বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ, আমানতকারীদের উদ্বেগ, ঋণ কেলেঙ্কারির ইতিহাস এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। একদিকে সরকারপক্ষ দাবি করছে যে ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল করা প্রয়োজন; অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করছে যে সরকারের হস্তক্ষেপ ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।এই বিতর্কের মূল কারণ শুধু তাঁর নিয়োগ নয়; বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ সুবিধা গ্রহণ এবং সেই ঋণ আদায়ে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা।
২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের পরপরই একদল গ্রাহক ও বিভিন্ন মহল তাঁর অপসারণ দাবি করে আন্দোলন শুরু করে। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, চেয়ারম্যানের পরিবারের সঙ্গে একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে এবং এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা উচিত হয়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানায় যে খুরশিদ আলম নিজে কোনো ঋণখেলাপি নন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা যায়, তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হয়েছে, কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে ওই ঋণের সঙ্গে জড়িত নন। ফলে আইনগতভাবে তাঁর চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাখ্যা দেয়।
তবে বিতর্কের গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে কেন নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে এত আলোচনা হচ্ছে? গত এক দশকে ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের কয়েকটি ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন তদন্ত ও সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করলেও তার বড় অংশ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, শেল কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ এবং ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার করে ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ বহুবার আলোচিত হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, প্রকৃত সমস্যা হলো ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ পাচার। যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর পরিশোধ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অথচ সেই মূল সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নতুন চেয়ারম্যানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান হলো, ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করে যে তারা আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করার জন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণ। একজন চেয়ারম্যানকে ঘিরে বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ উদ্ধার করা হবে, কীভাবে ব্যাংকগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংকের অর্থ অপব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো খেলাপি ঋণের প্রকৃত দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তাহলেই আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসবে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



