প্রথম 2 বছর কামলা খেটে টিউশন ফি যোগাড় করতে চলে যাওয়ায় গোলাপী রংয়ের শার্টগুলো বিদেশের মাটিতে রিলিজ দেয়ার সময় হলো না। যাই হোক, পড়াশুনা শেষ করে চাকরীর ইন্টারভিউ দেয়া শুরু করলাম। উপরওয়ালার অশেষ কৃপায় তখনও গোলাপী বস্ত্রভান্ডারে র ব্যবহার শুরু করি নাই। চাকরি মিলে গেল এরই মধ্যে, খুিশতে আমি আটখানা। আমার চেয়ে আমার বন্ধুগণ আরও আহ্লাদিত এবং এই সুযোগে ঝোপ বুঝে কোপ মেরে আমার পকেট গড়ের মাঠ করে দিল। মা-বাবাকে শুভ খবর জানাতে তারা দ্্বিগুণ উৎসাহে আদেশ করলেন নতুন চাকরিতে যাবার দিন যেন নতুন প্যান্ট-শার্ট পরে যাই। কি মুসিবতেই না পড়া গেল!!যাইহোক মা-বাবার আদেশ শিরোধার্য এবং মিথ্যাচার আর করব না ঠিক করায় বলে ফেললাম যে পকেট গড়ের মাঠ ও প্রথম বেতন না পাওয়ার পূর্বে শপিং নামের বিলাসিতা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যথারীতি এই ঘটনা শুনার পর আমার কিছু অম্ললবাণী পিতৃদেবের কাছ থেকে হজম করতে হলো। যাই হোক, আমার মা জননী সম্ভবত তার একমাত্র পুত্রের মানসিক অবসহা বুঝতে পেরে হার্ডলাইনে না গিয়ে বললেন অমুক ঈদের সময় তমুক দোকান থেকে অমুক রংয়ের যে শার্ট আমার জন্য কিনেছিলেন, সেটা যেন পরে প্রথমদিন অফিসে যাই। ততক্ষণে আমি আমার মায়ের শার্ট শনাক্তকরণ প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বুঝে গেছি 2 বছর লুকিয়ে থাকা গোলাপী বস্ত্রভান্ডারের কোন শাটটি তিনি ইন্ডিকেট করছেন।
যাইহোক, সেই শার্ট বের করে ধোলাই ইস্ত্রি করে রোববারে রেডি থাকলাম যাতে সোমবার সকালের ঘুমটা মাটি না হয়। সোমবার সকালে অফিসে গেলাম ফুলবাবু সেজে। প্রথমদিন বেশ উত্তেজনায় কেটে গেল। 2/1 দিন পর থেকে একটু অস্বস্তি লাগা শুরু হলো। কারণ অফিসের সবার ব্যবহার। বিশেষ করে উঠতি বয়স্ক 2 পরী যাদের সাথে কথা বলতে আমি খুবই আগ্রহী, তাদের এরূপ রূঢ় ব্যবহারে আমার দিল ভেঙে খান খান হয়ে গেল। সান্তনা দিলাম নিজেকে এই ভেবে যে হয়ত আমি নতুন , তাই সবার এরকম অদ্ভূত ব্যবহার। আর 2 পরীর বিষয়ে উপসংহারে আসলাম যে হয়ত "পুরানো পাগল ভাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানি"।
এক সপ্তাহ পার হয়ে যাবার পরও যখন আমার কলিগদের ব্যবহারের কোন পরিবর্তন দেখতে পেলাম না তখন বিরক্ত হয়ে বুড়ি রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম ব্যাপারটা কি? সবার এরকম ব্যবহারের কারণ কি? বুড়ি দেখি বলতে চায় না। অনেক চাপাচাপির পর যা শুনলাম তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম। অফিসের সবার ধারণা আমি নাকি "গে"!! মাথাটা গেল খারাপ হয়ে। বুড়িকে জিজ্ঞাসা করলাম আমার সমপর্কেএই অমূলক ধারণার কারণ কি? বুড়ির উত্তর ছিল বিগত এক সপ্তাহ ধরে আমার গোলাপী রংয়ের শার্ট পরিধান হলো জনগণের এই অমূলক ধারণার কারণ। বুড়ি খুব সম্ভবত আমার মানসিক অবসহা বুঝতে পেরে বলল "আই গেস দেয়ার ওয়াজ এ মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং দেন".................আমিও নাক-মুখ খিচিয়ে বললাম "হেল ইয়াহ"। যাহোক বুড়ি আমাকে আস্বস্ত করল যে সে এই ভুল বুঝাবুঝির সমাপ্তি ঘটাবে।
ফলাফল টের পেলাম 1 ঘন্টার মধ্যে। লান্চ করছি একা একা অন্যদিনের মতো,অফিসের 2 পরী এসে হাজির। তাদের বক্তব্য, আমার সাথে এক টেবিলে বসে লান্চ করতে চায়। আমি সম্মতি জানাতে তারা বসে আমার কাছে মাপ চেয়ে নিল। মেয়েমানুষ তার উপর আবার সাক্ষাৎ ডানাকাটা পরী আমার কাছে চাইছে মাফ, নিশ্চয়ই আগের জন্মে ভাল কোন কিছু করেছিলাম তার ফল সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে আমাকে দিচ্ছেন, এই অমূল্য পুরস্কার না নেয়ার ক্ষমতা কি আছে আমার? তাছাড়া ছোটবেলায় ট্রান্সলেশন করার পড়েছিলাম "ক্ষমা স্বর্গীয়"। মাফ তো করতেই হয়, তাই মাফ করে দিলাম। আর তাছাড়া সমকামী নামের কলঙ্ক থেকে তো মুক্তি পেলাম।
বাসায় এসে প্রথম যা করলাম তা হলো গোলাপী বস্ত্রভান্ডারের বিসর্জন । এখানে উল্লেখ্য যে গোলাপী রঙ এদেশে মেয়েদের রঙ হিসাবে পরিচিত। আর ছেলেরা যারা সমকামী, তারা নিজেদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে গোলাপী রঙের আশ্রয় নেয়।
দ্্বিতীয় ঘটনা আমার বস কে নিয়ে। ইন্টারস্টেট ভ্রমনের প্রথম দিন। আমার সাথে বসের প্রথম মিটিং চাকরিতে ঢুকার পর। ভদ্্রলোক দেখতে ফাটাফাটি তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইটালিয়ান ডিসেন্ট আমার বস আগে পার্টটাইম মডেল ছিলেন। এখন একটি ফ্যাশন কোম্পানির ফুলটাইম কর্ণধার----সেটাও শখের বশে। যাই হোক মিটিঙের মধ্যে হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল। দেখি মটরলা কোম্পানির লেটেস্ট ভি 3 মডেলের ফোন ...আমরা মিটিংবাসী মডেলে আগ্রহী ছিলাম না...ছিলাম মোবাইলের রঙের প্রতি। রঙ আর কোনটাই নয়...গোলাপী...........। ফোন রাখার পর আমাদের কৌতুহলী দৃষ্টি দেখে আমার বসের কৈফিয়ত "আমার মেবাইলটা হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে সার্ভি স সেন্টারে থাকায় ছোট বোনেরটা ধার করে চলছি।"
এয়ারপোর্টে ফেরৎ যাচ্ছি দিন শেষে, আমি ড্রাইভ করছি, পাশে আমার বস। বেচারা কিছু ক্ষণ উশ-খুশ করে বলেই ফেলল, "দেখ, আমি গে না। আমার মোবাইলটা সত্যি নষ্ট। তোমার সাথে প্রথম মিটিঙে এরকম একটা ঘটনা ঘটায় আমি খুব লজ্জিত। " আমি তাকে আস্বস্ত করলাম এই বলে যে আমি বিশ্বাস করি সে একজন স্ট্রেইট। এরপর আমার উপরের কাহিনীটা বললাম তাকে। তারপর দু'জনে হেসে উঠলাম হো হো করে। আজও দেখা হলে আমরা একজন আরেকজনকে বলি "ডুইউ হ্যাভ এনিথিং পিঙ্ক?"
পুনশ্চ: আমার মা অতি সমপ্রতি এদেশ ভ্রমণ করে গেছেন। আসার সময় অনেক মুলোমুলি করে আমার জন্য কিছু শার্টবাংলাদেশ থেকে কিনে এনেছেন যার সিংহভাগের রং গোলাপী।
পুনশ্চ: পুনশ্চ: আমার অফিসিয়াল জন্মদিন ছিল কিছুদিন আগে। কোম্পানির পক্ষ হতে একটা কার্ড পেলাম। যাতে রেগুলার কথার পাশাপাশি লেখা "স্যরি।উই মিসআন্ডারস্টুড ইউ"।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ৯:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




