somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবিতা পর্যালোচনাঃ হাওয়ার ধনুক।। শফিক নহোর

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবিতা পর্যালোচনা: হাওয়ার ধনুক
শফিক নহোর


দ্বীপ সরকার-এর 'হাওয়ার ধনুক' কবিতাটি এক অসাধারণ কাব্যিক অভিজ্ঞতার দলিল। অল্প কিছু পঙক্তির মধ্যে কবি এক গভীর বিষাদ, গোপন ব্যথা এবং অপ্রত্যাশিত বিশ্বাসঘাতকতার গল্প বুনেছেন যা পাঠককে দীর্ঘক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে। এটি এমন একটি কবিতা যা বারবার পড়লে নতুন নতুন অর্থ এবং অনুভূতির স্তর উন্মোচিত হয়।
বিষয়বস্তু ও বিন্যাস: কবিতাটির শুরুতেই এক মায়াবী ও বিষণ্ণ আবহের সৃষ্টি হয়। "চারপাশ নীল-করূনমেঘ" – এই চিত্রকল্পটি যেন এক সীমাহীন বিষাদের পটভূমি তৈরি করে। "শন শন শব্দে একটা ধনুক আসে" – এই অংশে ধনুকের আগমন এক রহস্যময়তা এবং অলৌকিকতার ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল একটি ধনুক নয়, যেন এক অদৃশ্য শক্তির প্রতীক যা কবির জীবনকে প্রভাবিত করতে চলেছে।
পরবর্তী পঙক্তিগুলোতে ধনুকটির সাথে কবির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রকাশিত হয়: "ধনুক, আমার বুকের সাথে গোপনে কথা কয়"। এই চিত্রকল্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী। ধনুক যেন কবির অন্তরঙ্গ বন্ধু বা এক গভীর সম্পর্কের প্রতীক যা তার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলোর অংশীদার। কিন্তু এই অন্তরঙ্গতার ফলস্বরূপ আসে চরম আঘাত: "তখনি ঝাঁঝরা হয়ে যায় বুকের পর্দা"। এটি কেবল শারীরিক আঘাত নয়, বরং মানসিক বা আত্মিক ক্ষতকে নির্দেশ করে – এক গভীর ব্যথা যা হৃদয়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশকে বিদ্ধ করে।
এরপর কবি তার টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা বর্ণনা করেন। "ঠোঁটে আমার নকশা খচিত অগুন বিড়ির মতো নয়-কিন্তু পুড়ছে নরম সলতের মতো" – এই উপমাটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। বিড়ির আগুন ক্ষণস্থায়ী এবং তীব্র, কিন্তু নরম সলতের আগুন দীর্ঘস্থায়ী, ধীর এবং নীরবে দহন করে। এটি সেই অব্যক্ত যন্ত্রণা, সেই নিরন্তর জ্বালা যা কবিকে ভেতর থেকে পোড়াচ্ছে, কিন্তু যা সহজে দেখা যায় না বা বোঝা যায় না। "তাতেও আমি টিকে আছি বহু বছর" – এই পঙক্তি কবির অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা এবং জীবনের প্রতি তার অঙ্গীকারের সাক্ষ্য বহন করে।



এবং ঠিক তখনই, শেষ পঙক্তিতে কবিতাটি এক অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়, যা সমগ্র কবিতার অর্থকেই নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে: "অথচ, কে জানতো হাওয়ার ধনুকে বিষ থাকে।" এই লাইনটি যেন এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। আপাতদৃষ্টিতে যা সুন্দর, রহস্যময় বা এমনকি সহায়ক মনে হয়েছিল "হাওয়ার ধনুক", তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল প্রাণঘাতী বিষ। এটি জীবনের সেইসব অভিজ্ঞতা বা সম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত করে যা প্রথমে আকর্ষণীয় মনে হলেও শেষ পর্যন্ত ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। এই অপ্রত্যাশিত বিশ্বাসঘাতকতা কবিতার মূল সুরকে আরও গভীর ও ট্র্যাজিক করে তোলে।
দ্বীপ সরকার-এর ভাষা সহজবোধ্য কিন্তু গভীরে প্রোথিত। প্রতিটি শব্দ যেন মেপে মেপে বসানো, যা অল্প পরিসরে বিশাল এক অনুভূতির জগৎ তৈরি করে।
ব্যঞ্জনা: কবিতাটি সরাসরি কোনো গল্প বলে না, বরং ইঙ্গিতে ও ব্যঞ্জনায় এক গভীর উপলব্ধির দরজা খুলে দেয়।
'হাওয়ার ধনুক' কবিতাটি পাঠককে এক ধরনের অতল স্পর্শী বিষাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এটি ভালোবাসা, বিশ্বাস, বা এমনকি জীবনের আপাত নিরীহ দিকগুলো কীভাবে বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে, তার এক করুণ চিত্র। শেষ পঙক্তির আকস্মিকতা পাঠককে স্তম্ভিত করে এবং কবিতাটি শেষ হওয়ার পরও এর রেশ দীর্ঘক্ষণ মনে রয়ে যায়। এটি যেন জীবনের সেই নির্মম সত্যকে তুলে ধরে যে, সবচেয়ে সুন্দর ও অপ্রত্যাশিত জিনিসও মাঝে মাঝে সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত হতে পারে।
দ্বীপ সরকার-এর 'হাওয়ার ধনুক' একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী কবিতা যা আধুনিক বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর গভীরতা, চিত্রকল্পের ব্যবহার এবং শেষ পঙক্তির অপ্রত্যাশিত মোচড় একে স্মরণীয় করে তুলেছে। যারা গভীর অনুভূতি এবং দার্শনিক চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ কবিতা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য সৃষ্টি।



লেখকঃ কবি,কথাসাহিত্যিক
ঢাকা।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ রাত ৮:০৩
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফেলে আসা শৈশবের দিনগুলি!

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:২১


চট্টগ্রামে আমার ছোটবেলা কেটেছে নানুর বাড়িতে। চট্টগ্রাম হলো সুফি আর অলি-আউলিয়াদের পবিত্র ভূমি। বেরলভী মাওলানাদের জনপ্রিয়তা বেশি এখানে। ওয়াহাবি কিংবা সালাফিদের কালচার যখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম তেমন চোখে পড়েনি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

“Epstein “ বুঝতে পারেন ! কিন্তু রাজাকার,আলবদর,আলশামস আর আজকের Extension লালবদর বুঝতে পারেন না ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:০৮

মূলত এটি একটি ছবি ব্লগ। এক একটি ছবি একটি করে ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কস্টের অধ্যায়।

এপস্টেইন ফাইল দেখে আপনারা যারা বিচলিত, জেনে রাখুন ভয়াবহ আরেক বর্বরতা ঘটেছিলো ৭১এ এদেশেই, আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×