somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুশদেশের চিরায়ত শিশুসাহিত্য

১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ঊনবিংশ শতাব্দীর মহান লেখক চেখভ , তুর্গেনেভ , দস্তয়েভ্‌স্কি , তলস্তয়ের নাম বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত। এই লেখকেরা - রাশিয়ার জাতীয় গৌরব । ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশ লেখকদের মধ্যে এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না যিনি শিশুদের সম্পর্কে কিংবা শিশুদের জন্য লেখেন নি । এই লেখকেরা শিশুদের মধ্যে দেখতে পেয়েছেন জাতির ভবিষ্যৎ , দেশের আগামী দিন । তাঁদের প্রয়াস ছিল অজ্ঞানতা ও নৃশংসতার হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা । শিশুরা যাতে বুদ্ধিমান , শক্তিমান , সৎ ও সুখী হয়ে উঠতে পারে সেরকম ভাবে শিক্ষাদানের কথা তাঁরা ভেবেছেন ।

রাশিয়ার ঊনবিংশ শতাব্দী হল জনগণের ঘোর দারিদ্র্য ও দুঃখ দুর্দশার কাল । ১৮৬১ সন পর্যন্ত দেশে বজায় ছিল "ভূমিদাস প্রথা " নামে এক প্রথা , যার বলে প্রাচীনকালে যেমন ক্রীতদাস কেনাবেচা করা যেত , তেমনি জমিদার কৃষককে কিনতে অথবা বেচতে পারত , বেত মারতে মারতে তাকে মেরে ফেলতে পারত - এতে জমিদারের কোন শাস্তি হত না । কিন্তু জার ভূমিদাশ প্রথা রোধ করার পরও জনগণের জীবন তেমন কিছু উন্নত হল না । আগের মতোই গরিব মানুষ দুর্ভিক্ষ , সাধ্যাতীত শ্রম ও লাঞ্ছনার কবলে পড়ে কস্ট পেতে লাগলো । বিশেষ করে কঠিন অবস্থা ছিল শিশুদের । এমন কি ধণী পরিবারের শিশুরা - যারা প্রাচুর্যের মধ্যে বাস করত এবং লেখাপড়ার সুযোগ পেত - তারাও সত্যিকারের আনন্দ ও মুক্তি কাকে বলে তা জানত না । আর গরিবদের ছেলেমেয়েদের সামনে ছিল রক্ত-জল-করা পরিশ্রম , তাদের প্রায় সকলেরই ভবিষ্যৎ বলতে ছিল নিরক্ষরতা , অশেষ অভাব-অনটন আর প্রায়শই অকাল মৃত্যু ।


রুশ লেখক আন্তন পাভলোভিচ চেখভ

এ প্রসঙ্গে মহান রুশ লেখক আন্তন পাভলোভিচ চেখভ যে কথা উচ্চারণ করেছেন তা বহু খ্যাত - তিনি বলেছেন " শৈশবে আমার শৈশব ছিল না । মহুকুমার এক অসচ্ছল দোকানদারের ছেলে ছিলেন তিনি । তাঁকে একেবারে ছোটবেলা থেকেই গৃহস্থালির কাজকর্ম করতে হয় , কাজ করতে হয় বাপের দোকানে , যেখানে গরমকাল পর্যন্ত স্যাঁতসেঁতে আর ঠান্ডা । " অভাব অনটনের ফলে তাঁর সাস্থ্যহানি ঘটে । ৪৪ বছর বয়সে ক্ষয়রোগে তাঁর মৃত্যু হয় । শিশুদের নিয়ে লেখা তাঁর গল্পগুলো শিশুমন সম্পর্কে তাঁর গভীর বোধশক্তি , ভালোবাসা ও দরদে পরিকীর্ণ । ওই সব গল্পে বিষাদাচ্ছন্ন অনেক কিছুর সাথে হাসির জিনিসও কম নেই । শৈশবে লেখক আনন্দ বলতে কমই জানতেন । তাই এ আনন্দ যে শিশুদের কত দরকার সেটা তাঁর জানা ছিল । তিনি নিজের রচনায় তা সঞ্চার করতে প্রয়াসী হন । শিশুদের জন্য তাঁর অমর সৃষ্টি ছোটগল্প "কাশ্‌তান্‌কা" ।


"কাশ্‌তান্‌কা"

"কাশ্‌তান্‌কা" গল্পে অগ্রভাগে যাকে দেখা যায় সে মানুষ নয় , কুকুর । চেখভ লিখেছেনঃ "শিশুদের জীবনে ও স্মৃতিতে গৃহপালিত পশু ... নিঃসন্দেহে একটি কল্যাণজনক ভূমিকা গ্রহণ করে । আমাদের গৃহপালিত জীবজন্তুর সহজাত সহিষ্ণুতা , বিশ্বস্ততা , অসীম ক্ষমাশীলতা শিশুর মনে অনেক বেশি শক্তিশালী ও শুভ প্রভাব বিস্তার করে । " "কাশ্‌তান্‌কা" গল্পটির বিষয়বস্তু - বিশ্বস্ততা । এ হল একটি কুকুর সম্পর্কে আবেগপূর্ণ কাহিনী । মদ্যপায়ী ছুতোর লুকা আর ফোদিয়া নামে ছেলেটির দারিদ্র্যপীড়িত ঘরে সে বাস করত , অনশন ও মারধরের যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে হত , তবু সে মনে করত এই বাড়ি তার নিজের বাড়ি , এ বাড়ির লোকজন তার আপনজন । একবার অপ্রত্যাশিতভাবে শহরে পথভ্রষ্ট হয়ে কুকুরটা হারিয়ে গেল , কিন্তু বেঘোরে মারা গেল না । সে সার্কাসের ট্রেনারের হাতে গিয়ে পড়ল । লোকটা তাকে ভালো ভালো খাওয়া দিত , নানা রকম কসরতের তালিম দিত , মারত না , তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত , তাকে আদর করত । কিন্তু কয়েক মাস বাদে কাশ্‌তান্‌কা যখন তার আগের মালিকদের দেখা পেল তখনই সে তাদের কাছে ছুটে গেল । সত্যিকারের সুখ তখনই পেল । গল্পের পাঠ শেষ করতে করতে কাশ্‌তান্‌কার সঙ্গে সঙ্গে , ছুতোর লুকা আর বালক ফোদিয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও আনন্দ পাই , কেননা কাশ্‌তান্‌কার প্রত্যাবর্তন হল সেই ভালোবাসারই জয় , যে ভালোবাসা পেটভরা খাবার দিয়ে কেনা যায় না , দরদী কথা দিয়েও নয় ।

কাশ্‌তান্‌কা গল্পটি প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে । আশির দশকে বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয় রাদুগা প্রকাশন , মস্কো থেকে । আন্তন পাভলোভিচ চেখভের অন্যান্য গল্প - "সাদা কপাল" , "ভানকা " , "পলাতক" , স্তেপভূমি " এবং "শিশুমহল" - ছোটদের মধ্যে জনপ্রিয় । এই সব গল্পে আছে অনবদ্য ভাষা , মানুষ ও জীবন সম্পর্কে অপূর্ব জ্ঞান , মৃদু ও ঈষৎ বিষণ্ণ "চেখভিয়" হিউমার , আর সবচেয়ে বড় কথা হল মানুষের উপযোগী বিশুদ্ধ সুললিত কাব্যমন্ডিত জীবনের স্বপ্ন ।


ইভান সের্গেইয়েভিচ তুর্গেনেভ

শিশুদের প্রতি রুশ লেখকদের গভীর মনোযোগের ফলে শিশুসাহিত্য রচনার ব্যাপারে তাঁদের দায়িত্ববোধের প্রয়োজন মেলে । ... শিশুদের জন্য ভালো করে লেখা – বড় কঠিন , মন্তব্য করেন বিখ্যাত মুমু গল্পের লেখক ইভান সের্গেইয়েভিচ তুর্গেনেভ । তাঁর অভিমত “ এখানে যা দরকার তা কেবল নিজের বিবেকবুদ্ধির মতো বিষয়ের অনুশীলন নয় , কেবল ধৈর্য নয় ... কেবল সামগ্রিকভাবে মানবহৃদয় সম্পর্কে এবং বিশেষকরে শিশুহৃদয় সম্পর্কে জ্ঞান নয় , অবশেষে , অতিমিস্টতা ও ইতরতা বর্জন করে সহজ ও স্পস্ট ভাষায় গল্প বলার ক্ষমতামাত্রও নয় - এসব বাদেও এখানে দরকার হয় উঁচু পর্যায়ের নৈতিক ও সামাজিক বিকাশ ।


"মুমু"

১৮৯২ সালে যখন "শিকারীর রোজনামচা" প্রকাশিত হল তখন ইভান তুর্গেনেভ পাঠক সমাজে স্বল্প পরিচিত । যে সব গল্প গ্রন্থটির অন্তর্ভুক্ত হয় তাতে সমস্ত সৌন্দর্য ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে মধ্য রাশিয়ার কৃষ্ণমৃত্তিকা অঞ্চল আর যব-গমের খেত , বিধ্বস্তপ্রায় ঘরবাড়ি , নোংরা সরাইখানা , উজ্জ্বল বনভূমি , শান্ত নদী , গাঁয়ের অবারিত পথ এবং জনগণ থেকে নির্গত বর্ণবহুল লোকজন , বিশেষ করে ভূমিদাস চাষী - যারা নিরক্ষর অথচ প্রতিভাবান , যাদের আছে বিশুদ্ধ হৃদয় ও প্রজ্ঞা । এই বইটি রচয়িতাকে খ্যাতিমান করে তোলে । "শিকারীর রোজনামচা" থেকে শিশুপাঠ্য রূপে পরিগনিত হয়েছে "বেজিন মাঠ" , লগোভ ও "দুই গায়ক" গল্প । শিশুদের জন্য তুর্গেনেভের রচিত গল্পগুলির মধ্যে ক্লাসিক রচনা হয়ে দাঁড়ায় "মুমু" । এতে বর্ণিত হয়েছে এক কুকুরের কাহিনী । নিজের প্রভু- জমিদারনীর খামখেয়ালি হুকুমে কুকুরটির মালিক - ভুমিদাস চৌকিদার গেরাসিম তাকে ডুবিয়ে মেরে ফেলতে বাধ্য হয় । লেভ তলস্তয়ের অনুরোধক্রমে তুর্গেনেভ "শিশু অবকাশ" পত্রিকার জন্য "তিতির" গল্প লেখেন । তিনি ফরাসি লেখক শার্ল পেরোর রুপকথাও রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন এবং নিজের ভূমিকাসমেত প্রকাশ করেন ।


ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভ্‌স্কি

"অপরাধ ও শাস্তি" , কামারজভ ভাইয়েরা ও "ইডিয়ট" উপন্যাস প্রতিটি সংস্কৃতিবান মানুষের কাছে পরিচিত । এগুলির রচয়িতা - মহাপ্রতিভাধর কথাশিল্পী ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভ্‌স্কি । দুনিয়ায় সম্ভবত আর কোন লেখক নেই যিনি মানুষের দুঃখকস্ট , তার ভাবনাচিন্তার গতিবিধি ও তার বিবেকের যন্ত্রণাকে দস্তয়েভ্‌স্কির মতো এমন তীব্র ও মর্মস্পর্শী রূপে প্রকাশ করেছেন ।
কিন্তু তাঁর প্রায় প্রতিটি গ্রন্থেই কিছু কিছু পৃষ্ঠা আছে যেগুলি লেখক স্বয়ং তাঁর পাঁচ বছরের মেয়ে আর তাঁর বন্ধুদের পড়ে শোনাতেন । ওই সব অংসে তাদের মনে তীব্র আবেগ ও অনুভূতি জাগ্রত করে । দস্তয়েভ্‌স্কির ইচ্ছে ছিল অবকাশকালে নিজের গ্রন্থ থেকে শিশুদের বোধগম্য এ ধরনের অংশ সংগ্রহ করে পৃথক গ্রন্থরূপে প্রকাশ করেন। তিনি নিজে সে কাজ করে উঠতে পারেন নি । ৬০ বছর বয়সে , ১৮৮১ সালে তাঁর মৃত্যু হয় । কেবল তার দু বছর বাদে প্রকাশিত হয় দস্তয়েভ্‌স্কির রচনাবলী থেকে সংগৃহীত অংশের সংকলন গ্রন্থ “ছোটদের দস্তয়েভ্‌স্কি” । এ সংকলনের জনপ্রিয় গল্প “বড়দিনে খ্রীস্টের বালক অতিথি” । কাহিনীর খুদে নায়কের মা রাতের বেলায় গরিব লোকদের রাত্রিযাপনের এক ঠান্ডা কনকনে আশ্রয়ে মারা যায় । সকালে মার শয্যার পাশে ছেলেটার ঘুম ভাঙে। মা ঘুমুচ্ছে , এই ভেবে সে রাস্তায় বেরিয়ে আসে , ঘরবাড়ির জানালা দিয়ে তার চোখে পড়ে সচ্ছল লোকজন বড়দিনের উৎসবে মেতেছে । ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে ক্ষুধার্ত ছেলেটি কোন এক বাড়ির দেয়ালের ধারে , উঠোনের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে , ঘুমিয়ে পড়ে তার মার ঘুমের মতোই কাল ঘুমে । বলাই বাহুল্য , দস্তয়েভ্‌স্কি তাঁর গল্পটি লিখেছিলেন এই সমাজচ্যুতদের জন্য নয় । ওরা তো পড়তে অবধি জানতো না । তিনি লিখেছিলেন সেই সব শিশুদের জন্য যাদের ছিল উষ্ণ গৃহকোণ , সুন্দর সুন্দর বইপত্র । তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ওদের মনের মধ্যে হতভাগ্যদের জন্য সহানুভূতির উদ্রেক করা , করুণা ও সমবেদনা জাগিয়ে তোলা । এই সংকলনে “বাবুদের বোর্ডিং –স্কুলে” গল্পটি পাঠকের সামনে তুলে ধরে অভিজাত পরিবারের শিশুদের এক শহুরে বোর্ডিং –স্কুলের চিত্র – যেখানে জনৈক জমিদার ও এক কৃষক রমণীর অবৈধ সন্তান শিক্ষালাভের সাথে মর্মে মর্মে অনুভব করে অধিকারভোগী সমাজে অনুগ্রহপূর্বক গৃহীত এক মানুষের লাঞ্ছনা । শিশুদের প্রতি দস্তয়েভ্‌স্কির উপন্যাসের এক বয়স্ক নায়কের উক্তিঃ “বিনা অপরাধে নির্যাতিত শিশুর এক ফোঁটা চোখের জলের জন্য আমি স্বর্গের ছাড়পত্র সসন্মানে ফিরিয়ে দি “।


তলস্তয়

“যুদ্ধ ও শান্তি” আর “আন্না কারেনিনা” র মতো বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাসের রচয়িতা , সুমহান রুশ লেখক লেভ নিকলায়েভ়িচ্ তলস্তয় তাঁর শ্রম ও জীবনের অনেকগুলো বছর শিশুসাহিত্য ও শিশুশিক্ষার পেছনে ব্যয় করেন । তলস্তয় অভিজাত পরিবারের সন্তান । তিনি ছিলেন কাউন্ট জমিদার । নিজের জমিদারী ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় তিনি চাষী পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন , ১৮৭২ সালে রচনা করেন বিখ্যাত বর্ণপরিচয় আর তার পরিশিষ্ট স্বরূপ – চারটি খন্ডের “পঠন গ্রন্থমালা ” । এই বইগুলো লেখার উদ্দেশ্য তলস্তয় বিশেষ করে প্রাচীন গ্রীক ভাষা অধ্যয়ন করেন , আরবী ও হিন্দী পড়তে শেখেন । তলস্তয়ের পঠন গ্রন্থমালায় আমরা শার্ল পেররো , গ্রীম ভাইদের রূপকথা এবং “হাজার এক রাতের” অন্তর্ভুক্ত রূপকথা ও রুশ লোককথার লেখক কর্তৃক পুনর্বিন্যস্ত রূপের সাক্ষাৎ পাই । তলস্তয়ের উদ্দেশ্য ছিল অন্যান্য জাতির আত্মিক সম্পদের সাথে রুশ শিশুদের নৈকট্য সাধন । “পঠন গ্রন্থমালা”র অনেকগুলো উপাখ্যান তাঁর নিজের রচনা । “ককেশাসের বন্দী” এই স্বরচিত রচনার একটি । গল্পটিতে প্রতিপন্ন হয়েছে মানবজাতির সহজাত সুকুমার অনুভূতি এবং জাতিতে জাতিতে বৈরিতার , যুদ্ধের পৈশাচিকতার শূন্যগর্ভতা ।

ছোটদের জন্য তিনি যেমন লিখেছেন পাঠ্যবই তেমনি একশোটির বেশি গল্প লিখেছেন । গল্পের বিষয় সংগ্রহ করেছেন লোক কাহিনির ভাঁড়ার থেকে । তাঁর অমর সৃষ্টি শিশুতোষ গ্রন্থ “শিশু কাহিনী” ।


“শিশু কাহিনী” ।

আমরা দু একটা গল্প একটু নেড়ে চেড়ে দেখি ।

পিঁপড়ে ও পায়রাঃ পায়রা এসে নদীতে জল খেত । দেখল জলের তোড়ে ডুবে যাচ্ছে একটি পিঁপড়ে । পায়রা তার ঠোঁট দিয়ে একটি ডাল ছুঁড়ে দিল । পিঁপড়ে সেটার উপরে উঠল । প্রাণে বাঁচল পায়রার সাহায্যে । শিকারি জাল ছুঁড়বে পায়রা ধরতে আর পিঁপড়ে কামড়ে দেবে তার পা । শিকারির জাল ছোঁড়া আর হবে না । পায়রা বেঁচে যাবে । ছোটরা এ গল্পে ঢুকে যাক না । পায়রা হবে কি পিঁপড়ে হবে নিজেরাই ঠিক করুক । কিন্তু এটা তো ঠিক , ইচ্ছে করলে সাহায্য করা যায় , কৃতজ্ঞতার পরিচয়ও দেওয়া যায় ।

অন্য একটা গল্প । ব্যাঙদের ঝগড়াঝাঁটি লেগেই আছে । মীমাংসা করার , দন্ড দেবার জন্য কেউ নেই । এ কাজের জন্য ঈশ্বর যেন একজন জার ( তৎকালীন রুশ অধিপতি বা রাজা) কে পাঠান – সবাই এই প্রার্থনা জানাল । এমনি একটা শুকনো ডাল গাছ থেকে ভেঙ্গে পড়ল। ডালটি কাদায় গেঁথে গেল ।
এইতো ঈশ্বর আমাদের কথা শুনেছেন । জার পাঠিয়েছেন ।
কিন্তু এ কী ! এ জারতো নড়ে চড়ে না । ঝগড়া থামায় না । শাস্তি দেয় না । এ কেমন রাজা !
নাঃ । এমন জার তাদের চলবে না ।
এবার চাইলো একজন কড়া জারকে ।
একটি সারস উড়ে যাচ্ছিল । অনেকগুলো ব্যাঙ দেখে নেমে পড়ল ।
ব্যাঙগুলো উল্লাসিত । এবার নড়ে চড়ে এই জার । নিশ্চয়ই কড়া মেজাজের হবে ।
সারস খপ করে একটা ব্যাঙ ধরে মুখে পুরল। হ্যাঁ , এমন জারই তো চাই ।
কিন্তু সারস যখন অনেককে সাবাড় করল তখন ব্যাঙগুলো ভাবল , নাঃ আগের জারই ভালো ছিল ।
ব্যাঙগুলো নিজেদের অনৈক্য থামাতে বহিরাগতকে আনল । এটা কি ঠিক কাজ করেছে ওরা । জার যদি সমাজটাকে শেষ করে দেয় তাহলে সেই জার কি বাঞ্ছিত ? হয়ত এমন প্রশ্ন বড়োদের মনে বড়ো হয়ে উঠবে । কিন্তু ছোটরাও কি ভাববে না ? লেখক নিশ্চিত ছোটরাও নিজেদের মতো করেই ভাববে জারের নৃশংসতা ও ব্যাঙদের বোকামির কথা ।

প্রত্যেক জাতির নিজস্ব রূপকথা আছে । বিভিন্ন দেশের রূপকথার মধ্যে যেমন মিল অনেক তেমনি তফাৎও প্রচুর । ভারতীয় , ইংরেজি , রুশী , জার্মান , ফরাসী , চীনে রূপকথার পার্থক্য খুব সহজেই ধরা যায় । কেননা সাধারণ লোকের জীবনযাত্রা , প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং যে দেশে গল্পগুলো জন্মলাভ করে পুরুষানুক্রমে হাতবদলের ফলে বর্তমান আকৃতি লাভ করেছে , রূপকথায় সে সব কিছুর সুস্পষ্ট ছাপ থেকে যায় । রুশদেশের লোকেরা অসংখ্য গাথা , নীতিকথা , সূক্ষ হেঁয়ালি আর চমৎকার রুপকথা রচনা করেছে । এই সব কাহিনী পড়তে গেলে দেখা যায় , যারা কাহিনী বলছে তাদের কেউ থাকে দুরন্ত নদীর পাড়ে , কেউবা বিস্তীর্ণ স্তেপ অঞ্চলে , কারও বাস সুউচ্চ পাহাড়ে , কারওবা ভীষণ গহিন বনে । এই সব কাহিনীর বেশিরভাগই যখন প্রথম বলা হয়েছিল , তারপর বহু শতাব্দী পার হয়ে গেছে । যারা কাহিনী বলেছে তারা তাদের পছন্দমত , তাদের ইচ্ছানুসারে এদিক ওদিক বাড়িয়ে নতুন কিছু যোগ করে নতুন রূপ দিয়েছে । কাহিনিগুলো যত পুরনো হয়েছে , ততই বেশি মনোগ্রাহী হয়েছে , আর তাদের শিল্পগুণও বেড়েছে । শত শত বছর ধরে লোকেরা মেজে ঘসে তুলির নানা টানে এদের একেবারে নিখুঁত করে তুলেছে । এই সব কাহিনীর মধ্যে এমন সব কাব্য রসের পরশ আছে যার টানে রুসদেশের বড় বড় সাহিত্যিক , শিল্পী অথবা সঙ্গীতজ্ঞ এ থেকে প্রেরণা গ্রহন করেছেন ।

রুশদেশের বিখ্যাত কবি আলেক্সান্দর সের্গেইভিচ পুশকিন তাঁর বুড়ী দাইমার কাছে এসব কাহিনী শুনতে খুব ভালোবাসতেন । পুশকিন বলেছেন “কি অপরূপ এই রূপকথাগুল” । প্রত্যেকটি রূপকথা তিনি কবিতা আকারে লিপিবদ্ধ করে শিশুদের জন্য প্রকাশ করেছেন । তাঁর শিশুদের জন্য প্রকাশিত রূপকথার কবিতার মধ্যে অন্যতম “জেলে আর মাছের কাহিনী” ।





আলেক্সান্দর সের্গেইভিচ পুশকিন

রুশদেশের উপকথায় যেমন বিষয়বৈচিত্র তেমনি প্রকাশবৈচিত্র । উপকথা পড়তে ছোটদের চেয়ে বড়রাও কিন্তু কম ভালোবাসে না । কারন এই সব গল্পের ভাষার সৌন্দর্য , নায়কদের মোহনীয়তায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই । আকৃষ্ট না হয়ে পারা যায় না তাদের মর্মবাণীতে – কেননা এই সব গল্পবাসতে ভালোবাসতে শেখায় , সাধারন মানুষের শক্তিতে আস্থা রাখতে বলে , উন্নত ভবিষ্যৎ এবং মন্দের উপর ভালোর জয়ের প্রত্যয় গড়ে তোলে ।

ঊনবিংশ শতকে মহান রুশ সাহিত্যিকরা জার শাসিত সমাজে মানুষের অবনত চিত্তকে জাগাতে চেয়েছেন , যাতে জীর্ণ সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে নতুন সমাজ চিন্তায় দীক্ষিত হতে পারে তাঁদের পাঠক । অন্যদিকে শিশুদের জীবনের ভিতটা যদি গড়ে দেওয়া যায় তাহলে তারা রুশ সাহিত্যিকদের কাম্য সমাজের গোড়াপত্তন করতে পারবে । তাই তাঁরা নিরলস উদ্যম ও অটুট প্রত্যয়ে সমৃদ্ধ করেছেন শিশু শিক্ষার কর্ম প্রনালীকে এবং তাঁদের শিশু সাহিত্যকে ।

বিঃদঃ - ছবিতে ব্যবহৃত বইগুলোর ছবি আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহের । রুশ থেকে বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেছে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি ও রাদুকা প্রকাশন। এই দুই প্রকাশনালয় সোভিয়েত রাজের পতনের পর বন্ধ হয়ে যায় এবং বইগুলো বর্তমানে দুর্লভ ।

রেফারেন্সঃ History of Russian Children’s Literature in Historical and Social Context , Progress Publishers , Anna I. Zyryanova Moscow 1989
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২৬ ভোর ৪:৪৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কথা বলার ইসলামী রীতি

লিখেছেন আবু সিদ, ১৭ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩

১. কথার গুরুত্ব ও প্রভাব

কথা নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি শব্দ মানুষের মনে আবেগ ও চিন্তার জন্ম দেয়। ভালো কথা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, সাহস যোগায় এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়। অন্যদিকে খারাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারিনা কায়সারের মৃত্যু, সোশাল মিডিয়া ও কিছু কথা

লিখেছেন অর্ক, ১৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:০৬



কারিনা কায়সারের মৃত্যু দুঃখজনক। কষ্ট পেয়েছি। তার দাদি দাবার জীবন্ত কিংবদন্তি রানি হামিদ সকলের পরিচিত। বহুবার টুর্নামেন্ট খেলতে দেখেছি। অমায়িক মানুষ। কারিনার বাবা কায়সার হামিদও স্বনামধন্য ফুটবলার। মোহামেডান ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক টুকরা স্মৃতি!

লিখেছেন মোঃ খালিদ সাইফুল্লাহ্‌, ১৭ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৪

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড। রাত ১১ টা। ইভিনিং এ ১২ বছর বয়সের মেয়ে ভর্তি হয়েছে। ইন্টেস্টিনাল টিবি’র কেস। বাচ্চাটা থেকে থেকেই চিৎকার করছে, আংকেল আমার ব্যাথাটা কমিয়ে দেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাতছানি

লিখেছেন আহমেদ রুহুল আমিন, ১৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:২২

বাঁশবনের উপরে গোধুলীর আকাশে
কি'যে অপরুপ লাগে একফালি চাঁদ,
কাশবনের দুধারে মৃদুমন্দ বাতাসে
ঢেউ খেলে যায় সেথা জোৎস্নার ফাঁদ-
আহা..., কী অপরুপ সেই 'বাঁশফালি চাঁদ' ।

পাখিদের নীড়ে ফেরা কল-কাকলীতে
শিউলী-কামিনী যেথা ছড়ায় সুবাস,
আজানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মগজহীন গোল্ডফিশ মেমোরি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ১:০১



বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা অভিধান যারা পড়েছেন তাদের জানার কথা “মগজহীন” শব্দ নতুন কোনো শব্দ না। “মগজহীন” শব্দটি বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা অভিধানে কখন কোন সালে নথিভুক্ত হয়েছে? -... ...বাকিটুকু পড়ুন

×