৮৬ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তি কুরআন দেখে দেখে পড়তে শিখল। আরেকজনের বয়স ৭৬। ষাটোর্ধ আছেন অনেক। যুবকদের সংখ্যাটাও বয়স্কদের সমানই হবে অথবা কিছু বেশী। আমাদের মসজিদে বয়স্কদের কুরআন শিক্ষা কোর্স এই প্রথম নয়। তবে এবারেরটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। আগেরগুলোতে দেখা গেছে শুরুতে ছাত্র থাকে অনেক। পরে কমতে কমতে হাতেগোনা দু-তিনজনে গিয়ে ঠেকে। এবার শুরুটা হয়েছিল উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। ৪০ দিন ব্যাপী কোর্সের পুরো সময়টা প্রশিক্ষক বুড়ো খোকাদের আগ্রহ ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাই ছাত্র ঝরে পড়ার হার ছিল খুব কম। বরং দিনে দিনে আরো নতুন ছাত্র যুক্ত হয়েছে অনেক। কোর্সটা ছিল ফ্রী অফ কস্ট। প্রশিক্ষকের একটাই উদ্দেশ্য ছিল এসব লোকজন যারা সারাটা জীবন সব কিছু করতে পারলেন, কিন্তু কুরআন শেখার সময় হলো না, তাদেরকে কুরআন পড়ার জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলা। এর বিনিময় তিনি ছাত্রদের কাছ থেকে নয়, বরং আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন আখিরাতে।
অতঃপর প্রায় একশত মানুষের কুরআনের সাথে প্রথম পরিচয় হল। এদের অনেকেই তাদের পেশাগত জীবনে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। কেউ ছিলেন শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউবা প্রকৌশলী আবার কেউ গার্মেণ্টসকর্মী। কিন্তু কুরআনের দরসে সবাই তখন হয়ে পড়েন কুরআনের ছাত্র।
ষাটোর্ধ এক বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আমি এখানে এসে প্রথম কুরআনের হরফ চিনলাম, হরকত চিনলাম। আমি জানতামই না জযম, তাশদীদ, মাদ্দ, গুন্নাহর কথা। এখন আমার জীবনের লক্ষ্য এটাই যে, মৃত্যুর আগে অন্ততঃ একবার কুরআন দেখে দেখে পড়ে শেষ করা।" তার হৃদয়স্পর্শী আবেগ আমাদের আপ্লুত করে দেয়।
যাহোক, আল্লাহ তায়ালার কাছে অশেষ শুকরিয়া এ লোকগুলো শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে আল্লাহর কালাম শেখা প্রতিটা মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। কুরআনই যে জীবন ও মৃত্যু উভয় জগতে আঁধার রাতের আলো।
আমাদের মসজিদের খতিব সাহেব তার অত্যন্ত ব্যস্ততার মাঝেও পুরো কোর্সটা চলাকালীন সময় আমাদের সাথে থেকেছেন। ক্লাসের শেষ সারিতে বসে থেকে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
আলহামদুলিল্লাহ। ক্লাসের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছিল দুই দিন আগেই। ক্লাশ শেষ কিন্তু ছাত্রদের কুরআন পড়ার বাস্তব জগতে ঢুকিয়ে দেয়া হল। গতকাল অনুষ্ঠিত হলো আমাদের সমাপনী অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরনী ও ছাত্রদের মনোজ্ঞ প্রদর্শনী। আল্লাহর অশেষ রহমতে সব কিছু অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আগত দর্শনার্থী ও অতিথিদের সামনে ছাত্ররা তাদের পারফর্মেন্স প্রদর্শন করেছেন। আমার নিজেরও একটি স্বরচিত কবিতা ছিল, আবৃত্তি করেছি। (কবিতাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।) বহু বছর আগে ছাত্রজীবনে আমাদের মেডিকেল কলেজের সব অনুষ্ঠানে আমি জনপ্রিয় আবৃত্তিকার ছিলাম। স্বরচিতসহ কবি নির্মলেন্দু গুণের অনেক কবিতা আবৃত্তি করেছি। জাতীয় কবিতা উৎসবেও আবৃত্তি করেছি। কিন্তু কুরআনের জন্য কবিতা আবৃত্তি এই প্রথম। খুব অসাধারণ এক অনুভূতি মনে বিরাজ করছে। যে অনুভূতির উৎস দুনিয়া নয়, অন্য কোন ভূবনে।
আলহামদুলিল্লাহ। বহু স্বনামধন্য উলামায়ে কেরাম আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ প্রত্যক্ষ করেছেন মাত্র ৪০ দিনের মেহনতে ছাত্ররা কিভাবে কুরআন শিক্ষার বুনিয়াদী জিনিসগুলো আয়ত্ব করে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। পরীক্ষা হয়েছিল আগেই। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীরা পুরস্কারও লাভ করছেন। আর সব ছাত্রই কিছু না কিছু পুরস্কার লাভ করেছেন। উপস্থিত অনেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন, বলেছেন, হ্যাঁ, আমরাও কুরআন শিখব। প্রথমে আরবী টেক্সট দেখে দেখে পড়া শিখব। সাথে সাথে যোগ্যতা সম্পন্ন আলেমদের সান্নিধ্যে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন আয়ত্ব করব, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী নিজে ও নিজের অধীনস্তদের জীবন গঠনের চেষ্টা করব আর কুরআনের বানী মানুষের কাছে পোঁছে দেব। আল্লাহ রব্বুল য়ালামীন তাদের মনের আশা কবুল ফরমান। আমীন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

