সুপারমার্কেটে সবাই কাউনটারের সামনে লাইন ধরে অপেক্ষা করছে চেক আউটের জন্য। দেখা যাবে এক বাংলাদেশী এসে লাইন ভেঙ্গে দেশি কায়দায় আগে-ভাগে চেক আউট করার ধান্ধা করছেন বা অযথা দর কষাকষি করা সেলস ম্যানের সাথে। বলে রাখা ভালো যে এখানে দরাদরি করার তেমন কোন অপশন নেই। তারপরেও জোর করে এ জিনিসটা করা। বেশিরভাগ সময় মানুষজন কিছু বলে না। হয়তো আড়চোখে জিনিসটা দেখেও না দেখার ভাণ করবে। কিন্তু সবাই একরকম না। মাঝে মাঝে কিছু মানুষ এধরনের ব্যবহারে বিরক্ত হন এবং সেটা প্রকাশ করেন। তখন বাংলাদেশিদের চোখে তারা হয়ে যান রেসিস্ট বা বর্ণবাদী।তবে ব্যতিক্রম নেই তা বলব না। কিছু মানুষ যে কালো চামড়ার আদমীকে সহ্য করতে পারেন না সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জাতি হিসাবে আমরা কি কোন অংশে কম বর্ণবাদী? আমাদের চামড়া যত সাদাই হোক না কেন, যারা বিদেশি বর্ণবাদী তাদের কাছে আমরা "ব্লাডি ব্ল্যাক" বা "ব্লাডি ইনডিয়ান" হিসাবেই পরিচিত। এবার আসা যাক নিজেদের বর্ণবাদমূলক ব্যবহারবিধিতে। বিয়ের বাজারে ফসর্া মেয়ের ডিমান্ড কি রকম তা আমরা সবাই জানি। পাত্রীর গায়ের রং সাদা না হলে পাত্র তো বটেই, পাত্রের মা-বাবা-ভাই-বোন সবাই বেঁকে বসেন। এরকম ঘটনাও দেখেছি, প্রেমঘটিত বিয়ে, পাত্রের উচ্চশিক্ষিত মায়ের মন খারাপ। কি ব্যাপার? ছেলের বউয়ের রঙটা নাকি কালো। সত্যি সেলুকাস! কি বিচিত্র জাতি আমরা। একটা মেয়ে কি কোরবানির গরু না দোকানে সাজিয়ে রাখা পণ্য? আজকাল অবশ্য পাত্রীদের মত পাত্রের রঙ ও উচ্চতা দেখা হয়।
সমপ্রতি আমার এক ক্লাসমেটের বিয়ে হয়েছে। সে ছবি পাঠিয়েছে নবপরিণীতা স্ত্রীর সাথে। খুবই সুন্দর ছবি। এর মাঝে আমার এক বন্ধু মন্তব্য করে বসলেন "আর মেয়ে পেল না? এই টাকে বিয়ে করল শেষ-মেষ?" মন্তব্যকারী আমার এই বন্ধু তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত, বিদেশ থেকে উচ্চডিগ্রী ধারী ও বিদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। একথা শোনার পর দেখি উপসিহত সবাই মেয়েটিকে ও আমার বন্ধুটিকে নিয়ে কটুক্তি করা শুরু করেছে। ঘটনাটা খুবই দুঃখজনক। দুই-একজন থাকলে প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু একদল মানুষ একত্রে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছালে সেখানে প্রতিবাদ করে লাভ হয় না, বরং নিজের আরও ছোট হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। আমার পরিচিত যারা বিয়ে করবেন, তাদের বেশিরভাগের বক্তব্য, যাকে বিয়ে করব তার চামড়া সাদা হতে হবে। ধিক!! এরকম উচ্চশিক্ষিতদের। এরা আবার দেশ ও জাতির উন্নয়নের বুলি আউড়ান। মনে যারা এরকম বর্ণবাদমূলক চিন্তাভাবনা পোষণ করেন, তাদের হাজার একাডেমিক ডিগ্রী থাকলেও তারা আমার কাছে শিক্ষিত নন। কারন বেসিক যে শিক্ষাটা পরিবার, গড়ে উঠার পরিবেশ থেকে মানুষ লাভ করে, সেই মৌলিক শিক্ষার পরীক্ষাতে তো তারা শূন্য পাওয়ারও অযোগ্য। এরকম উচ্চ শিক্ষিত অশিক্ষিতদের আমি ঘৃণা জানাই হৃদয়ের অন্তঃসহল থেকে।
পুনশ্চ: দুঃখের সাথে বলছি আরও কিছু বর্ণবাদী বৈশিষ্ট্য রয়েছে আমাদের। যেমন- অনেকেই কুমিল্লা, চাঁদপুর, বরিশাল অঞ্চলে ছেলে-মেয়ে বিয়ে দিতে চান না। এসব এলাকার মানুষ নাকি ভালো হয় না। এভাবে মানুষকে মূল্যায়ন করা কি বর্ণবাদের অন্য রূপ নয়?
(আমার মনের গভীরে থাকা একান্ত কিছু ব্যক্তিগত কথা এখানে লিখেছি। কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে বা কারও অনুভূতিকে আঘাত দিয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রাথর্ী। তবে আমি মনে করি জীবনে মৌলিক শিক্ষার বিকল্প নেই। সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন তখনই হবে, যখন আমাদের নতুন প্রজন্মকে আমরা সঠিক মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারব। স্কলারশিপ বা বিপুল অর্থের বিনিময়ে অর্জিত উচ্চতর ডিগ্রী কখনই আমাদের একটি গর্বিত জাতির মালিক হতে সাহায্য করবে না। এটাই আমার বিশ্বাস।)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


