বিভাজনের বাইরে এক মূসাভাই
এই মূসাভাই ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ৮০ বছরে পা রাখবেন। এই দীর্ঘ সময়ের অর্ধেকটা আমি নানাভাবে তাঁর খুব কাছে কাছে ছিলাম। এখনো আছি প্রেসক্লাবের আড্ডায়, প্রেস কনফারেন্সে, জনপ্রিয় টিভি টকশোতে আর সামাজিক অনুষ্ঠানে। শুরুটা হয়েছিল ষাটের দশকের শেষ দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে আমি যখন তদানীন্তন পাকিস্তান অবজারভার-এ যোগ দিই। সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম অনুসন্ধানী রিপোর্টিং করার জন্য রিসার্চ সেলে। এক বছর কাজ করার পর অবজারভার পত্রিকার রিপোর্টিং টিমে যোগদানের আদেশ। এই রোমাঞ্চকর অবস্থার মধ্যেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কারণ মূসাভাই তখন জাঁদরেল বার্তা সম্পাদক। অফিসে শুধু তাঁর গলার আওয়াজ শুনলেই আমরা যারা নতুন, ভয়ে তাঁর দিকে তাকাতেও পারতাম না। তাই যখন অবজারভার-এর ম্যানেজিং এডিটর মাহবুবুল হক আমাকে রিপোর্টিংয়ে যোগ দিতে বললেন, তখন দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম, তাঁর রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়াতেই পারব কিনা সংশয় রয়েছে, রিপোর্ট লিখব কেমন করে? কিন্তু মাহবুব ভাই মূসাভাইকে ডাকলেন। বললেন, ‘রিয়াজ অর্থনৈতিক বিষয়ে রিপোর্ট করবে। তোমাকে সে ভয় পায়, ওকে কিছু বলো না।’ মূসাভাই চোখ বড় বড় করে কটমট করে তাকালেন। তবে কিছুই বললেন না।
মরহুম শহীদুল হক, এনায়েতউল্লাহ খান (হলিডে), আতাউস সামাদ, আবদুর রহিম টাইপরাইটারের সামনে। ডেস্কে বসে আছেন মূসাভাই, কে জি (মুস্তাফা) ভাই; ভয়ে টাইপরাইটার চলে না। এর মধ্যে মূসাভাই কাছে এলেন, কী রিপোর্ট করতে হবে বললেন, আরও কিছু নির্দেশ দিলেন—কী সাইজের কাগজে টাইপ করতে হবে, কীভাবে রিপোর্ট শুরু করতে হবে—শিক্ষকের মতো এসব বলে চলে গেলেন। কাজ করতে গিয়ে দেখি, সে এক অন্য মূসাভাই, যাঁর ছিল সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা আর পাণ্ডিত্য গভীর, প্রখর নিউজ সেন্স, আর সহকর্মীদের জন্য মমত্ববোধ। অনেক ঘটনার মধ্যে একটা ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে তাঁর সাহসের পরিধি। মহাপ্রলয়ের বছর। ১৯৭০ সাল। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অঞ্চলে লাখ লাখ লোকের মৃত্যু। মূসাভাই বললেন, ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির হেলিকপ্টারে আমাকে পটুয়াখালী যেতে হবে। পরদিন সকালে পটুয়াখালী হয়ে চর বাইসদিয়ার ওপারে গভীর সমুদ্রে ব্রিটিশ রণতরী এইচএমএস ইনট্রিপিডে গেলাম। ওই যুদ্ধজাহাজেই হেলিকপ্টার অবতরণ করে। ওই জাহাজে হাজার হাজার যানবাহন, রাবার ডিঙি আর সেনা ত্রাণকাজে নিয়োজিত। সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে লিখতে বসলাম। সেনা জনসংযোগ বিভাগ থেকে ফোন। মেজর সালেক সিদ্দিকী (২৫ মার্চ, ’৭১-এ ঢাকায় ছিলেন এবং নয় মাস সব অভিজ্ঞতার ওপর উইটনেস টু সারেন্ডার বই লেখেন) বললেন রিপোর্টটি কীভাবে লিখতে হবে। কারণ তিনি জানতেন, রিপোর্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ত্রাণকাজের সমালোচনা করা হবে। মূসাভাইকে আমি মেজর সালেকের নির্দেশের কথা বললাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলে মেজর সালেককে বললেন, ‘নাক গলাবেন না।’ ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর অবশ্য সব বদলে যায়। সালেক সিদ্দিকীদের কথায়ই তখন সব চলত। কিন্তু মূসাভাই তাঁর কথায় চলতেন না। অবশ্য তখনকার অবস্থায় তা প্রতিহত করাও ছিল দুরূহ ব্যাপার। জুন মাসের কোনো এক সময় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি দেশ ত্যাগ করেন। আমিও ঢাকা ছেড়ে চলে যাই।
মূসাভাইয়ের সংবাদ পরিবেশনায় অসংখ্য মুনশিয়ানার আরেকটি উদাহরণ দেব। ষাটের দশকে পাকিস্তান অবজারভার ছিল আইয়ুব শাহীর ত্রাস। সারা পাকিস্তানে এই কাগজের প্রভাব ছিল অনেক। সেই কাগজের নিউজ এডিটর মূসাভাই। তখন শুনতাম, পাকিস্তানে যে কয়জন তুখোড় নিউজ এডিটর ছিলেন, মুসাভাই ছিলেন তাঁদের একজন। দ্রুততার সঙ্গে কপি এডিটিং, চমকপ্রদ হেডিং আর রিপোর্ট এডিটিং ছিল দেখার মতো। একটি হেডিং আমার আজও মনে আছে। একজন লোক ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটলেন, গন্তব্যে গেলেন। তিনি সেখানে মারা যান। লাশ আনতে একই উড়োজাহাজ দাবি করল কয়েক শ টাকা ভাড়া। মূসাভাই হেডিং দিলেন ‘জীবিতের চেয়ে লাশের মূল্য বেশি’। আবার ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কে কত বড় বাঙালি, তা প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে একজন রিপোর্ট করলেন—খাজা খয়ের উদ্দিন বক্তৃতায় বলেছেন, ‘কোন বোলতা হামি বাঙ্গালি না, হামি ভি বাঙ্গালি আছে।’ মূসাভাই কপিটি এডিট করে খাজা খয়ের উদ্দিনের এ কথাটি বাংলায় ইংরেজির ভেতরে পাঞ্চ করে দিলেন। তাঁর সম্পাদনার এই মুনশিয়ানা, কৌশলী পরিবেশনা সেই সময়ে ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ ধরনের আরও অনেক মজার ঘটনা আছে মূসাভাইকে নিয়ে।
যার রক্তচক্ষুর ভয়ে রিপোর্টার হতে চাইনি, সেই মূসাভাইকে পাই বড়ভাই, সাংবাদিকতার গুরু আর একজন অকৃত্রিম সুহূদ হিসেবে। তাঁর সঙ্গে মেশার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ৮০ বছর বয়সে পা দিয়েও প্রেসক্লাব মাতিয়ে রাখেন। ছোটবড় সবার সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন। তিনবার তিনি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চারবার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ক্লাব তাঁকে আজীবন সদস্য পদের সম্মাননা দিয়েছে।
মূসাভাই রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ‘সবার মূসাভাই’ হতে পেরেছেন। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গনের সকল দলের সমর্থক ও নেতা-নেত্রীর সমান শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সন্মান এবং সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন ও পাচ্ছেন। তাই তাঁর অবস্থান এখন মুরব্বির আসনে। আর আমাদের সাংবাদিকদের কাছে তিনি হয়ে আছেন শুধু প্রিয় মূসাভাই, নির্ভীক ও আদর্শবাদী সাংবাদিকতার আদর্শবান অভিভাবক। আশিতে পা-দেওয়া আমাদের মূসাভাই দীর্ঘজীবী হোন।
রিয়াজউদ্দিন আহমেদ: দৈনিক নিউজ টুডে-র সম্পাদক।
http://www.noakhaliweb.com.bd
একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?
হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন
আসলে কেউ ফেরে না।
মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর
যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।