somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ফাহমিদুল হক
মাধ্যম ও সংস্কৃতি অধ্যয়নের পাঠশালা

ফেসবুক থেকে শাহবাগ

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ১২:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শাহবাগের অভূতপূর্ব গণআন্দোলন সবাইকে চমকে দিয়েছে। এমনকি আমরা ৫ ফেব্র“য়ারির বিকেলে যখন জাদুঘরের সামনে সমবেত হই, আমরাও কি ভেবেছিলাম বিকেল চারটার শখানেক মানুষের ঐ সমাবেশ এরকম জনসমুদ্রে রূপান্তরিত হবে? অনেকে বলছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ভাগ্য নির্ধারণ করবে এই আন্দোলন। ৫ ফেব্র“য়ারির বিকালে শাহবাগে কয়েকজন ব্লগার বা অনলাইন ব্যবহারকারী যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তা আজ সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে বিশাল এক গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে জনগণের যে দুর্মর আন্দোলন চলছে তার ডাক দিয়েছিল ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক নামক একটি সংগঠন। এ এক অভিনব ঘটনা বটে। আমরা দেখেছি আরব বসন্তের আন্দোলনকারীরা ফেসবুক, টুইটার এবং ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলি ব্যবহার করে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। আর এখানে আন্দোলনের ডাক দিয়াছে খোদ ফেসবুকের একটি গ্র“প। এদেশে টুইটার তেমন জনপ্রিয় নয়, ইউটিউব কয়েক মাস ধরেই বন্ধ করে রেখেছে নির্বোধ সরকার। বহু বয়স, পেশা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নিলেও, শেষ পর্যন্ত এটা ব্লগারদের আন্দোলনরূপেই পরিচিতি পেয়েছে। নিঃসন্দেহে এ এক রাজনৈতিক আন্দোলন, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করতে পারছে, নেতৃত্ব নিতে বা দিতে পারে নি। নেতৃত্ব রয়েছে ব্লগারদের হাতেই। বরং কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা সংহতি প্রকাশ করতে এসে, বক্তৃতা দিতে গিয়ে, বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

যাই হোক, এই ঘটনা সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ে মানুষের উপলব্ধি পরিস্কার করেছে, প্রমাণিত হয়েছে ফেসবুক প্রজন্ম নিয়ে অন্যদের ধারণায় ভ্রান্তির মেশাল রয়েছে। এই প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ তো নয়ই, জাতীয় বা মানবিক স্বার্থের ব্যাপারে রাজনীতিবিদ কিংবা বুদ্ধিজীবীদের চাইতে অনেক স্পষ্টবাদী। এই আন্দোলনের মাধ্যমে হয়তো তরুণ ব্লগারদেরও, নিজেদের কর্মতৎপরতা কতটা শক্তিশালী হতে পারে, সেসম্পর্কে ধারণা পোক্ত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা বন্ধুত্ব তৈরি করা, অবসর সময় কাটানো কিংবা বিনোদনের জন্য এটা ব্যবহার করে থাকে বলে ধারণা প্রচলিত আছে। সামাজিক মাধ্যমের দুর্নাম বেড়ে যায় পরস্পর আক্রমণ কিংবা অ্যাবিউজ অথবা বহুসম্পর্ক নির্মাণ কিংবা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নির্মাণের মৃগয়াক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হবার কারণে। কিন্তু এর শক্তি ও সৌন্দর্যের দিকটি যেন উপেক্ষিত হয়েই ছিল। পরস্পরের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক অগ্রগতির জন্য কার্যকরভাবে যে কাজ করা সম্ভব, তা যেন প্রকৃত সমাজের কাছে অজানাই ছিল।

তথ্যপ্রবাহের ইতিহাসে এই প্রথম দ্বিমুখী তথ্যপ্রবাহ দেখছি আমরা। আর সম্ভবত এই প্রথম মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পাওয়া গিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম হলো ইন্টারনেটনির্ভর এক ধরনের মাধ্যম, যা ওয়েব টুর আদর্শ ও প্রাযুক্তিক ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ব্যবহারকারীদের আধেয় তৈরীতে ও তা বিনিময় করতে সহায়তা করে। এখন ওয়েব টু হলো, প্রযুক্তির এমন একটি প্রজন্ম যেখানে ব্যবহারকারীরা আরেকজনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করবে, আলোচনা করবে এবং তর্ক-বিতর্ক চলমান রাখবে। সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রেরক ও গ্রহীতার সম্পর্ক পাল্টে গেছে। এখন গ্রহীতাও প্রেরকের মতো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন। একজন প্রেরক যখন কোনো কথা বলছেন তখন গ্রাহক তার সম্পর্কে কোনো উত্তর দিচ্ছেন বা মন্তব্য করছেন তখন তার অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে গ্রহীতার অবস্থানে চলে যাচ্ছে। আদি প্রেরক আবার গ্রহীতার জায়গায় চলে যাচ্ছেন। অর্থাৎ এক ধরনের মিথস্ক্রিয়া চলছে এবং তা চলছে বলেই সর্ম্পক তৈরী হচ্ছে বা সম্পর্ক রক্ষা পাচ্ছে, আলোচনা-তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে জনপরিসর তৈরী হচ্ছে। জার্মান দার্শনিক যুর্গেন হ্যাবারমাস জনপরিসরের ধারণাটি দেন। জনপরিসর হলো সামাজিক জীবনের এমন একটি এলাকা যেখানে মানুষ মুক্তভাবে সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবে এবং আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ একত্রিত মানুষেরা সমাজের কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবে এবং তার সমাধানে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করবে। হ্যাবারমাস আশা করেছিলেন একটি আধুনিক বুর্জোয়া সমাজে মিডিয়ার মাধ্যমে জনপরিসর গঠিত হবে এবং সেখানে এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা সম্ভব হবে। কিন্তু মূলধারার মিডিয়া নানান সীমাবদ্ধতার কারণে সেই জনপরিসরটি তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু অনলাইনে মানুষ এক জায়গায় মিথস্ক্রিয়া করছে, আলোচনা করছে এবং সমাধানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রকৃত সমাজের লোকজন হয়তো জানেন না যে, সাইবারপরিসরের অ্যাক্টিভিস্টরা বরাবরই সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক কিংবা আন্তর্জাতিক সকল ইস্যুতেই সাড়া দিয়া থাকেন, পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করে থাকেন। ২০০৮-এর সাধারণ নির্বাচন, বিডিআর ট্র্যাজেডি, বিমানবন্দরের সম্মুখে বাউলমূর্তি অপসারণ, আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণ, রূপগঞ্জে সেনাবাহিনীর হাউজিং প্রকল্প, রামুতে সা¤প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড, সীমান্ত হত্যা ইত্যাদি নানান ইস্যুতে ব্লগ কমিউনিটি, ফেসবুক, কিংবা স্যাটায়ার সাইটগুলোতে ব্লগাররা প্রতিবাদ জানিয়ে থাকেন, কখনোবা অনলাইন হতে নেমে এসে প্রকৃত সমাজে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এসংক্রান্ত ছোট ছোট নিদর্শন হাজির করা সম্ভব।

বলা দরকার, সর্বস্তরের ব্লগারদের মধ্যে যে বিষয়ে সবচাইতে বেশি ঐক্য, তা হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি, পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিরোধিতা। এই ব্লগাররা বয়সে তরুণ, এরা বিশ্বায়ন-উত্তর কালে ভোক্তাসংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়ে উঠেছেন। এই তরুণ প্রজন্মের নানান বিষয়ে নিরাসক্তি আছে, অথচ ভোগে আসক্তি রয়েছে; এরপরও বলা যায়, পুঁজিতান্ত্রিক আচ্ছন্নতার মধ্যে থেকেও এরা মৌলবাদ ও পশ্চাৎপদতাকে অপছন্দ করে থাকেন। তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার মূল ভিত্তি তাই যারা মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের অতি রক্ষণশীল রাজনীতির প্রতি ঘৃণা। নারীদের দিক থেকেও এই বিবেচনার বাড়তি মাত্রা রয়েছে, কারণ রক্ষণশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্যতম শিকার হয় নারীরা। এই আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতোই।

বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় কী রায় আসছে তা তরুণ প্রজন্মের ব্লগাররা ভালোমতো লক্ষ রাখছিল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দেয়া প্রথম রায়টি মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় আসামী কাদের মোল্লা অধিক অপরাধে অভিযুক্ত হবার পরও, তাকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন। এটা মানুষের প্রত্যাশার বাইরে গিয়াছে। তাই ব্লগাররা ফুঁসে উঠেছেন। আরব বসন্ত কিংবা অকুপাই আন্দোলনের মতোই শাহবাগের ঘটনা এও প্রমাণ করেছে যে সামাজিক মাধ্যম পরিবর্তন-প্রতিরোধের জন্য কীরকম কার্যকর একটি মাধ্যম। তাই এই দফায় আন্দোলন কেবল ভার্চুয়াল জগতে নয়, প্রকৃত জগতের প্রজন্ম চত্বরে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে ছেড়েছে। আর ফেসবুকের আন্দোলন পূর্ববৎ চলছেই।

১১.০২.২০১৩

প্রথম প্রকাশ: সমকাল, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভার্টিগো আর এ যুগের জেন্টস কাদম্বিনী

লিখেছেন জুন, ১০ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ৯:১৩



গুরুত্বপুর্ন একটি নথিতে আমাদের দুজনারই নাম ধাম সব ভুল। তাদের কাছে আমাদের জাতীয় পরিচয় পত্র ,পাসপোর্ট এর ফটোকপি, দলিল দস্তাবেজ থাকার পরও এই মারাত্মক ভুল কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিমনি মা হয়েছে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১০ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১০:২৩



আজ পরিমনি একটা ফুটফুটে পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছে । বি ডি ২৪ এই খবর ছাপিয়েছে ।
করোনার সময়ে একটি ক্লাবে পরিমনি বনাম ক্লাব মেম্বারদের ঝগড়া ঝাটির সময়ে আমি পরিমনিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৈফিয়ত

লিখেছেন জটিল ভাই, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১:০০


(ছবি নেট হতে)

আউযুবিল্লাহিমিনাশশাইত্বোয়ানিররাজিম।
বিসমিল্লাহিররাহমানিররাহিম।
আসসালামুআলাইকুম।

উপরের মত করে সূচনা যাদের নিকটে বিরক্তিকর মনে হয়, তাদের নিকট ক্ষমা প্রার্থণা করে বলছি,

এভাবে শুরু করার ফলে আমার বিভিন্ন সুবিধা হয়ে থাকে। যেমন ঐ অংশটা লিখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবনঃ কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।

লিখেছেন জাদিদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১:১৪

১।
মেয়েকে রুমে একা রেখে বাথরুমে গিয়েছিলাম। দুই মিনিট পরে বের হতে গিয়ে দেখি দরজা বাইরে থেকে লক। পিলে চমকে উঠে খেয়াল করলাম পকেটে তো মোবাইলও নাই। আমি গেট নক... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোটিপতি এবং বাংলাদেশীদের সুইস ব্যাংকের হিসাব।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ বিকাল ৩:১৮



স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল ৫ জন। ১৯৭৫ সালে তা ৪৭ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৯৮টি। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি, ১৯৯৬... ...বাকিটুকু পড়ুন

×