স্বাধীনতা... বাঙ্গালিদের জন্য সবচেয়ে মধুর শব্দ... যার মুল্য তিরিশ লক্ষ শহীদের টাটকা রক্ত আর লাখো মা-বোনের পবিত্রতা......
সেই স্বাধীনতার স্থান আজ কেবল বই এর পাতায়।
থাক, এসব উচ্চমার্গীয় কথা গুলো উচ্চ পর্যায়ের মানুষদের জন্য তুলে রাখলাম। আমি আমার কথা বলি।
আমার বাবার চাকরি থেকে অবসর নেয়ার বয়স হয়েছে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাবাকে নিয়ে গর্ব বোধ করি।
কিন্তু বুঝতে শেখার পর থেকে বাবাকে বিজয় দিবস বা এরূপ যেকোন উপলক্ষে খুশি হতে দেখিনি। তখন বুঝতামনা। বাবার কাছে জানতে চাইতাম, কি ব্যাপার বাবা? সবাই আনন্দ করছে কিন্তু তুমি কখনো কিছু করনা কেন?
তখন বাবা তার যুদ্ধের কিছু কিছু স্মৃতি আমার সামনে তুলে ধরতেন।
একটা উদাহরণ দিই, একবার এভাবে বাবা আমাকে আমাদেরই এলাকাতে ঘটে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের এক ঘটনা শুনিয়েছিলেন। তখন ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিক, বাবারা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এলাকার চিন্হিত রাজাকার দের ধরে আনা হয়েছে। বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধারাই চাইছিলেন তাদের গুলি করে মারতে। কিন্তু আমার বাবা সহ আর বেশ কয়জন বলেছিলেন, যুদ্ধ তো জিতেই গেছি, এদের আর মেরে কি লাভ? এরচেয়ে এদের মাফ করে আরেকটা সুযোগ দিই।
এ কথা শুনে বাবার দিকে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকালে বাবা বলতেন, 'আজ যখন দেখি সেই রাজাকার সুযোগ টা কাজে লাগিয়ে অনেক বড় ধনী হয়েছে, বিজয় দিবসে দামি গাড়িতে বাংলাদেশ এর পতাকা লাগিয়ে ঘুরছে, তখন আর হৃদয়ে আনন্দটা কাজ করেনা।'
তারপর যখন বাবা ওই রাজাকারের পরিচয় দিলেন, তখন অবাক হয়েছি। আমার চেনা লোক, রাস্তায় দেখলে সালাম দিই প্রায়ই।
এখন বাবার বয়স হয়েছে, শরীরে রোগের বসতি। তাকে প্রতি মাসেই ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যেতে হয়।
তিনি আমাকে একদিন বললেন, আমাকে তোমরা যেভাবে প্রতি মাসে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও, স্বাধীনতাকেও যদি কেউ নিয়ে যেত!
তখন আবারও অবাক হয়েছিলাম।
তবুও প্রতিবার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলি, 'বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।'
আর বাবা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা বলেন তা হল, 'বাবা, জীবনে যেখানেই যাও, যা ই কর- নিজের দেশ এর সাথে কখনো বেঈমানী কোরোনা। এদেশের স্বাধীনতা টা তোমার বাবারা বহু ত্যাগ স্বীকার করে অর্জন করেছেন। তাদের মর্যাদা কখনও নষ্ট কোরোনা।'
এভাবে বলে তিনি হতাশ দৃষ্টিতে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। খুব সাধারণ একটা দৃশ্য, তবু আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।
কারণ জানি, এ হতাশা হল শান্তির ঘুম নষ্ট করে ভবিষ্যতের জন্য দেখা স্বপ্নের করুন পরিণতি টা দেখার।
জ়ানি,এ হল নিজের জ়ীবন বাজি রেখে লড়াই করে অর্জিত স্বাধীনতাকে সময়ের কালো গহ্বরে বিলীন হতে দেখার কষ্ট।
তাই বাবার কথাগুলো শুনে কোনকিছু বলতে পারিনা, শুধু 'হ্যা'-সূচক মাথা নাড়ি।
কারণ জানিনা আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবার মর্যাদা ধরে রাখতে পারব কিনা।
জানিনা বাবাকে কিভাবে সান্তনা দেব?
তাই শুধু মাথা নাড়ি, আর বাবা একদৃষ্টিতে চেয়েই থাকেন।
স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে আমি স্বাধীনতাকে পাইনি, পেয়েছি আমার বাবাকে। আমার কাছে স্বাধীনতা হল বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারা, 'আব্বু, তোমাকে খুব ভালোবাসি'।
এবার প্রথমবারের মত বাবাকে ছাড়া বিজয় দিবস কাটাতে হচ্ছে। হয়তো বাবাকে টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানাবো, হয়তো এবার বাবার চোখের হতাশা দেখতে পারবোনা।
এ হতাশা কেবল তখনি দূর হবে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার শুধু সংবিধানের পাতায় নয়, বাংলাদেশি সকল জনগণের হৃদয়ে স্থান হবে.........
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এই চাওয়াটা কি খুব বেশী??????????????????????????
স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পূর্তিতে আমার সকল ভাবনা এই প্রশ্নে এসে থেমে যায়............
[এই লেখা টি ব্লগস্পট এ দিয়েছিলাম ১৬ই ডিসেম্বর এ। বিজয়ের মাস উপলক্ষে
somewhereinblog এ যাত্রা শুরু করলাম এটা দিয়েই।]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


