somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

Know Your Heroes, Part# 2: শহীদ মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ

২১ শে জুলাই, ২০১৬ বিকাল ৫:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



জন্মঃ
------

শহীদ মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ (শহীদ আজাদ নামে যিনি পরিচিত) এর জন্ম ১৯৪৬ সালের ১১ জুলাই ভারতের কানপুরে। আজাদের বাবা ইঞ্জিনিয়ার ইউনুস চৌধুরী তখন চাকুরিসূত্রে কানপুরে বসবাস করছিলেন। ঢাকার প্রথম সারির অভিজাত এবং ধনাঢ্য পরিবারের মধ্যে একটি ছিলো আজাদদের পরিবার। তার মায়ের নাম সাফিয়া বেগম। আজাদ ছিলেন ইউনুস এবং সাফিয়া দম্পতির একমাত্র সন্তান।

শিক্ষাজীবন ও বেড়ে ওঠাঃ
---------------------------------
আজাদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। স্কুল ও কলেজের গন্ডি পার হয়ে উচ্চশিক্ষার্থে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি তে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানকার ভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তাই তিনি এক পর্যায়ে তাঁর নিজ দেশ পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। এখান থেকেই পরবর্তীতে তিনি ১৯৭১ সালে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রী লাভ করেন। আজাদ যখন ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র তখন তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং তাঁর মা অভিমান করে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তখন থেকে আজাদ তাঁর মায়ের কাছেই বড় হোন।

মুক্তিযুদ্ধে যোগদানঃ
-------------------------------------
শহীদ আজাদ ক্র্যাক প্লাটুন এর একজন সদস্য হিসেবে ২ং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ক্র্যাক প্লাটুন ছিলো স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ঢাকা শহরে গেরিলা আক্রমণ পরিচালনাকারী একদল তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত দল। এই গেরিলা দলটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে "হিট এন্ড রান" পদ্ধতিতে অসংখ্য আক্রমণ পরিচালনা করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক ত্রাসের সঞ্চার করেন। আজাদ ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে সফল গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন, রাজারবাগ অপারেশন ইত্যাদি।

যেভাবে শহীদ হলেনঃ
---------------------------------
১৯৭১ সালের ৩০শে আগস্ট আজাদের বাড়িতে অভিযান চালায় পাকিস্তানী সেনারা। তাদের হাতে ধরা পড়েন এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের টর্চার সেলে অমানুষিক অত্যাচারের শিকার হন আজাদ। কিন্তু প্রবল অত্যাচারের মুখেও তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের পরিচয় ও অবস্থান পাকিস্তানীদের কাছে প্রকাশ করেননি। পাকিস্তানীদের নির্মম অত্যাচার সহ্য করে একসময় এই সূর্যসন্তান স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য শাহাদাত বরণ করেন। শহীদ আজাদের মৃত্যুর তারিখ নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয় নি।

পরিশিষ্ট ও আজাদের মায়ের গল্পঃ
-----------------------------------------
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শহীদ আজাদ ও তাঁর মায়ের অবদানের গল্প কিংবদন্তীতূল্য। গ্রেপ্তার হওয়ার পর রমনা থানায় আজাদ ও তাঁর মায়ের শেষ কথোপকথন সাহিত্যিক আনিসুল হকের বয়ান থেকে নিচে সরাসরি তুলে দেওয়া হলো -

"আজাদ বলে, মা কি করবো? এরা তো খুব মারে, স্বীকার করতে বলে। সবার নাম বলতে বলে।
'বাবা, তুমি কারো নাম বলনি তো!'
না, মা বলিনাই। কিন্তু ভয় লাগে, যদি আরো মারে, যদি বলে ফেলি।
'বাবারে, যখন মারবে তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য করো, কারো নাম যেন বলে দিও না।'
আচ্ছা। মা, ভাত খেতে ইচ্ছা করে। দুইদিন হয়ে গেলো ভাত খাই না। কালকে ভাত দিয়েছিলো, আমি ভাগ পাই নাই।
'আচ্ছা কালকে যখন আসবো, তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসবো।'
সেন্ট্রি এসে বলে, সময় শেষ, যান গা।
মা হাঁটতে হাঁটতে কান্না চেপে ঘরে ফিরে আসেন।"


মা ভাত নিয়ে এসে ছেলেকে আর পাননি। আর কোনোদিনও মায়ের বুকে ফিরে আসেনি মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আজাদ। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। ঠিক ৩০ আগস্টেই মারা যান তিনি। পুরো ১৪টি বছর ভাত মুখে তোলেননি। কেবল একবেলা রুটি খেয়ে থেকেছেন। কারণ তার একমাত্র ছেলে আজাদ ভাত চেয়েও খেতে পারেনি সেদিন। অপেক্ষা করেছেন ১৪টি বছর ছেলেকে ভাত খাওয়াবেন বলে। ১৪ বছর তিনি কোনো বিছানায় শোননি। মেঝেতে শুয়েছেন। শীত-গ্রীষ্ম কোনো সময়ই তিনি পাল্টাননি তার এই পাষাণশয্যা। কারণ তার ছেলে নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরিসংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে বিছানা পায়নি।

পরিশেষে, করাচিতে থাকা কালীন মাকে লেখা আজাদের একটা চিঠি নিচে তুলে ধরতে চাই।

মা,
কেমন আছো? আমি ভালোভাবেই পৌছেছি এবং ভালো আছি।
হরতাল বন্ধ হয়ে গেছে। রীতিমত ক্লাস চলছে। পরীক্ষা শীঘ্রই শুরু হবে, দোয়া কর। তোমার দোয়া ছাড়া কোন উপায় নাই। আমি নিজে কি ধরনের মানুষ, আমি নিজেই বুঝতে পারি না। আচ্ছা তুমি বলো তো সবদিক দিয়ে আমি কি ধরনের মানুষ? আমি তোমাকে আঘাত না দেওয়ার অনেক চেষ্টা করি। তুমি আমার মা বলে বলছি না; তোমার মত মা পাওয়া দুর্লভ। এই বিংশ শতাব্দীতে তোমার মতো মা যে আছে কেউ বিশ্বাসই করবে না। এগুলো আমি হৃদয় থেকে বলছি, তোমার কাছে ভালো ছেলে সাজবার জন্য নয়। যদি আমি পৃথিবীতে তোমার দোয়ায় বড় বা নামকরা হতে পারি, তবে পৃথিবীকে সবাইকে জানাবো তোমার জীবনি, তোমার কথা।
আমি ভালো পড়াশুনা করার চেষ্টা করছি।
এবং অনেক দোয়া দিয়ে চিঠির উত্তর দিও।

ইতি,
তোমার অবাধ্য ছেলে
আজাদ


রেফারেন্সঃ
--------------------
আনিসুল হক রচিত মা উপন্যাস এবং ইন্টারনেট
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০১৬ বিকাল ৫:৫২
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা এবং গর্জিয়াস প্রকাশনা উৎসব

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:১৭


পহেলা মে বিকেলে একটি আমন্ত্রণ ছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল বই প্রকাশনার। এই আয়োজনটি শুরু হয়েছিল বলা যায় এক বছর আগে। যখন একটি লেখা দেওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল। লেখাটি ছিল বিদেশের জীবনযাপনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪



কথা হচ্ছিলো একজন আর্ট সমঝদার মানুষের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, জীবিতবস্থায় আমাদের দেশে আর্টিস্টদের দাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের নামকরা অনেক চিত্র শিল্পী ছিলেন, যারা জীবিতবস্থায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০



আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×