somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কেন কাঁদবেন, কেন কাঁদবেন না!

১১ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৫:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



যারা অল্পতেই কষ্ট পায় তাদের জন্যও কিছু বলতেন -

উপরের এই অনুরোধেই এবারের লেখাটা লিখার পরিকল্পনা ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। যারা অল্পতেই কাঁদে – তারা আসলে মানুষ হিসেবে কেমন? খুব অভিমানী, রাগী, জেদি, নাকি কাদামাটির মত নরম? তার আগে হয়তো আমিই প্রশ্ন করে বসতে পারি, আপনারা যারা অল্পতেই কেঁদে ফেলেন – তারা আসলে অল্পতেই কাঁদেনই বা কেন? কারো কারো উত্তর, জানিনা! কেউ বলে, মন যে মানে না! যদি ভুল না বলি, তাহলে হয়তো একথা ঠিক যে, মানুষের কান্নাই হল তার শেষ মানসিক আশ্রয়স্থল! ধরুণ, আমার বা আপনার মনের জগতে সিডর হয়ে গেছে, দুঃখটা শুধু আপনি বা আমিই পরিমাপ করতে পারবো কিন্তু পৃথিবীতে আপনার সবচাইতে কাছের মানুষটিও যদি তার ক্ষতটা উপলব্ধি না করতে পারে তাহলে হয়তো আমি বা আপনি শেষ অবলম্বন হিসেবে বেছে নিব একটি নির্জন স্থান ও কিছু সময়ের অদ্ভুত মায়াবী মায়াবী নিঃসঙ্গ কান্না। অথবা সবচাইতে কাছের মানুষটির কাছেও মনের জগতের এই মহাপ্রলয়ের দৃশ্যটি পুঙ্খানুপুঙ্খ দৃশ্যায়িত করার জন্য একটি অসাধারণ চোখভেজা কান্নার প্রয়োজন। কাঁদলে দুঃখ কমে যায় কথাটা ঠিক কিন্তু তা কতদিন? কেউ কেউ তো কাঁদে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্তই। তাহলে? তার দুঃখ কমেই বা কতটুকু? না, বরং কথাটা মনে হয় এরকম হবে, কাঁদলে দুঃখ-ব্যথা খানিকটা আবছা আবছা হয়ে যায় কিছুটা সময়ের জন্য! কান্না মানুষের দুঃখ প্রকাশ করে বাহিরে বাহিরে, কিন্তু ভেতরটা তার তুলনায় কতটা বেশী বিপর্যস্ত তা কান্নারত ব্যক্তি আর সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, তবে অনুমান করা যেতে পারে হয়তো খানিকটা।

কিন্তু আমার প্রসঙ্গ সেই কান্না নয়; যে কান্না খুব সামান্য কারণেই চোখের কোণে ভিড় করে- সেই কান্না। যারা মনে মনে খুব নরম কিন্তু মুখে মুখে খুব সরব-তারাই একটুতেই কেঁদে ফেলে, টুক করে কেঁদে ফেলে অথবা প্রিয় মানুষটিকে জড়িয়ে ধরে তার বুকের মধ্যে চোখের জল ছেড়ে দেয় অবারিতভাবে! গত বছর একটা চাকুরির ভাইভাতে গিয়ে দেখি মাস্টার্স পাশ করা একটা ছেলে ভাইভা দিতে এসেছে। সাথে তার বাবাও এসেছে। খুব একটা অবাক হওয়ার মত বিষয় নয়। কিন্তু অবাক হয়েছি এই দেখে, বাবার হাতে রুমাল, পানির বোতল, কিছু বই ও ছেলের ব্যাগ। বাবা তাকে বাসা থেকে বানিয়ে নিয়ে আসা নুডুল্‌স নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছেন, বোতল এগিয়ে দিয়ে বলছেন, আরেকটু পানি খেয়ে নে বাবা! রুমাল দিয়ে বারবার ছেলের কপাল থেকে ঘাম মুছে দিচ্ছেন! কী বলবেন? হয়তো তার বাবা তার সাথে না আসলে সে ওয়াশরুমে গিয়ে বেসিন ছেড়ে একবার কাঁদত আবার ভাইভা থেকে বেরিয়ে এসে আরেকবার সেখানে গিয়ে কাঁদত! অথবা ভাইভা বোর্ডে গিয়েই কেঁদে ফেলত! আর সে যদি ছেলে না হয়ে মেয়ে হত তাহলে? আমি শুধু ভাবলাম, চাকরি পাওয়ার পরে তার বাবাও কি তার সাথে প্রতিদিন অফিসে গিয়ে........ নাহ্‌, আর ভাবতেই পারলাম না! আপনার হয়তো হাসছেন, এমনও ছেলে মানুষ আছে নাকি?হ্যা, শুধু ডিজিটাল মোবাইলের অভাবে সেদিন আমি তাদের ছবি নিতে পারিনি। যাই হোক, আমি বলতে চাইছি এই মাস্টার্স পাশ দেয়া ছেলে যদি তার বাবা মাকে একটু সময়ের জন্যও না পায়, তাহলে? হয়তো হাউমাউ করে কাঁদতে থাকবে, কারণ সে বড়ই হয়েছে কাদামাটি হয়ে, এখনও সেরকমই আছে। অথচ তার বাবা মাও একসময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, সেও তখন অভ্যস্ত হয়ে যাবে একা হয়ে যাওয়া একটা জগতের সাথে, সেও একদিন ওর মত একটা ছেলের বাবা হবে!

যারা হয়তো অভিমানী তারাও এরকম! কিছু একটার গরমিল হলেই গালদুটো আপনা আপনি ফুলে যায় তাদের, মনের কোণে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করে। আর কাছের মানুষগুলো তাদের সে অভিমানগুলো ভাঙ্গাতে গেলেই সেই মেঘ গলে দু চোখের কোণ বেয়ে অঝোরে বৃষ্টি ঝরে। এই বৃষ্টি ঝরার পরে যে ভালোলাগার অনুভূতি হয় তা মনে হয় পৃথিবীর অন্যরকম একটা অনুভূতি যার স্বাদ নিজেই শুধু উপলব্ধি করা যায় অন্য কাউকে উপলব্ধি করানো যায় না।

একটা উদাহরণ দিলে খানিকটা বোঝাতে পারব বলে মনে হচ্ছে। গল্পটি স্টিফেন আর. কভেই তার ‘সেভেন হাবিট্‌স অফ হাইলি ইফেক্টিভ পিপল’ বইয়ে দিয়েছেন এবং সেটি তার নিজেরই গল্প! উনি বলছেন, “একদিন আমি আমার দু ছেলেকে নিয়ে বাইরে বিনোদনের উদ্দেশ্যে বের হই। ছোট ছেলে সিয়ানের বয়স চার এবং বড়ছেলে স্টিপেনের ছয়। তো সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে দেখতে সিয়ান ঘুমিয়ে পড়ে। এদিকে আমি ও স্টিপেন দুজনেই জেগে জেগে মুভিটি শেষ করি। বের হয়ে আসার সময় আমি সিয়ানকে কোলে তুলে নিই এবং কোলে করে নিয়ে এসেই গাড়ির পেছনের সিটে আলতো করে ঘুমিয়ে দিই। তখন রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ছিল বিধায় আমার গায়ের কোটটা খুলে সিয়ানের গায়ে জড়ায়ে দিই। বাসায় পৌছার পরে সিয়ানকে ঘুমিয়ে দিয়ে আবার স্টিপেনের ঘরে যাই ওর সাথে কথা বলতে। আমি ওর পাশে বসে বলি,
- স্টিপেন, মুভিটা কেমন লাগলো, বাবা?
- ভালো।
- তুমি মজা পেয়েছ, বাবা?
- হ্যা।
- কোন দৃশ্যটা বেশী ভালো লেগেছে তোমার।
- আমি জানিনা, বাবা। সম্ভবত ‘ট্রাম্ফোলাইন’ হবে।
- খুব দারুণ একটা সিনেমা না এটা, স্টিপেন?
- হুম, বাবা।
একটা সময় আমি খেয়াল করলাম আমাদের কথাবার্তায় স্টিপেন এক কথায় তার উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। যেন সে বেশী কথা বলতে চাচ্ছে না ইচ্ছে করেই। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম কেন জানি ও আমার কাছে খোলামেলা হতে চাচ্ছে না। যেন ও খুব তড়িঘড়ি ঘুমাতে চাচ্ছে শুধু আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই। হঠাৎ ও মুখটা আমার দিক থেকে আড়াল করে নিয়ে দেয়ালের দিকে তাকাল একটা আঁধার-করা চাহনি নিয়ে। আমার বুকের মধ্যে আচমকা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো, নিশ্চয় ওর কিছু একটা হয়েছে! আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- স্টিপেন, বাবা, কি হয়েছে? আমাকে বলবে একটু?
সে আমার দিকে তাকালো। এবার তার চোখ-ভরা জল টলমল করে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর তিরতির করে কাঁপছে ঠোট দুটো! কাঁপা ঠোট নিয়েই ও বলল,
- বাবা, আমাকেও যদি সিয়ানের মত খুব ঠাণ্ডা লাগতো, তুমি কি আমায় তোমার কোটটা দিয়ে ঐ রকম আদর করেই জড়ায়ে রাখতে?”
এবার দেখুন, মাত্র ছয় বছরের একটি বাচ্চা ছেলের অভিমান আর ঠোট ফুলিয়ে কান্নাটা দেখে কী বলবেন তার বাবা। কী বুঝলেন? যারা অনেক অনেক অভিমানী তারাও একটুতেই কাঁদেন, যদি তাদের অভিমান ভাঙ্গানোর মানুষটিকে কাছে পান! আপনি কাঁদবেন না কেন? যদি দুঃখটা হালকা বা পুরোটাই কেঁদেই লাঘব হয়, তখন অবশ্যই কাঁদুন, এবং সেটা মনভরেই!

শেষ করবো, আমার নিজেরই দেখা আরেকটি গল্প দিয়ে। কমলাপুর রেল স্টেশনের বাইরের দিকে দোতালার রেষ্টুরেন্টে উঠার সিড়িটায় সেদিন রাত দশটার দিকে আমি আর আমার কলিগ বসে ছিলাম। কারণ ট্রেন ছিল এগারোটায়। এই ফাঁকে ওখানে বসে ব্যস্ত রাস্তার মানুষদের নিয়ে, তাদের জীবন নিয়ে একধরণের সাহিত্যিক দৃশ্যগুলি দু চোখ দিয়ে দুজনই উপভোগ করছিলাম! মিনিট দশেক পরে দুটো টোকাই সিড়িটার নিচের দিকে শুয়ে পড়ল; সেই পৌষের শীতের রাতে, প্রায় অর্ধনগ্ন শরীর নিয়ে। ওদের বয়স হয়তো বড়জোর আট-দশের মত হবে। একটা অসম্ভব মুগ্ধ দৃষ্ট নিয়ে দেখলাম-ঘুমানোর দু-তিন মিনিটের মাথায় রাজ্যের বেঘোর ঘুমে ওরা হারিয়ে গেছে। হঠাৎ পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই স্টেশনের সিকিউরিটি গার্ডের অযাচিত আবির্ভাব সেখানে! এসেই গালি দেয়া শুরু করলো, উঠতে দেরি হওয়ায় দু-তিন ঘা লাঠির আঘাতও বসিয়ে দিল ওদের নিষ্পাপ কোমল শরীরে! লাফিয়ে উঠে খোড়াতে খোড়াতে ওরা চলে গেল ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ নিয়ে। লাঠির এত শক্ত আঘাতেও একটুও কাঁদল না। মনে মনে নিজেই উত্তর পেলাম, ওরা কাঁদবেই বা কেন? কেউ কি আছে ওদের, যে কান্না শুনেই পরম মমতায়, আদরে বুকে ঠাই দিবে ওদের? তাই ওদের মত কারো কারো কখনো কাঁদতেই নেই, ভুল করেও! এসব দেখে মনে হল, ওদের তুলনায় কত তুচ্ছ কারণেই না আমরা কাঁদি!
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৫:৫৬
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সাবধান!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৪



যারা প্রধানমন্ত্রীর হাতে মরা মাছ ধরিয়ে দিয়ে পানিতে ছাড়তে বলেন, তারা কেমন মানুষ!!!.....এটা কেমন তামাশা!!! স্লোগান দেওয়া বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আসার আগে মাছগুলো চেক করার কথা একবারও মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ সরকারের কাছে সোলার এনার্জি বিক্রি করা কতটা লাভজনক?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭



যারা আগামী ৬ মাসের মধ্যে বাড়ির ছাদে সোলার সিস্টেম ইন্সটল করবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটির জন্যে ১০.৫০ টাকা করে দিবে। রুফটপে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট বসিয়ে লাভ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্পর্ক ও আত্মহত্যা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭



কাউকে আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে বিয়ে করা অথবা আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে অথবা ব্ল্যাকমেইল করে গুরুতর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের মাধ্যমে কাউকে বিয়েতে বাধ্য করা। - বিশ্বের যে কোনো দেশের আইনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২ লাখ কর্মীর খবর ভুয়া - তবে ২৫ টা সাদা হাতি আসছে!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০২



স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া সেপ্টেম্বর মাস থেকে ধাপে ধাপে ২ লাখ কর্মী নেবে ।

আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ কর্মী নেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×