কয়েকদিন আগে ঢাকা বইমেলাতে রক্তদান করে বাসায় ফিরে হঠাৎ অসুস্হ হয়ে পড়ে আমাদের জহির। রাতেই মারা যায় সে। কেন, কেউ জানেনা।এই লেখাটি আমাদের আরেক বন্ধু কাইয়ুমের লেখা। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়েছি নয় বছর হয়ে গেলো; অথচ মনে হয় এই সেদিনের কথা।
"আমরা গাজীপুর পৌঁছাই ১১টার কিছু আগে। জহিরকে রাখা হয়েছিলো বাসায় ঢোকার আগের খোলা জায়গাটাতে। কেউ একজন এসে কাফনের কাপড়টা সরিয়ে ওর মুখটা দেখালো। চোখের কাছটায় সুরমা দেয়াতে কিছুটা নীলচে হয়ে আছে মনে হলো। এছাড়া অন্যকোনো অস্বাভাবিকতা নেই। প্রথম দেখাতে কোনো অনুভূতিই হলোনা। কিভাবে হবে? আমাদের সুফির লাশ কাফনে মুড়ে খাটিয়াতে শুয়ে আছে আর আমরা ভীড় করে দেখছি, এটা কোনো কথা নাকি?তাই ওই সময়ে ভাবলেশহীন মুখে আমরা দেখে বাড়ির বাইরে এসে দাড়িয়ে থাকলাম। সমস্যা শুধু সিদ্দিকীটাকে নিয়ে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তো পড়ছেই।
জানাজা হলো জোহরের পর। জানাজাতেও কিছু অবিশ্বাস্য কথাবার্তা বললো অনেকে। এই যেমন জহিরুল হক মারা গেছে, কবর দেয়া হবে, দোয়া করবেন সবাই মৃত জহিরের জন্য.......তখনো আমার তেমন একটা ভাবান্তর হলোনা। জানাজা শেষে ওকে গাজীপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে নেয়া হচ্ছে।রাজিব গিয়ে খাটিয়া ধরলো, আর আমরা পেছনে মিছিলে মিশে গেলাম।
কবরে শোয়ানোর পর রাজিবকে দেখলাম কবরের উপরে বাঁশের চাটাই বানাচ্ছে। আমার বুকটা ধ্বক করে উঠলো সেই সময়টাতে। প্রায় তিন হাত মাটির নীচে আমাদের জহির, আমাদের শাহ সুফিকে রেখে দেয়া হচ্ছে। চিরতরে। কে যেনো পাশ থেকে বলে উঠলো কবর দিয়ে চল্লিশ পা হেঁটে যাবার পরপরই কবরে আল্লাহর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে যাবার কথা। আমার কানে তেমন কিছুই ঢুকছিলোনা। যে হুজুর দাফনের কাজকর্ম তদারকি করছিলেন তার বিভিন্ন সুরা ও দোয়া পড়ার একের পর এক নির্দেশনা একটাও কানে ঢুকছিলোনা। আমাদের এতদিনের চেনা জহির বাবাজিকে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়ার সময় আর কিছুই মাথায় আসছিলোনা। এর আগে কখনো কবর দিতে দেখিনি সামনা সামনি। হে আল্লাহ, আমাদের জহিরকে কবর দেয়া হচ্ছে, এটিই দেখতে হলো প্রথম অভিজ্ঞতায়!
কলেজের শেষদিকে এসে পোলাপাইনকে দিয়ে ডায়েরি লেখানোর একটা চল শুরু হলো। আমিও যথারীতি একটা ডায়েরি নিয়ে পোলাপানের কাছে যাওয়া শুরু করবো করবো করছি। জহির এসে সবার আগে প্রথম পৃষ্ঠায় লিখলো, তোকে নিয়ে কি আর লিখবো, প্রায় অর্ধেক কলেজ জীবন পাশের বিছানায় কাটালাম আর বিভিন্নসময় তোদেরকে কষ্ট দিলাম....আমাকে মনে রাখবি তো?
তুই সারা জীবন কি কষ্ট দিলি সেটা অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলামনা। কিন্তু সেদিন মরে গিয়ে কাজটা একদম ঠিক করলিনা। একেবারেই না। দিন পাঁচেক আগে রাজিব আর আজিজের সাথে দেখা করে গেলি। আজিজের কাছ থেকে আমার মোবাইল নাম্বার নিলি। রাজিবের অফিসে বসে তোর কথা শুনে তোকে কল দিতে গিয়েও দিলামনা রাতে বাসায় এসে কল দিবো বলে। কথা বলা হলোনারে, কথা বলা হলোনা ।
হে আল্লাহ, কখনো যদি একটা হলেও ভাল কাজ করে থাকি, সেটার বিনিময়ে হলেও আমাদের সুফিকে তুমি দেখে রেখো....... "

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


