দাদুবাড়ি সিলেটে আর বসবাস ঢাকায় হওয়ার কারণে সেই ছোটবেলা থেকেই ঢাকা-সিলেট ট্রেন জার্নি করে অভ্যস্ত আমি।বছরে অন্তত দুই ঈদে শিকড়ের কাছে যাওয়া হতোই সপরিবারে।আজও যাওয়া হয়।তবে বর্তমানে পড়াশুনার খাতিরে সিলেটে থাকি বলে আর মাস/দেড়-মাসে একবার বাসায় আসা হয় বলে ট্রেন জার্নির সংখ্যাটা অনেক বেড়ে গেছে।বাসে ভ্রমন করেছি খুব কমই।হুটহাট সিদ্ধান্ত নিলে তখন হয়তো বাসে চড়ে চলে আসি ঢাকায়।তবু খারাপ লাগেনা রেলগাড়ি ভ্রমণ।সময় একটু বেশি লাগে,তবু বাসের চেয়ে অনেকগুণ বেশি ভাল।বমি লাগে না,প্রকৃতির কোল ঘেঁষে আসার সৌভাগ্য হয়।
ছোটবেলা যখন স্কুলে কোন ক্লাসমেট বলত,সে কখনো ট্রেনে চড়ে নি-খুব অবাক হতাম।এও সম্ভব!ট্রেনে কীভাবে একবারও চড়ে নি একটা মানুষ!তাহলে দাদুবাড়ি যায় কীভাবে!
আজ কয়েক মাস হল,রেল মন্ত্রনালয় গঠিত হয়েছে।দায়িত্বপ্রাপ্তির পর রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অনেক আশা জাগানীয়া কথা বলেছিলেন।ভাল লেগেছিল অনেক।আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের মন্ত্রীরা কথায় বরাবরই পটু।যখন ভুল ভাঙ্গল,তখন ঐ কবিতার লাইনটা মনে পড়লো ‘...আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’
আমার রুমমেট দুজনের বাড়ি চট্টগ্রাম হওয়ায় ওদের দুর্ভোগ দেখতাম সেই ফাস্ট ইয়ার থেকে।বাসায় যাওয়ার আগে টিকেট করা ছিল এক ঝকমারি ব্যাপার।হয়তো হুট করে ছুটি হয়ে গেল,আমরা যারা ঢাকায় থাকি চট করে ব্যাগ গুছিয়ে চলে আসতে পারি বাসায়।ট্রেনের টিকেট না পেলেও আধাঘন্টা পর পর বাস আছে আমাদের জন্য।কিন্তু ওদের জন্য সকাল আর রাতের দুটো ট্রেনই সম্বল।সিলেট-চট্টগ্রাম রাতের বাস আছে।কিন্তু ডাকাতির ভয়ও আছে।আর সেই দুটো ট্রনের টিকেট যথাসময়ে পাওয়া তো অনেক ভাগ্যের ব্যাপার!৯/১০ দিন আগে স্টেশনে গেলেও টিকেট পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই।আজও ব্যতিক্রম হয় নি।তবে সাথে যোগ হয়েছে সিলেট-ঢাকা ট্রেনগামী আমাদের দুর্ভোগ!
স্টেশনে গেলে একটা কথাই শুনতে হয়,টিকেট নাই।মনিটরে লেখা দেখায়,সীট খালি নাই।অথচ স্টেশন ম্যানেজারের রুমে গিয়ে ভালভাবে রিকোয়েস্ট করলে/পরিচিত মামা-চাচার পরিচয় দানে টিকেট পাওয়া সম্ভব হয়।মোবাইলে টিকেট করার ব্যাপারটা চালু হয়েছে ঠিক কবে আমি জানি না।আমার যতদূর মনে পড়ে,বছরখানেকও হয়নি।সার্ভিসটা শুরুর দিকে বেশ ভাল লেগেছিল।স্টেশনে না গিয়ে মোবাইলে টিকেট কাটা সহজ হতো।যদিও মাত্র ২৫% টিকেট দেয়া হয় অনলাইনে।বর্তমানে কী হচ্ছে জানি না-মোবাইলেও টিকেট পাওয়া যায় না।ধরে নিলাম,মানুষ প্রযুক্তির সুবিধা উপভোগ করছে বেশি বেশি।তাই হয়তো সংকট।সেক্ষেত্রে বলব,পুরো ব্যাপারটাকে যদি ডিজিটাল করে ফেলা সম্ভব হতো,তবে ভাল হতো।আফটার অল,আমরা এখন ডিজিটাল বাংলাদেশের বাসিন্দা!!
খুব অবাক হয়েছিলাম,যখন প্রথম বুঝতে পারলাম স্টেশনের উল্টাদিকের কিছু দোকানের সাথে রেলের কর্মচারীদের লিঙ্ক।লিঙ্ক তো লিঙ্ক,উপরন্তু টিকেট কাউন্টারে টিকেট নেই বলার পরই সেই দোকানের একটা করে কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলছে, ‘ওখানে গেলে পেতে পারেন’।সেই দোকানগুলোয় প্রতি টিকেটে ৪০ টাকা বেশি রাখে আজকাল।কদিন আগেও ৩০ টাকা বেশি রাখতো।আর কিছুদিন পর সেটা বেড়ে কত হবে জানি না।তারা ভালই বুঝতে পারছে,আমরা জিম্মী।আমাদের অন্য উপায় নেই।
দুঃখজনক ঘটনা যে,আগে এই ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমার চট্টগ্রামের বন্ধুদের।এখন আমরাও বাদ পড়ি না।বাসের ভাড়াও বেড়ে গেছে অনেকখানি।তাই ট্রেনের উপর চাপও বেড়েছে একইসাথে।সবই মানি।কিন্তু মানতে পারি না রেলের অভ্যন্তরীন মানুষের জোচ্চুরি।নিজেদের পকেট ভারী না করে সবাই মিলে রেলের উন্নয়নের চেষ্টা করলে আজ রেলের এত খারাপ অবস্থা হতো না।
আমি নিজে কয়েকজন কর্মচারীকে চিনি যারা টিকেটবিহীন যাত্রী উঠান।আমি নিজেও কয়েকবার ভ্রমণ করেছি এভাবে,করতে বাধ্য হয়েছিলাম।এবং তখন বুঝতে পারি,ঐ বগি্র পুরোটাতেই এভাবে যাত্রী উঠানো হচ্ছে।এরকম বগির সংখ্যা কত আমার জানা নেই।আরেকবার প্রথম শ্রেণীতেও দেখলাম একই অবস্থা!মনে হচ্ছিল আমি আর আমার বন্ধু ছাড়া বাকিরা সবাই টিকেটবিহীন উঠছেন এবং পরে টিকেট ম্যানেজ করছেন।আর ম্যানেজ করে দিচ্ছেন খোদ টিটিরাই!!
এবার যখন টিকেট পেলাম না,মোবাইল-স্টেশন করে হয়রান,বাসে যাওয়া বিলাসিতা মনে হচ্ছে,তখন নতুন অভিজ্ঞতা লাভে উৎসাহী হলাম।কালোবাজারী!মজার ব্যাপার,আমাদের টিকেটের ক্রয়ের তারিখ ছিল যাত্রার দিনই!খুব মনে পড়ছিল এস.এস.সি. পরীক্ষার কথা।প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষায় মামাদের টাকা দিতে হতো।টাকার বিনিময়ে ২৫ নাম্বারে ২৫ প্রাপ্তি প্রায় নিশ্চিত ছিল। আমাদের অনেকেরই নিষ্পাপ শিশু মন তখন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।‘ঘুষ দিব!কেন দিব?’সেই থেকে অভিজ্ঞতা লাভের শুরু,একটু একটু করে সমাজ তার সাথে চলার উপযোগী করে তুলছে আমাকে।এই আমি কর্মক্ষেত্রে যেতে যেতে অনেক বেশি অভিজ্ঞ হয়ে যাব নিঃসন্দেহে!তখন সমাজ আমাকে দোষ দিতে চাইলে কি সেটা ঠিক হবে?
মাননীয় রেলমন্ত্রী এতোদিনেও কালো বিড়াল খুঁজে বের করতে পারলেন না!সত্যিই কি খুঁজেছিলেন তিনি?আমার সন্দেহ আছে,যথেষ্ট সন্দেহ আছে।‘হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা’, ‘ঢেলে সাজানো’ শব্দগুলো কেমন যেন একঘেঁয়ে হয়ে গেছে।নতুন শব্দ চাই।
পেপারে ছোটবেলায় ছবি দেখেছিলাম জাপানীজ ট্রেনের।কী সুন্দর ইলেক্ট্রিক ট্রেন!ওগুলোতে ভ্রমণ করলে নাকি কোন ঝাঁকুনি হয় না।কর্মঠ জাপানীজরা সময়কে কাজে লাগায়।ভ্রমণের সময় হাতে থাকে পকেট ডিকশনারী।ভ্রমন করতে করতেই জেনে নেয়,শিখে নেয় নতুন নতুন শব্দ।সেই থেকে আমি স্বপ্ন দেখি,এমন ট্রেন চড়ার.........
জানি না কবে পূরণ হবে সেই স্বপ্ন!আদৌ পূরণ হবে কি না!তবে আমি আশাবাদী।চেতনা থাকলে আমরা নিশ্চয়ই পারব।কবি বলেছেন না,'চেতনা রয়েছে যার,সে কি পড়ে রয়?' !

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

