somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন পোশাক শ্রমিকের কথ..

০২ রা মে, ২০১১ রাত ১২:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে শুরু কইর‌্যা সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত কাজ কইর‌্যা মাত্র তিন হাজার ৭০০ টাকা বেতন পাই। কোনো কোনো দিন যদি কামে যাইতে একটু দেরি অয়, তাইলে মাসের বেতন থাইক্যা টাকা কাইট্যা রাখে। আর ওভারটাইম করলে মাঝে মাঝে টাকা পাই।’ নিজের পরিশ্রমের কথা অকপটে বলছিলেন পোশাকশ্রমিক শাহনাজ বেগম (২৮)।
খুব অল্প বয়সেই বাবা মারা যান শাহনাজ বেগমের। মা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংসারের দায়ভার পুরোটা এসে পড়ে শাহনাজের ঘাড়ে। অভাবের কারণে পড়াশোনা করেননি। তাই কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে সংসারের অভাবের তাড়নায় অসুস্থ মাকে নিয়ে পাড়ি জমান ঢাকার পথে। ঢাকায় এসে পরিচিত এক বোনের সহায়তায় কাজ পেয়ে যান একটি তৈরি পোশাক কারখানায়। মা-মেয়ের সংসার ভালোই কাটছিল। কিন্তু দেখতে সুন্দর হওয়ায় যে কারখানায় তিনি কাজ করতেন, সেখানকার সহকর্মী, এমনকি সুপারভাইজাররাও তাঁর সঙ্গে অশালীন আচরণ করতেন। এমন সংকটময় মুহূর্তে শাহনাজের সঙ্গে পরিচয় হয় সহকর্মী সেলিমের। পরিচয়ের শেষ পর্যায়ে পরিণয় পর্যন্ত গড়ায়। ১৯৯৮ সালে তাঁরা দুজন ভালোবেসে সংসারজীবন শুরু করেন। তখনো তিনি জানতেন না, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। বিয়ের পর তাঁকে পাঠিয়ে দেন শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে গিয়েই শাহনাজকে হতে হয় চরম বাস্তবতার শিকার। জানতে পারেন ভালোবাসার মানুষটি সম্পর্কে। সেলিমের আরও এক স্ত্রী আছেন। এত দিন সেলিমের প্রথম স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। তিন বছর পর অনেক টাকা-পয়সা নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আসেন সেলিমের কাছে। নিঃস্ব শাহনাজকে ফেলে সেলিমও প্রথম স্ত্রীর টাকা-পয়সার লোভে তাঁর কাছে চলে যান। শাহনাজ তখন এক কন্যাসন্তানের জননী। সেলিম আর তাঁদের নিজের কাছে রাখবেন না—সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন শাহনাজকে।
কী করবেন ভেবে না পেয়ে মেয়ে জান্নাতকে নিয়ে আবার ঢাকায় চলে আসেন শাহনাজ। কোনো খোঁজখবর নিতেন না সেলিম তখন। শুরু হয় আবার শাহনাজের সংগ্রামী জীবন। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ঢাকার একটা বায়িং হাউসে পিয়নের চাকরি পান। ছোট্ট শিশুর সঙ্গে দেখা করার কোনো নিয়ম সে অফিসে ছিল না। তাই মেয়ে জান্নাতকে মায়ের কাছে রেখে কাজ করতে যেতেন। মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতন পেতেন। তা দিয়ে মোটামুটি ভালোই চলছিল। সেলিম তখন হঠাৎ করে আবার আসা-যাওয়া শুরু করেন। ইচ্ছে হলে দু-তিন মাস পর পর এসে দেখে যান তাঁদের। আবার মাঝেমধ্যে আসেনও না। তবে দুই সংসারের খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই বলে শাহনাজের ভরণপোষণ দিতে পারবেন না বলে জানান সেলিম। কিন্তু হঠাৎ করে বায়িং হাউসটি বন্ধ হয়ে গেলে শাহনাজ ভীষণ বিপদে পড়ে যান। এরপর অনেক কষ্ট করে হেলপারের চাকরি পান একটি তৈরি পোশাক কারখানায়। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। আবার রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত কিংবা বন্ধের দিন ওভারটাইম করলে ৪০ টাকা করে প্রতি ঘণ্টায় দেওয়া হয়। তবে ওভারটাইমের টাকা সময়মতো পাওয়া যায় না। মাসের ৫-৬ তারিখে বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় ১০ তারিখের দিকে। ফলে বাড়ি ভাড়া ও মেয়ের স্কুলের বেতন সময়মতো পরিশোধ করতে পারেন না ।
ওভারটাইম করতে গিয়ে টাইফয়েডে অসুস্থ শাহনাজ ১৫ দিন তাঁর কর্মস্থলে যেতে পারেননি। চাকরির মেয়াদ এক বছর না গেলে ছুটি পাস হয় না। যেহেতু তাঁর চাকরির ১১ মাস চলছে, তাই ১৫ দিন অসুস্থতার কারণে ১০ দিনের বেতন কাটবে। তিনি পাবেন মাত্র পাঁচ দিনের বেতন, কারণ অনেক কষ্ট করে হলেও পাঁচ দিন দুই ঘণ্টা করে কাজ করেছেন। তাঁর এই অসুস্থতার মধ্যে একবার বাসায় আসেন স্বামী সেলিম। তিনি শাহনাজের অসুস্থতার কথা জেনে তাঁর চিকিৎসা না করিয়ে বরং বলেন, ‘তিন দিনের বেশি মানুষ অসুস্থ থাকে না।’ মেয়ে জান্নাত এখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। বাবার কাছে মেয়ে কোনো আবদার করে না। শত অভাবেও মেয়ের মুখে যেন হাসি থাকে, সে চেষ্টাই সব সময় করেন শাহনাজ। তাই মেয়ে ও মায়ের কথা চিন্তা করে তাঁকে তো সুস্থ হতেই হবে। পুরোপুরি সুস্থ না হয়েও আবার যেতে শুরু করেন কর্মস্থলে, নইলে যে বেতন কাটা যাবে। বাড়ি ভাড়া, মেয়ের স্কুলের বেতন, সংসার খরচ কীভাবে চলবে! অসুস্থ শরীরে কাজ করে ফিরে আসার পথে রাস্তায় মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়ে পা ফুলিয়ে ফেলেন তিনি। প্রচণ্ড ব্যথা শরীরে, তবুও নেই যেন কোনো বিশ্রাম।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে নিজের কষ্টের কথা এভাবেই বলেন শাহনাজ, ‘ছোটবেলায় বাপ মরছে। অভাবে অনেক কষ্ট পাইছি। জীবনে সুখের লাইগ্যা যারে ভালোবাইস্যা বিয়া করছি, সেও আমার লগে প্রতারণা করল। অভাব-অনটনের সংসারে অসুস্থ হইয়্যা ঘরে বইয়্যা থাকলে তো কেউ আমারে টাকা দিব না। যত কষ্ট হোক, নিজের ব্যবস্থা নিজেরই করতে হইব। দুই ঘণ্টা কাজ কইর‌্যা আবার সুপারভাইজাররে অসুখের কথা কইয়্যা যে কয়ডা টাকা পামু, তা-ই আমার লাভ।’
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×