somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারতবর্ষ থেকে বাংলাদেশ, শিক্ষায় ধর্মীয় চেতনার প্রভাব

০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ভারতবর্ষে হিন্দুদের চেয়ে মুসলিমরা পড়াশোনায় কেন পিছিয়ে ছিল এটা নিয়ে অনেক থিয়োরী আছে। থিয়োরী বলাটা ভুল হইলো, বলা যায় ফ্যাক্টস-ই আছে কিছু। প্রথম যারা মুসলিম হইলো হিন্দু থেকে তারা মূলত নিম্নজাতের হিন্দু অর্থাৎ শুদ্র থেকে হলো। তাদের হিন্দু হিসেবেও আসলে এমন কোন সামর্থ্য ছিল না যে তারা পড়াশোনা করবে। কাজে মূলত মুচি, মেথর, ঝাড়ুদার ইত্যাদি ছিল। ব্রাক্ষ্মনদের অত্যাচারের ঠেলায় মুসলিম হইলো যেখানে আসলে তাদের বলা হইছে কোন জাত পাত নাই। তো নয়া মুসলিমদের যা হয়, ধর্মটাই আসলে সব ভেবে আঁকড়ে ধরা, তারা তার বাইরে ছিলো না।

তখনকার সময়ে উচ্চতর পড়াশোনা নিয়ে এমনকি গোঁড়া হিন্দুদের ভেতরেও একটা অনীহা ছিল, যেহেতু কালাজল পাড়ি দিতে হবে উচ্চশিক্ষা নিতে হলে। তো পশ্চিমা সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হইলে ধর্মের ক্ষতি হবে এরকম একটা কথা প্রচলিত ছিল। তাই মুসলিমরা মক্তবে সর্বোচ্চ ফার্সি ও আরবী, যা আদতে ভারতবর্ষের পশ্চিম থেকেই আগত, শিখত, যা মূলত ভাষা শিক্ষা ছিল। আর হিন্দুরা টোল বা পাঠশালায় শিখত ধর্ম, দর্শন, তর্কবিদ্যা ও প্রাচীন সাহিত্য। মুসলিম রাজারা মূলত মাদ্রাসা বানাতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।

মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ২৫ বছরের শাসনামলে শুধু দিল্লিতেই প্রায় এক হাজার মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুধু তরবারিতে ভারত জয় করা যাবে না দেখে সাবেক ডাকাত থেকে শাসক হওয়া অনেক তুর্কি, ইরানী, আফগানী মুসলিম শাসকেরা নিজেদের ধর্ম বাড়াতে মন দেয়। জ্ঞান, অংক শাস্ত্র বা বিজ্ঞানের কোন ধারার পড়াশোনা ছিল না মুসলিম সমাজে। আরো একটি কারন ছিল অন্তর্নিহিত, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত যারা পড়াতেন তারা অনেকেই মুলত খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী মিশনারী, তাদের কাছে পড়তে গেলে খ্রিষ্টান বানিয়ে দেবে ও জমি কিংবা বৌ নিয়ে নেবে এরকম একটা ভীতি ছিল সমাজে। যেটা হয়তো শতভাগ অমূলকও ছিল না। মিশনারীদের মূল উদ্দেশ্য শুধু সেবা ছিল না।
তো হিন্দু সমাজের তুলনায় এই যে পিছিয়ে পড়ার শুরু, সেটা কিন্তু সেই সময়ে আবদ্ধ থাকেনাই।

বাইরে থেকে আসা লম্বা দাড়িওলা মোল্লা বা মৌলভী দেখলেই শ্রদ্ধা ভরে হিন্দু ধর্মের গুরু বা বাবা ধরার অনুকরনে মুসলিমরা পীর ধরা শুরু করলো। পীরদের ধর্মীয় প্রভাব ও প্রতিপত্তি এতটাই বাড়লো যে তারা এমনকি রাজাদের সাথেও যুদ্ধ করে এলাকা দখল করে নিজের রাজত্ব বসাতে লাগলেন। কিন্তু জনগন শিক্ষিত করলে তো পীরালী কমে যাবে। তাই পীররাও সেই পথে হাঁটেননি। পরে ইংরেজরাও এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়নি। মূল কারন শ্রমিক তৈরী। স্কুলে গেলে মাঠে যাবে কে? মুসলিম ভারতীয় সমাজও তাই-ই ভাবতো, ধর্মবিরোধী ও কৃষিবিরোধী পড়াশোনা তাই করবে কোন যবন?

এই মুসলিম সমাজের ভেতর সবচেয়ে শিক্ষিত ছিলেন মুন্সীরা, যারা আসলে ফার্সী ভাষা ভালো জানতেন, সরকারীভাষা দাপ্তরিক ভাষা ফার্সি হবার কারনে যারা সরকারি কাজ করতেন। মুন্সী পদবিধারী সবাই যে মুসলিম ছিলেন, তা নয়, বহু হিন্দুও ছিলেন মুন্সী পদবী ধারী। ফার্সি ভাষা থেকে আসা এই শব্দের অর্থ হলো কেরানী বা সেক্রেটারি। সরকারী কাজের পাশাপাশি এই মুন্সীরা জমিদারদের জমি জায়গার কাগজপত্র ও দাপ্তরিক কাজও সামলাতেন।

পরের দিকে এসে কিছু ইংরেজ শাসক প্রাচ্যের এই শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন দেখতে চান। ১৭৭১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস এর উদ্যোগে কলকাতায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়, যেখানে মূলত পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার সাথে প্রাচ্যের শিক্ষার এক মেলবন্ধনের চেষ্টা চলে। সেরকম তার কিছু বছর পরে জোনাথন ডানকান বেনারসে সংস্কৃত কলেজ চালু করেন। এটা মনে করার কোন কারণ নেই উনারা ভারত বর্ষের প্রেমে পড়ে সেটি করেছিলেন, মূলত তাদের কিছু কেরানীর দরকার ছিল যারা ইংরেজ শিক্ষা ও মূল্যবোধের সাথে পরিচিত হবে এবং শাসকদের সাথে জনগনের মিথস্ক্রিয়ায় মধ্যবর্তী ভূমিকা পালন করবে। ইংরেজ বিচারকদের মুহুরী হিসেবে এসময় অনেক ভারতীয় এসব কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে কাজ শুরু করেন।

বর্তমানে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি মুসলিমদের যে ক্রোধ বা ঘৃণা, সেটা তাই অনেক গভীরের। মূলত যারা বিজ্ঞান পড়ে তারা ধর্মের সাথে কন্ট্রাডিকটরি বলে নাস্তিক হয়ে যেতে পারেন বলে কাঠমোল্লাদের ভয়। আর নিয়মিত চোদ্দশ বছর আগের চাঁদ দুইভাগ, ঘোড়ায় চইড়া হাসরে যাবার মত হাস্যকর কথাবার্তা তরুনদের আরো ধর্ম বিরোধী করে তুলতে পারে বলে মোল্লাদের টার্গেট হয়ে দাড়িয়েছে আজ বিজ্ঞান।

ধর্মের ইতিহাসের সাথে মানবজাতির ইতিহাস মেলেনা। আর যেহেতু মেলেনা সেহেতু সমাজ বিজ্ঞান হোক আর পদার্থ বিজ্ঞান হোক সবই ছুড়ে ফেলে দিয়ে তরবারী আর বালুর দেশের বেদুঈন হয়ে থাকতেই রাস্তার মোড়ে মাইক নিয়ে বসে থাকা ভিখিরিদের নেতারা বেশি পছন্দ করেন। সেজন্যই হৃদয় মন্ডলরা ধর্ম ও বিজ্ঞানকে আলাদা বলতে চেয়েও জেলে যেতে বাধ্য হন। এখনো তাই বিকট শব্দে পৃথিবী ধ্বংশ হয়ে যাবে বলাতে লাখে লাখে মানুষ বিশ্বাস করতে থাকে। আদৌ এর পেছনে বিজ্ঞানের গ্রহনযোগ্য ব্যাখা আছে কিনা সেটা ভাবেই বা কতজন?

বাংলাদেশ আজ কোন পথে যাবে তার চেয়ে বড় কথা বড় প্রশ্ন হলো ধর্ম আজ কোন পথে যাবে। অসার প্রাচীন পুরাতন অবসোলেট ধর্মকে নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিজ্ঞানকে স্বীকার করে নিয়ে আধুনিক হবে নাকি সময়ের সাথে মূর্খতার অবসান ঘটবে সেটা সময়ই বলে দেবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:১৫
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×