সময়টা ২০০৭ সালের মাঝামাঝি . দেশে বসে বিদেশে পড়তে আসার পায়তারা করছি. সুযোগ মত বড় ভাইদের কাছ থেকে পরামর্শও নিচ্ছি. Texas অস্টিন এ পড়তে আসা BUET এর এক বড় ভাই কে একদিন skype তে পেলাম. অভ্যাসমত জিগ্যেস করতে শুরু করলাম কেমন যাচ্ছে সব? কি নিয়ে কাজ করছেন? আরো সব হাবিজাবি. বলে রাখা ভালো সেই বড় ভাই দেশে থাকতে BUET এ বরাবরই চার (GPA 4) মারতেন, Sunrise Coaching সেন্টার এ উনাকে দেখতাম ক্লাস নেয়ার ফাঁকে উনার লেভেল ফাইনাল পরীক্ষার পড়া শেষ করতে...result দিলে উনাকে ঘিরে উনার বন্ধুরা বিদ্রোহ করতো, আমরা অবাক হয়ে জানতে চাইলে উত্তর পেতাম আবারও চার মেরেছেন ..তেমন কোনো সিরিয়াস পড়ালেখা না করেও এত ভালো result ওই ভাই কে দিয়েই সম্ভব ছিল..হয়ত আরো অনেককে দিয়েই সম্ভব..যাক আসল কথায় আসি- সেই চার মারা ভাইয়ের মন খারাপ. জিগ্যেস করলে বললেন একটা গ্রুপ প্রজেক্ট এর কাজ অনেক কষ্ট করে শেষ করেছেন, বেশ অনেকখানি সময় দিয়েই করেছেন, এরপর ভালো presentation ও দিয়েছেন, সব শেষে চার ও মেরেছেন.......তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ...কিছুক্ষণ পর বললেন গ্রুপ এর অন্য দুই সদস্য ছিল ভারতীয়, presentation এর দিন প্রফেসর এর কাছে তারা presentation দিয়ে পুরো আইডিয়া আর কাজের শতভাগ কৃতিত্ব দাবি করলো, যেখানে পুরো আইডিয়া, কাজ এমনকি presentation এর slide গুলো ও বাংলাদেশী ওই ভাই এর করা....বেপারটা খুব সাধারণ মনে হত, যদি না ওই ভাইকে আগে থেকে চিনতাম. কখনই পড়ালেখার এইসব বেপার নিয়ে উনাকে সিরিয়াস হতে দেখিনি, নিজের result অথবা কাজের বাহবা নিতে কিংবা সবাইকে বলে বেড়ানো আমাদের মত সাধারণ পাবলিক ও উনি নন...কিনতু কতটা হতাশ হলে উনার মত মানুষ ও সহ্যের সীমা অতিক্রম করে আফসোস করতে পারেন? ভারতীয়দের অন্যের কাজের বাহবা নেয়ার অথবা নিজেদের সামান্য কিছুকে অসামান্য করার ঘটনা মনে হয় এই ব্যক্তি জীবনেই সীমাবদ্ধ নয় , আরো কিছু নমুনা তুলে ধরলাম-
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এবং স্বাধীনতার কৃতিত্ব ভারতীয়রা বরাবরই করে থাকে, কিনতু এখনকার প্রজন্মও যে এইভাবে দাবি করে তা কোনো ভারতীয়দের সাথে খোলাখুলি কথা বললেই বুঝা যাবে. ওদের ধারণা বাংলাদেশ হলো ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয় পক্ষের জয়...আফসোস প্রবাস জীবনেও ওদের এই মিথ্যা দাবির প্রতিবাদ করে যেতে হয়. UVA তে এনামুল/নির্জন ভাইরাও এমন ঘটনার সাক্ষী.
কিছুদিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ এর পক্ষে MDG সম্মাননা গ্রহণ করেন আর এই নিয়ে ভারতীয় এক সাংবাদিকের এক লেখা চোখে পড়ে. বাংলাদেশ এর অনেক প্রশংসা করে উনি তুলে ধরেন পাকিস্তান এর সাবেক এক অংশ কিভাবে নিজেদের উন্নতির পথে পরিচালিত করছে, বেশ কিছু উদাহরণ দিয়ে বুঝালেন আমাদের অগ্রগতির কথা, মাঝখান দিয়ে সুযোগ মত ঠিকই ঢুকিয়ে দিলেন ইন্ডিয়া কিভাবে এই অগ্রগতির সাথে জড়িত, খুব সুক্ষ ভাবেই নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করলেন.........আমরা অনেকেই কিছুই বুঝলাম না...হয়ত বুঝেও বুঝিনি...
Commonwealth Games হচ্ছে ভারতে. পত্রিকা/ইন্টারনেট পড়লে যে কেউ দেখবে ব্রিজ ভেঙ্গে পড়া, Games পল্লীতে ময়লা পানি/ মশা, Games পল্লী শেষ না করা, বড় বড় তারকাদের Games বর্জন করা......আরো বিশাল অবেবস্থাপনা. কিনতু খেয়াল করেছেন কি আন্তর্জাতিকভাবে এইসব নিয়ে খুব কমই লেখা হচ্ছে? ভারতীয় মিডিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী, তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী ওদের দেশপ্রেম আর কুটনৈতিক জোর. তা না হলে যে Games এর উদ্বোধন করার কথা রানীর দূত হিসেবে প্রিন্স Charles এর, সেখানে প্রচলিত প্রথা উপেক্ষা করে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি এবং প্রিন্স Charles একসাথে Games এর উদ্বোধন করেন, এত বড় দেশের Games আয়োজনের ব্যর্থতা তাই আমরা মিডিয়ার কল্যাণে খুঁজে পাইনা.. .....সত্যি এটা ওদের কে দিয়েই সম্ভব.
দেশে গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে. Discovery Channel এ Extreme Engineering আর National Geographic এ Mega Structure series গুলো অনেকদিন পর আগ্রহ নিয়ে দেখতে বসি. অবাক হই. মিডিয়া জুড়ে কেবল ভারতীয় বিভিন্ন প্রজেক্ট এর কাজ দেখানো হচ্ছে. কিনতু প্রজেক্ট গুলো তেমন আহামরি কিছু না, সাদামাটা কিছু প্রজেক্ট এর কাজ. Channel এর প্রচারের কল্যাণে তা আজ বিশাল কিছু. আমাদের দেশের বঙ্গবন্ধু সেতুও ঐসব প্রজেক্ট এর থেকে বড় মাপের কোনো কিছু......ওদের আছে মিডিয়ার জোর, তাই ওরা ওদের কাজ দেখাবে তাতে আমি/ আমরা কোন ছার?
সালমান খান এর খান একাডেমি আজ বিশ্ববিখ্যাত. শুনলাম সালমান খান কে নিয়ে পাকিস্তানিরা ওদের দেশের নাগরিক বলে দাবি করেছে, পরে সত্যি কাহিনী জানা যায়- এই বিশ্ব নায়ক এর পৈত্রিক জন্মস্থান বাংলাদেশ এর বরিশাল এ.
জন্মগতভাবে আমরা বাংলাদেশীরা মনে হয় একটু বেশিই বিনয়ী. আমরা আমাদের অসামান্য কাজের প্রচার করি না, সামান্য কাজ তো আর নাই ধরলাম. আমরা ভাবি কি হবে এইসব প্রচার-প্রচারনার. যার জানার সে এমনিতেই জানবে, আর না জানলেও কিছু যায় আসে না. আমার মনে হয় অনেক কিছুই যায় আসে. কি দরকার এত বিনয়ী হবার? এত ভালো মানুষ হবার কি দরকার? আমি কাউকে খারাপ হতে বলছিনা. অযথা নিজে যা না অথবা যে কাজের কৃতিত্ব নিজের না তা দাবি করতেও বলছিনা. শুধু বলছি নিরবতা ভাঙুন. আমাদের বাংলাদেশীদের কৃতিত্ব যেন অন্য কেউ দাবি করে না বসে- অন্যদের ও জানান আপনি ভালো কি কাজ করছেন, আপনার দেশকে এবং আপনাকে তুলে ধরুন বর্তমান এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশীদের কাছে. অনেকেই এসব থেকে অনুপ্রানিত হবে, হতাশার মাঝ থেকে অনেকেই জেগে উঠবে, আর কিছু না হোক নিজের দেশের এক মানুষের কাজ নিয়ে অন্য দেশের কেউতো বাহবা নিবে না!! এই লেখায় জাতিগত কোনো বিভেদ এর কথা তুলে ধরা হয়নি - তুলে ধরা হয়েছে আমাদের নিরবতা ভেঙ্গে জেগে উঠে আসার কথা.....প্রবাসে এসে আমরা অনেকেই হয়ত একসময় নিজের কাজের মাঝে হারিয়ে যাব, বিখ্যাত হয়ে দেশকে নিয়ে আর হইচই করবনা. প্রবাসীদের কাছে আমাদের দেশের হাজার সমস্যা বলে দেশকে হেয় করব. একটু ভেবে দেখুন, আমরা কি কখনো দেশের ভালো কথা প্রচার করি!! আর যে কয়েকজন করে তাদের কথাও কি তেমন ভাবে প্রচার পায়?? সবসময়ই আমরা বলে বেড়াই আমাদের দেশকে নিয়ে আশা করে কিছু নেই, কি হবে দেশকে নিয়ে এত ভেবে? ...শেষ অনুরোধ - দেশকে নিয়ে ভালো কিছু বলতে না পারলে, কিছু করতে না পারলে দেশকে নিয়ে বদনাম করা অন্তত বন্ধ করুন. জ্ঞান-পাপীদের কাতারে নিজেকে নিয়ে যাবেন না আশা করি.
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ৮:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


