমিতো জানতামও না। পড়াতো অনেক দূরে।
“আরে কিছু হবে না। কোন সমস্যা নাই।” মুখে কিঞ্চিত হাসি নিয়া আমি বললাম। ভাবখানা এমন যেন আমি সব পড়ে এসেছি। ভাইভায় ওরে সবকিছুই বলে দিবো।
“আমাকে একটু হেল্প করিস।” ম্যাডামের সাহায্য প্রার্থনা।
“আরে তুইই পারবি, আমার হেল্প লাগবেনা। আর লাগলে আমিতো আছিই।” আমার জবাব।
এরুপ আশ্বাসে তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠলো।আর আমি স্যারের জন্য ওয়েট করতে লাগলাম।
সবার যেখানে পাচ সাত মিনিট করে সময় লাগলো, আমার সেখানে এক মিনিটেই শেষ। আসলে স্যারকে প্রশ্ন করারই সুযোগ দেইনি। প্রথমেই আমার সীকারোক্তি। কিছুই পড়িনি,পারিওনা। এরপর কোন স্যারেরই আর ভাইভা নেবার ইচ্ছা থাকেনা। তাই স্যারও আমাকে চলে যেতে বললেন। আমিও ডানে বামে না তাকিয়ে সোজা বেরিয়ে গেলাম। বের হবার সময় দেখি ম্যাডাম আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এরপর ডিপার্টমেন্টে থাকাটা আর সেইফ না বিধায়, বাসার দিকে হাটা ধরলাম। কারন যাবার সময় ঘুসের লোভেও কাজ হয়না। কোন রিক্সাই রাজি হয়না। তখন আমার পা’দুটাই সম্বল।
বিঃদ্রঃ লেখায় বর্নিত সকল চরিত্র বাস্তবে আছে। তাদের সাথে মিলে গেলে তা পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত। তবে এর জন্য তারা মাইন্ড করলে তার দায় আমার না।-লেখক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


