খুব সহজ কথায় বলতে গেলে পাস্পরিক লেন-দেন, ভাব-বিনিময়, আদান-প্রদান অথবা মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতিই হচ্ছে সম্পর্ক। পৃথিবীর এই গতি, এই চলমানতা, এই সজীবতার মূল উপাদান হচ্ছে এতে বসবাসকারী জীবের সাথে জীবের অথবা জীবের সাথে জড়ের পারস্পরিক সম্পর্ক। সে অর্থে সম্পর্ক এক রকমের সঞ্জিবনী শক্তি কিংবা এক রকমের সুতা যা সৃষ্টিকে পরস্পরের সাথে এক করে নিবিড় বন্ধনের সৃষ্টি করেছে।
সম্পর্ক নানাপ্রকারের হতে পারে। এটা আত্মিক, দৈহিক, ব্যবসায়ীক, বৈষয়িক কিংবা মনোজাগতিক প্রকারের হতে পারে। আবার পারিবারিক, সামাজিক কিংবা বৈশ্বিকও হতে পারে। তবে সম্পর্ক যে প্রকারেরই হোক না কেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর স্থায়ীত্বের সীমারেখা আছে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সম্পর্ক অবিনশ্বরও হতে পারে।
এই ত্রিশ বছরের জীবনে দু'একটি ছাড়া সব প্রকার সম্পর্কেরই কিঞ্চিত অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। তবে তা সুখের নয়। সত্যি বলতে সম্পর্কগুলোকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে আমি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। ঠিক কি কারণে ব্যর্থ হলাম তার ব্যাখ্যাটা অন্তত নিজের দেয়ার একটা যৌক্তিক প্রচেষ্টা অবশ্য সবসময়ই আমার থাকে।
পারস্পরিক সম্পর্কটা নির্ভর করে আপনি ব্যক্তির প্রতি বা ব্যক্তি আপনার প্রতি কতোটা সহানুভুতিশীল তার মাত্রার উপর। এ মাত্রার হেরফের বা কমবেশি হলে চলে। তবে যদি তা একতরফা হয় তবে সম্পর্কটা কোন অবস্থায়ই টিকবেনা। এক পক্ষের প্রচেষ্টায় তা হয়তো কিছুদিন টিকে থাকবে। তবে নিশ্চিতভাবেই কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙ্গে পড়বে। সম্পর্ক কখনই লেনদেনের গভীরতা বা এর আদানের মাত্রার উপর নির্ভর করেনা। এটা নির্ভর করে বিশ্বস্ততার উপর। ঠিক ততোদিনই সম্পর্কটা সুখের হবে যতোদিন আপনি বিশ্বস্ত থাকবেন। অন্যপক্ষ্যের ক্ষেত্রেও এটা সমভাবে প্রযোজ্য। সম্পর্ক বিনির্মাণে আমি কখনই প্রতিপক্ষের প্রতি সহানভুতিশীল ছিলাম অন্তত তা ব্যক্তিগতভাবে আমার তা মনে হয় না। বরং প্রতিপক্ষের কাছ থেকেই আমি তা সবসময় আশা করি বা করতাম। ঠিক তেমনি অন্যের প্রতি বিশ্বাস রাখার যোগ্যতাটা আমার একেবারেই কম। সবসময়ই মনে হয় জগতের সবাই ঠক। জগতে অন্যদের সৃষ্টি হয়েছে শুধু আমাকে ঠকানোর জন্য।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমি সর্বগ্রাসী। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আমি শুধু নিজের মত করে চাই। তার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার চেয়ে আমার ইচ্ছাটাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি তাকে আমার মতো করে ভাবতে পছন্দ করি। চিন্তা করি তার ব্যক্তিত্ব আমার সাথে মিশে যাবে। আমার ইচ্ছা, আকাংখাগুলো তার ইচ্ছা বা অকাংখা হয়ে যাবে। কিন্তু সম্পর্ক মোটেও তা নয়। সম্পর্ক রুশোর সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্বের মতো। অর্থাৎ এর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি যৌথ ইচ্ছা তৈরী হবে তবে তা কোন অবস্থায়ই ব্যক্তির স্বতন্ত্র ইচ্ছাকে ত্যাগ করে নয়। রুশোর এ কথাটি আমি তাত্ত্বিকভাবে মেনে নিলেও বাস্তবজীবনে কখনই এর প্রয়োগ কখনই ঘটাই না।
আমার নেতিবাচক বা ইতিবাচক সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত। যখন 'না' বলি তখন সেটা চূড়ান্ত অর্থেই 'না'। যখন 'হা' বলি তখন সেটা চূড়ান্ত অর্থেই 'হা'। কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন চূড়ান্ত বা রুক্ষতা অথবা রক্ষণশীল হওয়ার কোন সুযোগ নেই। সম্পর্ক সহনশীল হতে শেখায়। এটা ব্যক্তিকে সুযোগ দেয়। এটা ব্যক্তিকে নেতিবাচক প্রবৃত্তি থেকে বের হয়ে আসার জন্য প্ররোচনা দেয়। সম্পর্ক ব্যক্তিকে ধৈর্য্যশীল করে। এটা ব্যক্তিকে অপেক্ষা করার শক্তি দেয়। ত্যাগ করা বা বিরক্ত হওয়া সম্পর্কের পরিধিভুক্ত নয়।
সম্পর্কগুলোকে পরিচর্যা করতে হয়। সম্পর্কগুলোকে পরিপুষ্ট করতে হয়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে হস্তিনাপুরের জন্মান্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র জনৈক ঋষির (নামটা ঠিক এ মুহুর্তে মনে আসছে না) কাছে এ যুদ্ধের পরিনতি সম্পর্কে কাছে জানতে চেয়েছিলেন। ঋষি বলেছিলেন বৃক্ষ শুধু ফল বা ছায়াই দেয়না, সে স্থানও দখল করে। যে বৃক্ষ ছায়া বা ফল কোনটাই দিতে পারেনা তার সে স্থান দখল করার কোন অধিকার নেই। তার বিদায় নেয়াই সমীচীন। ধৃতরাষ্ট শুধু শারীরিকভাবেই অন্ধ ছিলেন না বরং তিনি পুত্রপ্রেমেও অন্ধ ছিলেন। মোহাবিষ্ট রাজা তাই মহান ঋষির বাক্যের সারমর্মটা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেননি। বুঝে ছিলেন যুদ্ধের পর শতপুত্রকে হারিয়ে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমি শুধু স্থানই দখল করেছিলাম। এগুলোর পরিচর্যা বা এগুলোকে ছায়া দিতে পারিনি। তাই অনিবার্য্য পরিনতিতে এক সময় না এক সময়ে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও নিজের স্থানটা ছেড়ে দিতে হয়।
সম্পর্ককে ধরে রাখার ক্ষেত্রে নিদারুন ব্যর্থতা দেখালেও প্রকৃতির নিয়মে একটা সম্পর্ক আমার রয়েই গেল। এটা হয়তো সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মায়ের সাথে সম্পর্কটা সে ছোটবেলায় যেমন ছিল এখনও তেমন আছে। এতে অবশ্য আমার কোন কৃতিত্ব নেই। বলা যায় মায়ের একতরফা, ত্যাগ, সহানুভুতি, স্বার্থহীনতার কারণেই এ সম্পর্কটা টিকে আছে। ঠিক তেমনি ঈশ্বরের সাথের সম্পর্কটাও টিকে আমার প্রতি তার অসীম দয়া আর একতরফা ছাড় দেয়ার কারণে। এক্ষেত্রেও আমার কোন কৃতিত্ব নেই।
মাঝে মাঝে আমার মনে হয় মা'ই হয়তো ঈশ্বর। আমার মতো অপদার্থ-কে ক্ষণে ক্ষণে এ জগতের চলার উপযোগী করার জন্য ঈশ্বরই হয়তো মায়ের রূপ ধারণ করে সদা আমাকে আগলে রাখছেন। মা'ই হয়তো ঈশ্বরের আরেক রূপ, আরেক নাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



