somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কথা বলার ইসলামী রীতি

১৭ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১. কথার গুরুত্ব ও প্রভাব

কথা নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি শব্দ মানুষের মনে আবেগ ও চিন্তার জন্ম দেয়। ভালো কথা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, সাহস যোগায় এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়। অন্যদিকে খারাপ কথা আঘাত করে, হতাশা করে এবং মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের মতে, ভাষা মানব মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

ভালো কথার শক্তি
ভালো কথা মানসিক স্থিতি, প্রেরণা ও ইতিবাচক আবেগ তৈরি করে । Hanson (2009) মস্তিষ্কের স্ক্যান রিপোর্ট গবেষণা করে দেখান যে, ইতিবাচক শব্দ মস্তিষ্ক সক্রিয় করে, মন ভালো করে, শেখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক স্থিতি দেয়।

খারাপ কথার ক্ষতি
অন্যদিকে, নেতিবাচক শব্দ, গালি বা কঠোর সমালোচনা মানুষের মানসিক চাপ বাড়ায়। বারবার নেতিবাচক সংকেত পেলে মনে হতাশা ও বিষণ্ণতা তৈরি হয়। এতে মানুষ চেষ্টা করা বন্ধ করে দেয়। [Seligman (1975), learned helplessness] । খারাপ কথা বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা মানুষের মনে ইতিবাচক কথার তুলনায় অনেক বেশি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে [Baumeister et al. (2001)]।

বারবার কঠোর ভাষার সংস্পর্শে আসলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক স্নায়ু পথ বদলে যায় । ফলে মানুষ সহজে উদ্বেগ, রাগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়ে। কঠোর শব্দ মনকে অস্থির করে, আর সহায়ক ও কোমল ভাষা চাপ কমায় এবং মানসিক স্থিতি বাড়ায়। অর্থাৎ, আমরা যেভাবে কথা বলি (কোমল বা কঠোর, ইতিবাচক বা নেতিবাচক) তা শুধু মানসিক অবস্থাকে নয়, বরং মস্তিষ্কের স্নায়বিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে (Siegel, 2012. The Developing Mind)।

২. কথা বলার ইসলামী ঐতিহ্য

সুন্দরভাবে কথা বলা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ । যেমন বলা হচ্ছে, “আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। বাবা-মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করো … আর মানুষের সাথে কোমলভাবে কথা বলো।” (সূরা আন-নিসা ৪:৩৬) । রাসূল (সঃ) বলেছেন: “মুমিন গালি দেয় না, নিন্দা করে না, অপমান করে না এবং অভিশাপ দেয় না।” (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ১৯৭৮)।

কথা বলার ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শ যে মূলনীতি তুলে ধরে তা হলো: সত্য, কোমলতা, ন্যায় এবং সম্মান।

হজরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেন, “যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে ভালো কথা বলুক অথবা চুপ থাকুক।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৭)। এ প্রসঙ্গে তিনি (সঃ) আরও বলেন, “একটি ভালো কথা হলো সদকা।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬০২১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০০৯)।

ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, মানুষের কথা তার চরিত্রের প্রতিফলন। যেমন বলা হচ্ছে, “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও ন্যায়সংগত কথা বলো।” (কুরআন ৩৩:৭০)। “মিথ্যা থেকে দূরে থাকো, কারণ মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার মানুষকে জাহান্নামের আগুনের দিকে নিয়ে যায়।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ৬০৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৬০৭)

এছাড়া কথাবার্তায় পরনিন্দা (গীবত), অপমান এবং উপহাস এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে। যেমন, “তোমরা একে অপরের পিছনে সমালোচনা করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয় তোমরা তা অপছন্দ করবে।” (কুরআন ৪৯:১২)

ইসলামী শিক্ষায় মা-বাবা এবং পরিবারের সাথে কথা বলার যে উপায়ের কথা বলে হচ্ছে তা আদব ও বিনয়ের সর্বোচ্চ নিদর্শন । উদাহরণ হিসাবে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলছেন, “তাদেরকে (বাবা-মা) ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, এবং ধমক দিও না। বরং, তাদের সাথে সম্মানজনক ও নরম ভাষায় কথা বলো।” (কুরআন ১৭:২৩) । রাসূলুল্লাহ (সঃ) পরিবারের সাথে নম্র আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে ভালো; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়েও বেশি ভালো।” (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫)

ইসলামে ভালো কোন কথার বিনিময়ে কেবল ভালো কথা বলার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। যেমন, “যখন কেউ তোমাদের সালাম দেয়, তোমরা তাকে তার চেয়ে সুন্দরভাবে উত্তর দাও, অথবা অন্তত একই ভাবে উত্তর দাও।” (কুরআন ৪:৮৬)। অনেদিকে, কেউ মন্দ কিছু বললেও চুপ থাকা বা ভালো কথা বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন, “আর পরম দয়াময় আল্লাহর বান্দা তারাই, যারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সাথে (জেদ বা খারাপভাবে) কথা বলে, তখন তারা উত্তরে বলে, ‘সালাম’ (অর্থাৎ শান্তি)। সূরা আল-ফুরকান (২৫:৬৩)।

ইসলামি শিক্ষা অনুসারে সত্য বলার গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন বলা হচ্ছে, “নিশ্চয় আল্লাহ কোন সীমা লঙ্ঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে পথ দেখান না।” সূরা গাফির (৪০:২৮) । সত্যের পাশাপাশি দয়ার্দ্র ও কোমলভাবে কথা বলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন, “তোমার চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয় গাধার ডাক সবচেয়ে অপ্রীতিকর ।” সূরা লোকমান (৩১:১৯) । সর্বোপরি আল্লাহ বলছেন, “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও ন্যায্য কথা বলো।”(সূরা আল-আহযাব ৩৩:৭০)

দয়ার্দ্র ও কোমল কথার গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহ বলছেন, “সুন্দর কথা ও ক্ষমা সেই দান থেকে উত্তম যা আঘাতের সাথে আসে।” সূরা আল-বাকারা (২ঃ২৬৩)।

যে কোন পরিস্থিতিতে আল্লাহ এই মানদণ্ড বজায় রাখতে আদেশ দিয়েছেন। এমনকি শত্রুর সাথে কথা বলার সময়ও কুরআন কোমল ভাষা ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছে। যেমন, আল্লাহ বলেন: “ফেরাউনের কাছে যাও, নিশ্চয় সে সীমা অতিক্রম করেছে। তোমরা তাকে কোমল কথা বলো, যাতে সে উপদেশ গ্রহণ করে অথবা ভয় করে।” (সূরা ত্বহা ২০ঃ৪৩-৪৪) । এখানে আল্লাহ ফেরাউনকে সীমা লঙ্ঘনকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তবুও মূসা (আ.) ও হারুন (আ.) কে নির্দেশ দিয়েছেন তার সাথে কোমল ভাষায় কথা বলতে।

তবে কারও সাথে যদি অন্যায় হয় সেক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, “প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে যার সাথে অন্যায় হয়েছে সে ছাড়া। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” সূরা আন-নিসা (৪ঃ১৪৮) । অর্থাৎ, সাধারণভাবে চিৎকার, গালি বা প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা নিষিদ্ধ। কিন্তু যদি কেউ অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারে বা অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারে।

অন্য ধর্মের মানুষদের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, “তারা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ডাকে, তাদেরকে গালি দিও না। না হলে তারা শত্রুতা বা অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে। ... ” (সূরা আল-আন‘আম ৬:১০৮)

৩. শেষ কথা

আল্লাহ মানুষকে কথা বলার যে মানদণ্ড দিয়েছেন, তা অনন্য। মহানবী (সঃ) তাঁর জীবনযাপনের মাধ্যমে এটি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই নির্দেশনার অনুসরণ মানব মনকে কেবল সুন্দরভাবে গড়ে তোলে না, বরং পরিবারে ভালোবাসা ও আস্থা সৃষ্টি করে। সমাজে এটি সহযোগিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেয়। আর রাষ্ট্রে ন্যায় ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কার্যকর উপায় হয়ে ওঠে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৫
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×