somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্মীয়তা বজায় রাখা ইসলামে ফরজ

২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) একটি মৌলিক নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এটি কেবল সামাজিক শিষ্টাচার নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশিত ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুরআন ও হাদীসে বারবার আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কুরআন এ আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর।” (সূরা আন-নিসা ৪:১)।
এ আয়াত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা তাকওয়ার অংশ। আবার সূরা মুহাম্মদে বলা হয়েছে: “তোমরা কি এমনই করবে যে, যদি তোমাদেরকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়, তবে তোমরা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?” (৪৭:২২)। এখানে আত্মীয়তা ছিন্ন করা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করার মতোই গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাদীসেও এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত আছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৮৪)। এটি প্রমাণ করে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ফরজ বা অত্যন্ত আবশ্যকীয় কর্তব্যের পর্যায়ে।

আরেকটি হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে সিলাতুর রাহিম শুধু আখিরাতের নয়, দুনিয়ার কল্যাণেরও মাধ্যম

রক্তের সম্পর্ক আত্মীয়তার মূল ভিত্তি। “সিলাতুর রাহিম” শব্দে “রাহিম” বলতে মূলত জরায়ু (womb) বোঝায়—অর্থাৎ একই বংশ বা রক্তধারার সঙ্গে যুক্ত সম্পর্ক। ইসলামে “আত্মীয়তা” (সিলাতুর রাহিম) বলতে প্রধানত রক্তের সম্পর্ককেই বোঝানো হয়েছে। যেমন, পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাই-বোন, তাদের সন্তান, চাচা, মামা, ফুফু, খালা ও তাদের সন্তান (চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো, খালাতো ভাই-বোন) ।

শ্বশুর-শাশুড়ি, জামাই, পুত্রবধূ, শ্যালক-শ্যালিকা, দূর আত্মীয়, যদিও সরাসরি রক্তের সম্পর্ক নয়, তবুও পারিবারিক বন্ধন হিসেবে এগুলো রক্ষা করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামে “সুসম্পর্ক বজায় রাখা” (সিলাতুর রাহিম) মানে এই নয় যে প্রতিদিন খোঁজ নিতে হবে বা প্রতি সপ্তাহে দাওয়াত দিতে হবে। এগুলো ভালো কাজ, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে আসল বিষয় হলো সম্পর্ক না ভাঙা, এবং নিজের সামর্থ্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পর্ক জীবিত রাখা। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সিলাতুর রাহিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
“প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে নয়, যে ভালো ব্যবহারের প্রতিদান দেয়; বরং সে-ই প্রকৃত রক্ষাকারী, যে আত্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করলে তা আবার জোড়ে।” (সহীহ বুখারী)

সুসম্পর্ক বজায় রাখার বাস্তব অর্থ
১. সম্পর্ক ছিন্ন না করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো কারণে রাগ, অভিমান বা দ্বন্দ্ব হলেও সম্পর্ক পুরোপুরি কেটে না ফেলা। যোগাযোগের দরজা খোলা রাখা।

২. সময়ে সময়ে খোঁজ নেওয়া
প্রতিদিন না হলেও, সুযোগ ও প্রয়োজন অনুযায়ী খোঁজ নেওয়া—ফোন, মেসেজ বা সাক্ষাতে। অসুস্থতা, বিপদ বা বিশেষ সময়ে খোঁজ নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৩. সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা
আর্থিক, মানসিক বা সামাজিক—যেভাবে সম্ভব সাহায্য করা। ইসলাম সামর্থ্যের বাইরে কিছু চাপায় না।

৪. ভালো আচরণ বজায় রাখা
ভদ্রতা, সম্মান, ক্ষমাশীলতা—এসবই সম্পর্ক রক্ষার অংশ। কেউ খারাপ ব্যবহার করলেও নিজে ভালো আচরণ চালিয়ে যাওয়া উত্তম।

৫. বিশেষ সময়ে যোগাযোগ রাখা
ঈদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে যোগাযোগ ও দেখা-সাক্ষাৎ সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।

এক সাহাবী যখন অভিযোগ করলেন যে তার আত্মীয়রা তাকে কষ্ট দেয়, তখন নবী (সা.) তাকে সম্পর্ক বজায় রাখার উপদেশ দেন এবং বলেন, এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য থাকবে।

সিলাতুর রাহিম সমাজে শান্তি, ভালোবাসা ও ঐক্য সৃষ্টি করে। পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হলে সমাজে পারস্পরিক সহানুভূতি বৃদ্ধি পায়, যা একটি সুস্থ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক। বিপরীতে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা সমাজে বিভেদ, হিংসা ও অশান্তির জন্ম দেয়।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের একটি অপরিহার্য বিধান, যা কুরআন ও হাদীসে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশিত। একজন মুসলমানের উচিত সব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে এই সম্পর্ক রক্ষা করা। কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ সম্ভব।

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৫৮
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুপ্তদের সকল অপকর্মের তদন্ত হোক....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮


সময় যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য!
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- আর অতীতের অনেক ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসছে-
যেখানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত ইব্রাহীমের (আ.) কুরাইশ আহলে বাইতের মধ্যে হযরত আলীর (রা.) মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের সময় সবচেয়ে কম

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৫৯



সূরাঃ ২ বাকারা, ১২৪ নং আয়াতের অনুবাদ-
১২৪। আর যখন তোমার প্রতিপালক ইব্রাহীমকে কয়েকটি বাক্য (কালিমাত) দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, পরে সে তা পূর্ণ করেছিল; তিনি বললেন নিশ্চয়ই আমি তোমাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষকের মর্যাদা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৩


কবিতাটার কথা কি মনে আছে? বাদশাহ আলমগীর একদা প্রভাতে গিয়ে দেখলেন, শাহজাদা এক পাত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে, আর শিক্ষক নিজ হাতে নিজের পায়ের ধূলি মুছে সাফ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×