আজ কিছু দৃশ্য দেখি!
দৃশ্য-১:
কর্নেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সে এমন ভাবে মোটেরোলার সেট টার দিকে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে সে শত্রু পক্ষের যুদ্ধের ম্যাপের দিকে তাকিয়ে আছে। সে ১২০০ হর্সপাওয়ারের একটা ক্রেনের রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে ঘন্টা দুই আগে। এখন সব তড়িৎ গতির সময়, তাই দেরী হবার প্রশ্নই আসে না। সকালেই বসের কাছ থেকে স্পেশাল পার্মিশন নিয়ে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রন নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে, নিজের আন্ডারে রেখেছে ৪ টা কোম্পানী। তবুও তার মাথা খারাপ। একবার দক্ষিন কোরিয়ার বর্ডারে যখন অগ্রসর হচ্ছিলো তখন তারা একটা খারাপ এ্যাম্বুশের শিকার হয়েছিলো, প্রথমে ভেবেছিলো ফ্রেন্ডলি ফায়ার। রাতের বেলা ফ্ল্যাগ উচিয়ে ফ্লেয়ার জ্বালিয়ে সংকেত যে দিলো তাকে স্নাইপারের গুলিতে প্রাণ দিতে হলো তখনই। কিছুক্ষন পর রেডিওতে জানতে পোরলো তাদেরকে এ্যাম্বুশ করা হয়েছে। ব্যাক আপ আসার আগে তারা মাত্র তিনজন বেচে ছিলো। তার পায়ে একটা গুলিও লেগেছিলো। এরকম আরো অনেক ঘটনার সাক্ষী যেখানে মৃত্যু তাকে শুধু দেখা দিয়ে চলে গেছে, কিন্তু আজকের ঘটনার সাথে সে কিছুই মিলাতে পারছে না।
একটা ২৫-২৬ বছরের যুবক পড়ে আছে ধ্বংসস্তুপের নীচে। ভূমিকম্পের দুদিন পরের ঘটনা। সামনের সবকিছু পরিস্কার করার পরই একে আবিস্কার করে খননকাজে নিয়োজিত একজন, সাথে সাথে তাকে জানায় ইমার্জেন্সী মোডে। তার আসার আগেই লোকজন এসে উপস্হিত। কেউ কিছু করতে পারছে না। কারন ছেলেটার উপর তিনটা বেশ বড় বড় স্ল্যাব এমন ভাবে তিনকোনা হয়ে পড়েছে যা তার পা দুটো থেতলে গেছে। সামনের দিকে স্লাব গুলো উচু হয়ে আছে কারন একটা পিলার অর্ধেক ভেঙ্গে ওগুলোকে সাপোর্ট দিচ্ছে। যেহেতু স্ল্যাব গুলো উচু হয়ে আছে সেহেতু পাশের বিল্ডিঙ এর প্রায় চারটা ফ্লোরের কংক্রিটের মেঝে শুধু ওটার সাথে আটকে আছে। তার মানে ঐ ভাঙ্গা পিলার সাপোর্ট দিয়ে আছে পাশের ভেঙ্গে যাওয়া প্রায় ৮ তলা বিল্ডিংএর স্তুপ। যদি উপর থেকে কাজ করতে যায় তাহলে আরো দুদিন লাগবে, আর তার উপরের স্লাব সরাতে গেলে সবকিছু গড়িয়ে পড়বে সবার উপর। ছেলেটা স্তুপের নীচে পরে শুধু গোঙ্গাছে। বেশ শক্ত সামর্থ্য, সুদর্শন। একজন টিভি চ্যানেলের মেয়ে এগিয়ে এলো তার কাছে।
-এখন কি অবস্হা?পানি লাগবে? কিছু লাগবে?
ছেলেটা মুখ থেকে কোনোরকমে বললো,"ফোন।" মেয়েটা তড়িঘড়ি করে ফোনটা দিলো। এই ফাকে ক্যামেরাম্যানকে বললো লাইভ শূট করতে। ছেলেটা একটা নম্বর কোনোমতে বললো যেটা ওর ওয়াইফের নম্বর।
-হ্যালো, স্যারেনা, আমি জন!
-জন, তুমি কোথায়?তোমার সেল বন্ধ কেন?
- স্যারেনা আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ ভেরী মাচ।
ওপাশ থেকে শুধু কান্নার শব্দ। চারিদিকে দেখা গেলা সবার দৌড়াদৌড়ি যেমন করেই হোক বাচাতে হবে ওকে। কর্ণেল কিছুক্ষণের জন্য থান্ডারড হয়ে গেলো। এদিকে ক্রেন আসতে পারছে না কারন রাস্তায় পরে আছে আরো বিশাল ধ্বংস স্তুপ। সরাসরি এ্যায়ার ফোর্সে কল দিলো।
-আমার এখনই একটা রাশিয়ান চপার দরকার। ১০-২০ টন টানতে পারে এরকম একটা। এখনই!
-এখন ওটা সম্ভব হচ্ছে না, কালকে একটা VO1 এর মোটর জ্বলে গেছে। আর বাকী দুটো শহরের উত্তরে গেছে। ওখানে আজ প্রাইম মিনিস্টার ভিজিট করছেন।
-এটা ক্রিটিক্যাল! আমার এখনই একটা যেকোনোমূল্যেই হোক দরকার, এটা ইমার্জেন্সী। আমি আবারও বলছি আমার এখনি দরকার। দরকার হলে জেনারেলকে লাইন দেন, কিন্তু আমার একটা এখনই চাই!
রাশিয়ান চপার গুলো বেশ শক্তিশালী, অলৌকিক ভাবে সব কিছু টানতে পারে।কল্পানার বাইরে এর কর্মক্ষমতা।কিন্তু আজকে তার এরকম অলৌকিক কিছুর এখনই দরকার। প্রয়োজন হলে সে আজ আরেকটা যুদ্ধে হবে, কিন্তু একে বাচাতে হবে, বাচাতেই হবে।
কর্নেল তার দীর্ঘ সেনাবাহিনীর ক্যারিয়ার আজকে চোখ মুছছে!
দৃশ্য-২
জটলার ভিতর হঠাৎ গন্ডগোল। এক বুড়ো সবার দিকে তেড়ে আসছে। পিছনে ধ্বংস স্তুপ পুরো চারতলা মাটির ভিতর ঢুকে গেছে। উপরে ছাদটা হেলে আছে ধ্বংসস্তুপের উপর। বুড়ো কাউকে এগুতেও দিচ্ছে না। অথচ এখনই উপরের ছাদটা ভাঙ্গা দরকার। সরকারি সাহায্য এখনো পৌছে নি, দেরী হবে নিশ্চয়ই। সামনের জটলা থেকে একজন এগিয়ে যেতেই বুড়ো তার দিকে একটা পাথর ছুড়ে মারলো। তার গায়ে লাগলো, কিন্তু ব্যাথাটাকে সে তোয়াক্কা করলো না। এখন সবারই পাগলের দশা। সে এগিয়ে যেতেই বুড়ো একটু ভয়ে কুকড়ালো। তার গায়ে আস্তে করে হাত বুলিয়ে জানতে চাইলো কি হয়েছে।
বুড়োটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। বললো একটু আগে তার মেয়েটা ফোন করেছিলো। বলছিলো সে স্কুলে। আজকে ওর জন্মদিন। বাসায় ওর জন্য কেক রেডী আছে, শুধু মোমবাতী লাগানো বাকী, বললো তাড়া তাড়ি আসছে ক্লাশটা নিয়েই। এমন সময় চারিদিকে কাপুনি আর সবকিছু ওলটপালট, বৃদ্ধ বাড়ির আঙ্গিনায় লুটিয়ে পড়লো। একটু পর যখন সব থামলো, সে চেয়ে দেখলো চারিদিকে ধ্বংস স্তুপ। মোবাইলের লাইনটাও কেটে গেছে। সে দৌড়ে চলে আসে স্কুলটার সামনে। এসে দেখে এখানে আদৌ কোনো স্কুল ছিলো বলে মনে হচ্ছে না। তার মেয়েটা ছিলো গ্রাউন্ড ফ্লোরে। তার মানে এখন মেয়েটা সবার নীচে আছে। উপরে কেউ যদি স্লাবটা ভাঙতে যায় তাহলে সরাসরি প্রেসার পড়বে ওর মেয়ের উপর।
সে যেটা বললো:
ছোটবেলা একবার দোলনা থেকে পরে হাটুতে ব্যাথা পেয়েছিলো, তখন তার হাটুতে একটু চামড়া ছিড়ে রক্ত বেরিয়েছিলো। তার সহধর্মিনী দুদিন পাগলের মতো কেদেছে। মেয়েটা ব্যাথায় খুব কাতড়েছিলো। তারপর তাকে খুব সযত্নে বড় করে তোলা হয়েছিলো। কয়েক বছর আগে বুড়োর বুড়ি মারা গিয়েছে। এখন সম্বল বলতে ওর মেয়েটিই। সে চায় না তার মেয়ে কোনো ব্যাথা পাক।
বলতে বলতে বুড়োটা হাউমাউ করে কেদে ফেললো। ভদ্রলোক কিছু বলতে পারলো না, শুধু বললো,"ঈশ্বর আপনার মেয়েকে নিরাপদে রাখুন!" এই বলে কাজে এগিয়ে গেলো!
আমার আর লেখার কিছুই নাই। বিবিসির এই ডকুমেন্টারীটা ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে মুছে দিলাম। দেখার সময় খুব কান্না পাচ্ছিলো।
কান্না গুলো মুছতে গিয়ে দেখলাম মানুষ যখন দুঃখে বা সুখে কাদে তখন তার সেই বর্ণহীন অশ্রু। এর কোনো রং নেই, শুধু আছে অনুভূতির যেটা আমরা দেখি না।কিন্তু কস্ট গুলো সব একই। কারো বুকে পাহাড়ের সমান কস্ট, কারো মনে সাগরের সমান।
ঈশ্বর বলতে কেউ আছেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু সন্দেহ আছে সে আদৌ এই কস্টের রং গুলো উপভোগ করেন কিনা!
কেউ যদি আমাকে এই প্রশ্ন করে তাহলে আমি তাচ্ছিল্যের সুরেই বলতাম আমার ঈশ্বর হবার টাইম নাই!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


