somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বলা হলো না কিছুই.....

২১ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ৩:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মানুষের জীবনটা অনেক ছোট জানি।তবু মাঝে মাঝে ভাবনার আগেই যখন জীবন হারিয়ে যায় হুট করে,তখন মেনে নিতে প্রচন্ড কষ্ট হয়।আমরা কত পরিকল্পনা করি,দৃশ্য সাজাই.... কিন্তু স্রষ্টা তখন মুচকি হাসলে কি আর দৃশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব!কখনোই না..........
আমি পেপার পড়ি না অনেক মাস হয়ে গেছে।কে জানে বছরও হতে পারে।হাতের কাছে পেলে পাতা উল্টাই মাঝে মাঝে।ইন্টারনেটের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ন খবরগুলো কিছুটা জানা হয়েই যায়।তাই অভ্যাসটাও চলে গেছে অনেকটা।আজ হাতের কাছে পত্রিকা পেয়ে পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিলাম।তাও একদিনের বাসি পেপার।এই খবর দেখতে হবে কে জানতো!ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ফজলুল করীমের ইন্তেকাল ।খবরটা অন্য কারো কাছে তেমন মানে না রাখলেও আমার কাছে অনেক বড় কিছু।
এক যুগ আগে,আমি অসুস্থ ছিলাম।বড় ধরণের অসুখ।কেমোথেরাপি নিতে হয়েছিল কয়েক সাইকেল।ক্লাশ সেভেনের বালিকা তখন আমি।অনেকেই আমার চিকিৎসা করেছেন।করিম স্যার তাদের মধ্যে একজন।অসুখের কারণে আমার পড়াশোনায় গ্যাপ হয়ে যায়।আব্বু-আম্মু,শিক্ষকদের সিদ্ধান্তে আমাকে পরের বছর আবার ক্লাশ সেভেনে ভর্তি করা হয়।পড়াশোনার কারণে যেন আমার উপর বেশি চাপ না পড়ে,এটাই আমার মা-বাবার চাওয়া।আমার মা উদ্বিগ্ন ছিলেন আমি আবার আগের মত পড়াশোনা করতে পারব কি না!এসব কারণে আমার কিছুটা মন খারাপ থাকতো স্বাভাবিকভাবে।ফলো-আপের সময়টাতে করিম স্যারকে আম্মু খুলে বললেন আমার ব্যাপারটা।উনাকে আমার দাদু/নানুর মত মনে হতো।উনি খুব সাহস দিলেন আমাকে এবং আম্মুকে।তারপর বললেন, ‘দেখবেন,মেয়ে পরবর্তিতে ফার্স্ট হয়ে হয়ে যাবে’।অদ্ভুত হলেও সত্য,আমি তাই হয়েছিলাম-ক্লাশ নাইন পর্যন্ত!এখনো ভাবলে আমার অবাক লাগে।হয়তো এটা নিতান্তই কাকতালীয় ব্যাপার ছিল অথবা হয়তো উনি আমার মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগাতে পেরেছিলেন।আমি জানি না-কি ছিল কারণ!কিন্তু আমি উনার কাছে কৃতজ্ঞ আমার সুস্থতার জন্য,আমাকে সাহস প্রদানের জন্য।
উনি অনকোলজি রিলেটেড অনেককিছুর চেয়ারম্যান ছিলেন।তখন আমাকে একটা ছোটখাট হ্যান্ডবুক দিয়েছিলেন অনকোলজির কোন একটা সেমিনারের উপর।আমি তখন পড়ে তেমন কিছু বুঝতে না পারলেও রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে।আজও আছে আমার কাছে।আমি এখন মেডিকেল শেষ বর্ষে।এখন আমি অনেক কিছু বুঝি।অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল উনার সাথে গিয়ে দেখা করে সালাম করে আসব।নিশ্চয়ই উনি অনেক খুশি হবেন।উনার আশীর্বাদ আমার দরকার।কিন্তু আমার ভাবনা বাস্তবায়ন করা হয়ে ওঠে না।উনার সাথে দেখা করতে চাই-ব্যাপারটা আম্মু/আব্বুকে বলতে কেমন যেন সংকোচ হতো।জানি না কেন।
মেডিকেলে ভর্তির পর থেকেই ইচ্ছাটা জাগে মনে।এই শেষ বর্ষে এসে ইচ্ছাটা প্রবল হয়।তবু বলতে পারি না।উনি ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন।একবার এক আত্মীয়কে নিয়ে আব্বু গিয়েছিলেন।এসে আমাকে কিছু ভিজিটিং কার্ড দিলেন উনার।সেগুলোও আমি রেখে দিয়েছি যত্ন করে।
একবার আলী যাকেরের উপস্থাপনায় ‘আলোয় ভুবন ভরা’ অনুষ্ঠানে উনি এসেছিলেন লাল পাঞ্জাবী পরে।আম্মু দেখতে পেয়েই আমাকে ডাক দিলেন।
আমি অনেকবার উনার কোন ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার/ই-মেইল এড্রেস খুঁজেছি ইণ্টারনেটে।পাই নি।উনার ভিজিটিং কার্ড দেখে বাসার নাম্বারে ফোন দিয়েছি।জানলাম সেটা ভুল নাম্বার।ঢাকায় কিছুদিনের জন্য এসে যাওয়া আর হয়ে ওঠে না।তাই ভেবেছিলাম আগে ফোনে যোগাযোগ করব।এবার সিলেট থাকাকালীন সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম ঈদের ছুটিতে এসে দেখা করব ইনশাআল্লাহ।আম্মু/আব্বুকে বলতে না পারলে বড় আপুকে নিয়ে চলে যাব।সিলেটে থাকাকালীন সময়ে,এই কিছুদিন আগে জাপান-বাংলদেশ ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতালে ফোন করে উনার পি.এ. র সাথে কথা বললাম।জানতে পারলাম উনি অসুস্থ কদিন ধরে।চেম্বারেই আসেন না।আমি কোন ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার/ই-মেইল এড্রেস/বাসার ঠিকানা চাইলাম।জানলাম দেয়া যাবে না।ফোন রেখে দিলাম।
আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম উনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন।বয়স হয়েছে উনার জানি।তাই ভয় পেয়েছিলাম একটু।অনেক চিন্তা করে ভাবলাম চিঠি লিখব।জাপান-বাংলদেশ ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতালের ঠিকানায়।নিশ্চয়ই তিনি পাবেন।আবার মনে হলো কেউ যদি চিঠি খুলে ফেলে/উনার হাতে না পৌঁছে!সাত-পাঁচ আমি কেবল ভেবেই গেছি।চিঠি লেখা হয়ে ওঠে নি।আমার সর্বশেষ ভাবনা ছিল ঢাকায় এসে উনার চেম্বারে গিয়ে দেখা করব।একটা ছো্ট-খাট কোন উপহার নিয়ে যাব।একটা মগ দেয়া যেতে পারে।উনি তাতে করে চা/কফি খেতে পারবেন।সে অভ্যাস না থাকলে পানি খেতে পারবেন।আবার মনে হলো সুন্দর কোন কলম নেয়া যায়।সে কলম দিয়ে উনি প্রেসক্রিপশন লিখবেন।কিন্তু উনি কি আমাকে চিনবেন!আমি কিভাবে চেনাব নিজেকে!আমার প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে যাব।দেখলে হয়তো উনার মনে পড়বে।আমার প্রেসক্রিপশনের এক জায়গায় উনি আরেকজন ডাঃ এর উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন ‘please take all care for this child’.দেখলেই ভাল লাগে।উনি আসলেই আমার অনেক কেয়ার করেছিলেন।কিন্তু আমার এত শত ভাবনা যে নিরর্থক হবে আমি কী এর জানতাম!সেই অসুস্থতা যে উনাকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যাবে কে জানতো!আমি গত ১৮ তারিখ,বৃহস্পতিবার ঢাকা আসি।আর ঐদিনই কিনা তিনি ইন্তেকাল করলেন।সেই খবর আমি জানলাম আরো দুদিন পরে!তাও বাসি পেপার হাতে নিয়ে!ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল দুই গাল বেয়ে।এই ১৮ তারিখেই মারা গেল আমাদের মেডিকেলের জুনিয়র দুইজন ছেলে।সেই ধাক্কা সামলে উঠার আগেই আরেকটা ধাক্কা।সামনে আর কী অপেক্ষা করছে কে জানে!
আল্লাহর দরবারে একটাই প্রার্থনা-আল্লাহ উনাকে ভাল রাখুন।আপনারা দোয়া করবেন আমিও যেন একদিন উনার মত ডাক্তার হতে পারি-যার প্রস্থানে একজন রোগীর চোখ থেকে হলেও জল ঝরবে।


সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১২ দুপুর ২:৫১
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×