‘ম্যাডাম,৮ মম্বর বেডের পেশেন্ট সিস্টার চন্দ্রাকে দেখে খুব অদ্ভুত আচরণ করছে।আপনি একটু আসবেন?’
ভাবনায় ডুবে ছিলাম।রাতে ভাল ঘুম হয়নি বলে মাথাটাও ঝিমঝিম করছে কেমন।কথা শুনে তাকালাম সিস্টার শারমিনের দিকে।‘আপনি যান,আমি আসছি।’
প্রায় এক সপ্তাহ হল,৮ নম্বর বেডের রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ইভা।১৬ বছর পর ওর সাথে এভাবে দেখা হবে ভাবিনি।প্রথমে চিনতে পারি নি।পরে চিনতে পেরে ভাললাগার বদলে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।আমি,শুভা,ইভা,রাব্বী,শিবলী,শেফা,সাজু,মাসুদ-সবাই মিলে একসাথে কত খেলেছি ছোটবেলায়!গোল্লাপাতা,ঘুড়ি উড়ানো,সাত চারা,বরফপানি,কানাকানি-কত খেলাই না খেলেছি ইউসুফ গণি স্কুলের মাঠটাতে!ক্লাশ সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষার পর আমরা সপরিবারে ঢাকায় চলে আসলাম।তারপর আর যাওয়া হয়নি শ্যামপুরে।
নিয়তি আজ মনোরোগ চিকিৎসক ডাঃমীনা ওয়াদুদকে শেকড়ের কাছেই নিয়ে এসেছে।বছরখানেক হল,এখানকার জেলা সদর হাসপাতালে বদলি হয়ে এসেছি আমি।মাঝে মাঝে খুব দেখতে ইচ্ছে করে শ্যামপুরকে,স্কুলের মাঠটাকে।কিন্তু এখনো যাওয়ার সময় করে উঠতে পারি নি।ছোটখাট ছুটিতে দেখা যায় ঢাকায় রওয়ানা হয়েছি।
অনেকগুলো ভাবনা একসাথে ভীড় জমিয়েছে মাথায়।অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল।চশমাটা চোখে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম চেয়ার থেকে।রুম থেকে বেরুতেই চিৎকার কানে এল।ইভা খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে চিৎকার করছে।কী বলছে তা খুব একটা স্পষ্ট নয়।সিস্টার চন্দ্রাকে দেখে মনে হল একটু ভয় পেয়েছে কিংবা অপ্রস্তুত হয়ে গেছে।নতুন জয়েন করেছে মেয়েটা,হয়তো এমন অভিজ্ঞতা আগে হয় নি।আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চুপ করে যায় ইভা।কোণা চোখে দেখতে থাকে আমাকে।সে আমাকে চিনতে পারে নি।তবে আমাকে ভয় পায় এটা বুঝতে পারি।হয়তো আর দশটা রোগীর মত সাদা এপ্রোনটাকেই তার ভয়।
আমি বোধহয় সিস্টার চন্দ্রার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম।চন্দ্রার অস্বস্তি বুঝতে পেরে চোখ সরিয়ে নিলাম।আর প্রায় সাথে সাথেই আবিষ্কার করলাম,শুভার সাথে সিস্টার চন্দ্রার কোথায় যেন একটা মিল আছে!
ইভা আর রাব্বীর বড় বোন শুভা।বয়সে আমার চেয়ে দু’এক বছরের বড় হতে পারে।কখনও এসব ব্যাপার মাথায় আসে নি।আপা বলে ডাকার কথাও মনে হয় নি কোনদিন।ছোটবেলা থেকেই আমরা নাম ধরে ডাকতাম ওকে।বোবা আর কিছুটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছিল সে।আমাদের কথা বুঝতো,খেলার জন্য বায়না ধরতো,গল্প শুনে বোকা বোকা অথচ নিষ্পাপ হাসি হাসতো।কেবল কিছু বলতে পারতো না।জড়ানো কন্ঠে যে অর্থহীন আওয়াজ করতো,তা বুঝার কোন উপায় ছিল না।আমরা ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলতাম।আমাকে খুব পছন্দ করতো শুভা।বেশিরভাগ সময় আমাদের বাড়িতে এসে বসে থাকতো।আমার মাথায় তেল দিয়ে চুলে বেণী করে দিত প্রায়ই।মা ওকে খুব আদর করতেন।ভালবাসা সে খুব ভাল বুঝতে পারতো।ইভা-রাব্বীরা বেশিরভাগ সময়ই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতো।বড়বোনের মর্যাদা তো দিতই না,বরং সবসময় কেমন দূর দূর করতো।তুই-তোকারি করে কথা বলতো যেখানে তাচ্ছিল্যটাই বেশি প্রকাশ পেত।শুভা কষ্ট পেত বুঝতে পারতাম।কিন্তু তারপরও দেখতাম সে হাসছে তার বোকা বোকা হাসি।ওদের বাবা ছিল না,ছোটবেলাতেই মারা গেছেন তিনি।খালাম্মা প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকতেন।তার উপর সংসারের নানা চাপ,অভাব-অনটনে ছেলেমেয়েদের দিকে নজর দিতে পারতেন না ঠিকমতো।ওদের মামা-চাচারা এক-আধটু সাহায্য করতো ওদের।
আমরা যেদিন ঢাকায় চলে আসলাম,সেদিন অনেক কেঁদেছিল শুভা।দৌড়ে দৌড়ে আমাদের গাড়ির পেছন পেছন এসেছিল বড় রাস্তার মোড় পর্যন্ত।যতক্ষণ দৃষ্টিসীমায় ছিলাম,ও তাকিয়ে ছিল।আমার খুব খারাপ লাগছিল ওর জন্য।মা বলতো,কোন ধনী পরিবারে জন্ম নিলে ও ভাল থাকতো।সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তোবা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যেতো।জন্ম থেকে তো আর এমন নয়,আড়াই বছর বয়সে ভীষণরকম টাইফয়েড হয়েছিল ওর।তারপর থেকে এমন।টানাটানির সংসারে মেয়েটা এখন শুধুই একটা বোঝা,আর কিছুই নয়।অথচ একটু ভালবাসার অনেক বেশি কাঙ্গাল ও।একটু ভাল করে কথা বললেই অনেক বেশি খুশি হয়।
মাঝে মাঝে রেগে গেলে খুব ভয়ঙ্কর হয়ে যেত শুভা।কেউ সামলাতে পারত না।তখন শুধু আমার মায়ের কথা শুনতো।মনে আছে,একবার বৃষ্টির দিনে আমাদের বাড়ির বারান্দায় বসে আমভর্তা করছিলাম আমরা সবাই মিলে।শুভাও আমাদের সাথে অংশ নিতে চাইলে ইভা খুব বাজেভাবে ওকে নিষেধ করে।শুরু হয় তুমুল ঝগড়া।এক পর্যায়ে বটি হাতে ইভাকে তাড়া করে শুভা।পরে মা ওকে শান্ত করেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ভুলে যায় শুভা।আমি খুব অবাক হয়েছিলাম।আমিও ইভাকে ছোটবোনের মতই আদর করতাম।কিন্তু সেদিন কষে একটা চড় দিয়েছিলাম ওর গালে।
“কী ইভা!কিছু বলবে?ওকে তুমি চেনো?”ইভার কাঁধে হাত রাখি আমি।
ইভা ভয়ে ভয়ে তাকায় আমার দিকে।ধীরে ধীরে মাথাটা দোলায় এপাশ-ওপাশ।
“মিথ্যে বলছো কেন ইভা?ওকে তুমি চেনো না?বলো,কোন ভয় নেই।আমি কিন্তু ওকে চিনি”।
আমার কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হল বলে মনে হল।তারপর হঠাৎ কান্না শুরু করে।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরি।“কাঁদে না ইভা,তুমি কাঁদলে শরীফ কষ্ট পাবে তো”।
সাথে সাথে থেমে যায় ইভা।ছ’মাস হল শরীফের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে।ইভা ভীষণ ভালবাসে শরীফকে।শরীফের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে এক সপ্তাহ আগে।শরীফই ওকে নিয়ে এসেছে হাসপাতালে।ভালই ছেলেটা,ইভাকে অনেক ভালবাসে।পাইলট স্কুলের কাছে একটা স্টেশনারী দোকান আছে ওর।ওর কাছ থেকেই সব ঘটনা শুনলাম।বিয়ের প্রথম তিন-চার মাস ভালই ছিল ওরা।তারপর যখন ইভার দেহে নতুন প্রাণ অস্তিত্ব নিল,তখন থেকে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে।প্রথমে সমস্যা ছিল ছোটখাট,কিন্তু ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়তে থাকে।শ্যামপুরে মায়ের বাড়িতে যাওয়ার পর আরও বেড়ে যায়।
ইভা ঘুমিয়ে পড়েছে।ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রুমে ফিরে আসলাম।শরীফের সাথে একবার কথা বলা দরকার।ওর কাছ থেকেই ভয়ঙ্কর সংবাদটা শুনেছি।ওদের বিয়ে হয়েছিল গত ফাল্গুনে।তার মাস দুয়েক আগে,এক শীতের সকালে শুভার নিথর দেহ ভাসতে দেখা যায় পুকুরের জলে।এটা আত্মহত্যা ছিল কি না কেউ জানে না।কারণ শুভা সাঁতার জানতো।
শরীফের সাথে বিয়ের আগে ইভার বেশ কয়েকবার বিয়ে ভেঙ্গে যায় একের পর এক।তখন থেকেই শুভার বন্দীদশা শুরু হয়।অবহেলিত মেয়েটা আরও বেশি অবহেলিত হতে থাকে।চার দেয়ালে বন্দী থেকে কেবল ছোটফট করতো।আর পরিবারের সবার তীর্যক কথাবার্তা,বকা-ঝকা তো ছিলই।মাঝে মাঝে নাকি শারীরিক নির্যাতনও করা হতো।ইভাও অনেক দোষারোপ করতো বোনকে।যেদিন শুভা মারা যায়,তার আগের দিন রাতে খালাম্মা নাকি ওকে বলেছিল, “তুই মরতে পারিস না অলক্ষী।তোর জন্য এত কষ্ট,তুই বুঝিস না!আমার হাড়-মাংস এক করেও পেট ভরে না তোদের!যেদিকে দু’চোখ যায়,আমি চলে যাব।হয় তুই মর,নয় আমারে মেরে ফেল”।
এসব ঘটনা শরীফ জানতে পারে অনেক পরে,ইভার মানসিক সমস্যা শুরু হবার পর।ইভাকে নিয়ে অনেক পীর-ফকিরের কাছেও গিয়েছেন শরীফের মা।কোন লাভ হয় নি।দিন কতক ভাল,তারপর আবার যেই সেই।একা একা কথা বলে,বিড়বিড় করে।মনে হয় যেন শুভার সাথে কথা বলছে।শুভা ওর সামনে বসে আছে।ও শুভাকে দেখতে পাচ্ছে।কখনো খুব হেসে হেসে গল্প করে আবার কখনো প্রচন্ড গালি-গালাজ করে,তুই-তোকারি করে।
গতকাল সকালে শরীফ ইতস্তত করছিল।মনে হল কিছু বলবে।জিজ্ঞেস করায় যা বলল তাতে চমকে উঠলাম আমি।ওর নাকি মাঝে মাঝে মনে হয়েছে,সত্যি সত্যিই শুভা আসে ইভার কাছে।শুভার অস্তিত্ব সেও টের পেয়েছে।বলল, “আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না আপা।তাই বলিনি প্রথমে।তবে আমার এই অনুভূতিটা সত্যি”।
আমি চমকে উঠেছিলাম কারণ গতরাতেই আমি ব্যাপারটা প্রথম টের পাই।মনে হচ্ছিল,শুভা আমাকে দেখছে।আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে তার নিষ্পাপ হাসি।এই হাসিটা আর বোকা বোকা লাগে না আমার।
আমি ঠিক করেছি শ্যামপুর যাব।ইভাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব।এমনিতে হাতে অনেক কাজ।কিন্তু এটা করা অনেক বেশি জরুরী।ইভা মা হতে যাচ্ছে।এই সময় সমস্যা আরও বেশি জটিল হওয়ার আগেই চিকিৎসা দরকাত।নয়তো সন্তানের উপর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।আর শ্যামপুরও আমাকে টানছে খুব।সেই মাঠ,পুকুরঘাট দেখতে ইছে হচ্ছে।আগের মতো ঘাটে বসে জলে পা ডুবিয়ে গল্প করতে ইচ্ছে হচ্ছে।শুভাও নিশ্চয়ই যোগ দিবে আমাদের গল্পে।কিছু না বলুক,চুপচাপ শুনবে আমাদের গল্প আর হাসবে।আমি জানি,শুভা অনেক পছন্দ করে আমাকে।আমার কথা সে কিছুতেই ফেলতে পারবে না।ওকে বুঝিয়ে বলব আমি।ইভার এতবড় ক্ষতি সে কখনোই করতে পারবে না।ওর মনটা ভীষণ নরম।আর হাজার হোক-বড় বোন তো!
পরিশিষ্ট
গত বৈশাখে ইভা আর শরীফের একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।ইভার শাশুড়ী নাতনীর নাম রাখতে চান বৈশাখী।কিন্তু ইভা আর শরীফ ওকে শুভা বলেই ডাকে।কোন নামটা স্থায়ী হবে বুঝা যাচ্ছে না।
ইভা এখন পুরোপুরি সুস্থ।শুভা আপা আর যখন তখন ওর সামনে আসেন না।ইভাও আর একা একা কথা বলে না।তবে মাঝে মাঝে নাকি শরীফ,ইভা দুজনের সাথেই একসাথে গল্প করে শুভা আপা।আসলে তো গল্প করে শরীফ আর ইভা।শুভা আপা শুধু শুনে আর হাসে।আমি অবিশ্বাস করতে পারি না।কারণ সেইদিনও শুভা এসেছিল-শ্যামপুরের পুকুরঘাটে।আমরা সারা বিকেল গল্প করে কাটিয়েছিলাম।সেদিনই বুঝেছিলাম আমি-ইভা সুস্থ হবে,পুরোপুরি মানসিকভাবে সুস্থ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

