somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিষন্ন দাঁড়কাক

২২ শে জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ৩:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক গহীন জঙ্গলে ছোট একটা গাছের ডালে বাস করতো একটা ডানা ভাঙা টুনটুনি পাখি। ডানা ভাঙা ছিল বলে পাখিটা কোথাও উড়ে যেতে পারতো না, কারো সাথে ঘুরতে যেতে পারতো না, মিশতে পারতো না! টুনটুনি তার ভাঙা ডানা নিয়ে আশেপাশের ঘাস আর ঝোপের ভেতর থেকে ছোটখাটো পোকামাকড় ধরে খেত আর মাঝে মাঝে তার ছোট্ট বাসায় বসে করুণ সুরে বিষন্ন মনে গান গাইতো।

একদিন একটা দাঁড়কাক সেই জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় টুনটুনির গান শুনতে পেল। এমন করুণ গলায় কে গান গাইছে সেটা জানতে কাকটার খুব কৌতুহল হল। কাক খুঁজে খুঁজে টুনটুনির বাসাটা বের করলো। ছোট্ট বাসায় ছোট ডানা ভাঙা পাখিটাকে দেখে কাকের খুব মায়া হলো! সে টুনটুনির সাথে বসে কিছুক্ষণ গল্প করলো। টুনটুনির চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ! সে যতই এটা ওটা নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকে কাক ততই আগ্রহ নিয়ে তার প্রশ্নের জবাব দেয়। এক সময় সন্ধ্যা হয়ে গেল। কাক সেদিনের মতো বিদায় নিল, তবে কথা দিয়ে আসলো সে প্রায়ই টুনটুনির সাথে গল্প করতে আসবে। টুনটুনির আনন্দ আর ধরে না। সে প্রতিদিনই একগাদা কৌতুহল আর উৎসাহ নিয়ে কাকের জন্য অপেক্ষা করে আর টুনটুন করে গান গায়। কাক আসে, টুনটুনিকে রঙবেরঙের গল্প শোনায়। কখনো ঝমাঝম চলা রেলগাড়ীর গল্প, কখনো কালো ধোঁয়া বের করে চলতে থাকা স্টিমারের গল্প, তো কখনো ডাস্টবিন ভর্তি রসালো সুস্বাদু লোভনীয় খাবারের গল্প। এসব গল্প শুনতে শুনতে ডানা ভাঙা টুনটুনিটা যেন আপন চোখে পৃথিবীটাকে দেখতে পায়। কাকের গল্প গুলো সব তার নিজের গল্প মনে হয়। প্রায়ই আফসোস হয়, ইশ ডানা দুটো যদি তার ঠিক থাকতো তাহলে সেও কাকের মতো এতকিছু দেখতে পেত! আর কাউকে শোনাতে পারতো এমন গল্প। একদিন টুনটুনি কাকের কাছে আবদার করে বসলো যে সেও যাবে তার সাথে পৃথিবী দেখতে।

ছোট টুনটুনির আবদার শুনে কাকের মায়া হলো। যদিও তারপক্ষে টুনটুনিকে নিয়ে সবকিছু দেখানো সম্ভব ছিল না। তাই শেষে ঠিক করলো টুনটুনির নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য সে পৃথিবীটাকে তার কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। এরপর কাক যেখানেই যায় তার কর্কশ গলায় ‘কা কা কা’ করে অন্য পাখিদের বলতে থাকে, “ঐ জঙ্গলে যদি কখনো যাও ছোট টুনটুনিটার সাথে দেখা করে এসো, সে তোমাদেরকে সুন্দর গান শোনাতে পারবে।” কাকের কথা ময়ূরের কানে গেল, কাকের কথা রাজহাঁসের কানে গেল, কাকের কথা দোয়েলের কানে গেল, কাকের কথা ঈগলের কানে গেল, এমনকি নিরীহ ঘাসফড়িঙও বাদ গেল না। ছোট টুনটুনির গান শোনার জন্য সবাই উদগ্রীব। একে একে ময়ূর গেল, রাজহাঁস গেল তার দলবল নিয়ে, ঈগল গেল, দোয়েল গেল, বাবুই গেল, টিয়া গেল, গেল সবুজ ঘাসফড়িঙ। যেই যায় মুগ্ধ হয়ে টুনটুনির গান শোনে আর টুনটুনিকে শোনায় তাদের দেখা পৃথিবীর গল্প। নিজের চারপাশে এত এত পাখি পেয়ে টুনটুনির আনন্দ আর ধরে না। দেখতে দেখতে ছোট টুনটুনির ছোট্ট বাসাটা যেন সুখে ভরপুর হয়ে গেল। সব সময়ই কেউ না কেউ তার সাথে থাকতো, আর থাকতো গল্প আর গান।

এদিকে কাক তখনও টুনটুনির বাসায় যেত। কিন্তু দিন দিন কাকের প্রতি টুনটুনির আগ্রহ কমতে থাকলো। সে ময়ূরের সাথে লেজ দুলিয়ে নাচে, রাজহাঁসের হাঁটার ভঙ্গি নকল করে, কখনো বা ঈগলের মতো থাবা উঁচিয়ে ঘাসফড়িঙকে ভয় দেখাতে চায়। দাঁড়কাকের কর্কশ গলার গল্পের চেয়ে ঈগলের শিকার ধরার কাহিনী তার কাছে অনেক বেশী রোমাঞ্চকর মনে হতো। দাঁড়কাকের ডাস্টবিনের খাবারের গল্পের চেয়ে টিয়াপাখির লালমরিচ খাওয়ার গল্প তার কাছে বেশী মজার লাগতো। একসময় দাঁড়কাক অনুভব করলো যে তাকে ছাড়াই টুনটুনিটা বেশ ভাল আছে। যদিও টুনটুনির সাথে গল্প না করলে দাঁড়াকাকের ভাল লাগে না, কিন্তু টুনটুনির আনন্দ দেখে সে আর কিছু বললো না। সে কমিয়ে দিল টুনটুনির বাসায় যাওয়া। অন্য পাখিরা যখন টুনটুনির ছোট্ট গাছতলায় নাচের আসর বসাতো দাঁড়কাক তখন কোন এক ডাস্টবিনের ভাঙা দেওয়ালে বিষন্ন মনে বসে থাকতো। দাঁড়কাকের আর উড়তে ইচ্ছে করে না, নতুন কিছু দেখতে আগ্রহ হয় না। আর উড়ে দেখেই বা করবে কি? সে তো আর আগের মতো টুনটুনিকে গল্প শোনাতে পারছে না। তবুও টুনটুনিটা ভাল আছে এই মনে করে সে এ শহরে ও শহরে উড়ে বেড়াতো লাগলো বিচ্ছিন্ন ভাবে। এখনো যদি আপনারা শহরে যান, দেখবেন একটা বিষন্ন দাঁড়কাক এলামেলো ডানা ঝাপটিয়ে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় আনমনে ডেকে উঠছে ‘কা কা কা।’

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ Sylvanlobo

জানুয়ারী ২২, ২০১৬
রামপুরা, ঢাকা।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ৩:২৪
২২টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন কাওসার চৌধুরী ও তার গল্পগুচ্ছ 'পুতুলনাচ' (বই রিভিউ)

লিখেছেন আকতার আর হোসাইন, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ২:১৫



লেখকের প্রথম বই--- বায়স্কোপ: যে বইয়ে কাওসার চৌধুরী এঁকেছেন জীবনের বায়স্কোপ

আর সবার মতন একজন লেখকেরও রয়েছে স্বাধীনতা। যার যে বিষয়ে ইচ্ছে সে সেই বিষয়েই লিখবে। জোড় করে কোন লেখকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

যীশুর রহস্যময় বাল্যকালঃ মিশর অবস্থান কাল বার বছর পর্যন্ত

লিখেছেন শের শায়রী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৩:৩০



যীশুর জীবনের অন্যতম রহস্যময় ঘটনা হিসাবে যা আমার কাছে মনে হয় তা হল যীশুর বাল্যকাল। ইতিহাস প্রসিদ্ধ ধর্মপ্রচারকদের মাঝে যীশুর জীবনির একটা অংশ নিয়ে আজো কোন কুল কিনারা পাওয়া যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাড়ী ভাড়া বিষয়ক সাহায্য পোস্ট - সাময়িক, হেল্প/অ্যাডভাইজ নিয়েই ফুটে যাবো মতান্তরে ডিলিটাবো

লিখেছেন বিষন্ন পথিক, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:১৭

ফেসবুক নাই, তাই এখানে পোস্টাইতে হৈল, দয়া করে দাত শক্ত করে 'এটা ফেসবুক না' বৈলেন্না, খুব জরুরী সহায়তা প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা...
আমার মায়ের নামে ঢাকায় একটা ফ্লাট আছে (রিং রোডের দিকে), ১৬০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ১০:৪৫


জীবনানন্দ দাস লিখেছেন- সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...। বনলতা সেন কবিতার অসাধারণ এই লাইনসহ শেষ প্যারাটা খুবই রোমান্টিক। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের রোমান্টিসিজমে সন্ধ্যার আলাদা একটা যায়গাই রয়ে গেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৪৪



"বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!", এই কথাটি আমাকে বলেছিলেন আমাদের গ্রামের একজন নতুন বধু; ইহা আমার মনে অনেক কষ্ট দিয়েছিলো।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণীত, গ্রাম্য এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×