আমাদের দেশের বাড়ি ছিল পটুয়াখালি জেলার কাছিপাড়া গ্রামে। গ্রামের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় ১৯৭৮ সালে, আমার জন্মেরও আগে। গ্রামের অনেক গল্প শুনেছি, ভেবেছি একবার ঘুরে আসব। ঢাকা গেলেও গ্রামের দিকে আর যাব যাব করেও আর যাওয়া হয় না। এখন মনে হচ্ছে আর গিয়ে কি হবে, আছে কি কিছু বেঁচে? আমার এখানে বসে সমবেদনা জানানো ছাড়া কিছু করার নেই মনে হয়।
কিন্তু আজকে সকালে খবরের কাগজে একটা খবর পড়ে মনে হল আমাদেরও অনেক কিছু করার ছিল হয়ত। ভারত সরকার প্রাথমিক ত্রাণের জন্য মাত্র ৪ কোটি টাকা বা ১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। সাথে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই চপারের, নেই জাহাজ পাঠানোর উদ্যোগ। প্রণব মুখার্জি পার্লামেন্টে সমবেদনা জানিয়েছেন। সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কিছু শুকনো কথায় কি চিঁড়ে ভেজে?
সোজা কথায় বললে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী হিসাবে, এবছরের সবথেকে বড় আঞ্চলিক বিপর্যয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব ভারতের পক্ষে। মিলিটারি হেলিকপ্টার পাঠানো সম্ভব দূর প্রান্তবর্তী গ্রামগুলোতে। বড় জাহাজভর্তি ত্রাণসামগ্রী পৌছে দেওয়া সম্ভব উপকূলবর্তী অঞ্চলে।
এর পাশে দেখা যাক আগে ২০০৫ এ পাকিস্তানে ভূমিকম্পের পরে ভারত সরকার কিভাবে সাহায্য করেছিল। ততক্ষণাত ২৫ মিলিয়ন ডলার ত্রাণের ব্যবস্থা ছাড়াও মিলিটারি চপার আর উদ্ধারকারী বাহিনীও পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে গিয়েছিল আটা, শুকনো খাবার আর টিনের চালা। মজার কথা তখন ভারতীয় কাশ্মীরেও ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই একি বছরে হারিকেন ক্যাটরিনার জন্য ভারত সরকার ৫ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য আমেরিকায় (যাদের মাথাপিছু আয় ৩০ হাজার ডলারেরও বেশী) গিয়েছিল দুটো বড় ক্যারিয়ার বিমান সহ। আমেরিকা থেকে ত্রাণ বিতরণের জন্য জাহাজ আসবে এক সপ্তাহ পরে। এদিকে ভারতীয় যে জাহাজগুলো বঙ্গোপসাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, হয়ত এক দিনের মধ্যে তারা ত্রাণ বিতরণে যোগদান করতে পারত।
আরো আগে সুনামির সময়েও ভারত ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। তা সত্ত্বেও শ্রীলংকা আর ইন্দোনেশিয়াতে ত্রাণ পাঠানো হয়েছিল। শ্রীলংকায় তো বটেই, এমনকি ইন্দোনেশিয়াতেও ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ আর চপার হেলিকপ্টার ত্রাণের কাজ করেছিল।
আর এ বছরেই শুধুমাত্র বন্যাদুর্গত উগান্ডার জন্য ভারত সরকার ১০ মিলিয়ন ডলারের ত্রাণ পাঠিয়েছে। পাঠিয়েছে জাহাজ আর লোকবল। হয়ত উগান্ডার মার্কেটে ভারতীয় আগ্রহের কথা ভেবেই এই সাহায্য।
পুঁজীবাদী দুনিয়ায় সাহায্য হল একরকম বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন মানে, অলিখিত ভাবে বলা - "দেখ, আমরা তোমাদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছি, তাই তোমরা আমাদের জিনিস আরো বেশী করে কিনবে।" এই সিস্টেমে সাহায্য তাদেরই পাঠানো উচিত, যাদের ভবিষ্যতে ক্রয়ক্ষমতা হবে এবং একই ব্র্যান্ডের জিনিস আরও বেশী করে কিনতে আগ্রহী হবে। আর বাজার না থাকলে সাহায্য করে কি লাভ? তাই সাহায্য যাবে বড়লোকেদের কাছে, গরিবদের কাছে নয়। চিনের পথে হেঁটে বাজার ধরতে গিয়ে এখন ভারতও একই নীতিতে চলছে। তাই এটা কোনো আক্সিডেন্ট নয় যে ভারতের মত এশিয়ার আরেক উন্নয়নশীল দেশ চিনও মাত্র ১ মিলিয়ন ডলারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে ধন্যবাদ ব্যাপারটাকে ভারতীয়দের দৃষ্টিগোচর করার জন্য। তবে, ধ্বংসস্তুপে বসে থাকা বাংলাদেশের দিকে শুকনো মুখে বন্ধুত্ত্বের ঠান্ডা হাত বাড়িয়ে দেওয়া দেখে মনে হয় কোথাও একটা ভুল হচ্ছে যেন। ঠিক কোনখানে আমি জানি না, কিন্তু ভুল নিশ্চয় হচ্ছে। সময় গেলে এই ভুলের খেসারত না দিতে হয়। সাহায্য যাওয়া উচিত মানবিকতার খাতিরে, বাজারের খাতিরে নয়। প্রাচ্যের সভ্যতার দীর্ঘদিনের এই নীতির উলটো পথে হেঁটে কতদিন চলতে পারা যায় - দেখা যাক।
(ছবি - সি-এন-এন/এ-পি)
আলোচিত ব্লগ
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ কেন আমি বিএনপিকে ভোট দিবো?

আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন হবে বিতর্কমুক্ত এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। আমার অবশ্য এই দুই ব্যপারেই দ্বিমত... ...বাকিটুকু পড়ুন
আওয়ামিলীগ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে

চাঁদগাজী বলেছিলেন,
"যেসব মানুষের ভাবনায় লজিক ও এনালাইটিক্যাল জ্ঞান না থাকে, তারা চারিপাশের বিশ্বকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, কোন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সমাজে তাদের অবদান... ...বাকিটুকু পড়ুন
‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।
১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন
কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র
অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।
এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।