somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি নাকফুল এবং তিনদিন তিনরাত্রির গল্প (৩য় পর্ব )

০৫ ই এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ১০:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২য় পর্ব: Click This Link

যা কিছু পরম পাওয়া , অপূর্ব সুন্দর তার স্থায়ীত্ব এত স্বল্প কেন ? ছাড়িয়ে নেয় হীরা নিজেকে । বসে পড়ে বিছানায় । বাদল কোন কথা বলে না , বাইরে তাকিয়ে থাকে , তারপরে ধীর পায়ে বেরিয়ে যায় ।
উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে হীরা , তারপরে বিছানায় প্রায় ঝাপিয়ে পড়ে , সজোরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে । বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারে ভেসে যায় তার অতীতের অপ্রাপ্তি , আকুলতায় ঘিরে থাকা দু:সময় । একসময় বুঝতে পারে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে । ঘড়িতে দেখে রাত দুটো বাজছে । আজ ঘুমুবে শান্তির ঘুম , স্বান্তনার ঘুম !
ওরা দুজন ছাত্রজীবন থেকে মুখচোরা , লাজুক স্বভাবের । খুব ইচ্ছা করে বলতে বাদলকে সে সব কথা যা অনেকবার বলতে চেয়ে বলা হয় নি । লজ্জাই করতে লাগল ভেবে , আর বলবে কিভাবে । মেইল করে দেয়া যায় । বড় করে লিখে দেবে ' আমি তোমাকে ভালবাসি বাদল ' ।
ল্যাপটপ টেনে নিয়ে বসল , দেখে বাদলের মেইল , সেতো কিছুক্ষন আগেও ছিল এখানে , কখন লিখেছে ? কি লিখেছে ? ভাবতে ভাবতে দেখে লেখা -- ' হীরা , তোমাকে আমি ভাল বেসেছিলাম , ভাল বাসি এবং ভালবাসবো । চিরকাল তুমি আমার , আমারই থাকবে অলিখিত কঠিন সত্য এই । আমার মত করে কেউ তোমাকে ভালবাসতে পারে আমি বিশ্বাস করি না । আমি তোমায় সবটুকু ছেড়ে তোমার সবটুকু পেয়েছি , তুমি আমার । '

হীরা কি করবে বুঝতে পারে না , বন্ধু আশিকের কথা মনে পড়ে তার । বলেছিল , বাদল তোমার ভাল লাগাকে সন্মান করে , সে তুমি একসময়ে ঠিক জানতে পারবে ।
অসম্ভব ভাল লাগা নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্নময় মায়াবী রাতকে তার
ভাল লাগার ভাল বাসার স্বাক্ষী করে ।
বাদল নিজের রুমে গিয়ে নিজেকে সংবরন করতে পারে না । কেন শিউলীকে নিয়ে তাকে সংসার করতে হচ্ছে ? কেন সালংকরা বধু হয়ে হীরা তার সংসারে এল না ! কেন এভাবে ছেড়ে থাকতে হচ্ছে হীরাকে --কার অপরাধে ! ভীষন অস্থিরতায় মনে পড়ে গেল আজ রাতেই তো সে হীরার কপালে তার ভালবাসার আদর সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছে , হীরা তার ; একান্তই তার ।
মেইল করতে বসে , লিখে ফেলে যা কিছু মনে এল । তারপর মনে হল আজ রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেবে , সারা রাত অনুভব করবে তার বুকের পূর্নতা । সে হাত রাখে বুকে , কিছুক্ষন আগে মুখ লুকিয়েছিল তার ভালবাসা সেখানে । ভরে আছে বুক ।
জানালার কাছে চেয়ার টেনে নিয়ে বসে , সে রাতে অ্যাশট্রে ভরে যায় ছাই দিয়ে ।
ভোরে অনেকক্ষন শাওয়ার ছেড়ে ফ্রেশ হয় । নিজেকে হালকা মনে হয় । কফি খেতে মন চায় । মনে পড়ে আজ চলে যাবে হীরা , প্রতিটা মূহুর্ত সে হীরার সাথে কাটাতে চায় । সাতটা বেজে গেছে । হীরার রুমে যেয়ে নক করতে ঘুম ভাঙ্গা চোখে দরজা খোলে হীরা । বলে , এতক্ষন ঘুমুলাম ! সকাল হয়ে গিয়েছে টেরই পাইনি ! সে তো কখনো সদ্যজাগ্রত হীরাকে দেখেনি , কেমন নিষ্পাপ , কমনীয়তা ওর চোখে মুখে ! কেন বিধাতা তার করে দিল না হীরাকে , কেন হীরার প্রতিটা ভোর বাদলের হল না ! বুক ভার হয় । সে পুরুষ মানুষ , তাকে সব্যসাচী হতে হয় ।
বাথরুমে ঢোকে হীরা বাদলকে বসিয়ে রেখে , বেরিয়ে আসে সদ্য ফোটা সতেজ গোলাপ ; পেয়াজ খোসা রঙ শাড়ি আর হালকা প্রসাধনে তাকে দেখে মনে মনে ভাবে বাদল -- এ ফুল তার হাত দিয়ে ফুটেছে ! টিপ পরেনি মনে করিয়ে দিল বাদল , টিপ পরতে গিয়ে হীরা কপালে জায়গা খুঁজে পায়না । খুঁজতে থাকে । বাদল বুঝতে পারে , টিপটা হাতে নিয়ে সে পরিয়ে দেয় আর বলে , গতরাতের সেটা কি আর ঢাকবে কিছুতে ? না তুমি পারবে কখনো ঢাকতে কোন আবরনে !
দুজনে বেরিয়ে পড়ে । নাস্তা সেরে নিয়ে অচেনা পথে হাটে এদিক ওদিক পাশাপাশি । ফুল দেখে ,পাতা দেখে , প্রজাপতি দেখে --সব নতুন মনে হয় । নতুন মনে হয় দিনের আলো , আকাশ শীতের বাতাস ; সব , সব কিছু । কেবল দুজন পুরোন তারা অনাদিকালের স্রোতে ভেসে আসা , চলছে নিরবধি ।
মার্কেটে গিয়ে লিস্ট বের করে দুজনে কেনা শুরু করে , ব্যাগ হয়ে যায় কয়েকটা । শেষে বাদল জুয়েলারী শপে ঢোকে ; নক্ষত্রের ডায়মন্ড নেকলেস দেখাতে বলে । বেশ সুন্দর একটা নেকলেস পছন্দ করে ,হীরাও সুন্দর বলে মত দেয় । বাদল যখন বলে এটা সে হীরার জন্য নিতে চাইছে , রাজী হতে পারে না সে । দামটা অত্যন্ত বেশী , সে কথা বলেনা , বাদলকে বুঝিয়ে বলে -- এটা তেমন পরা হবে না , হারিয়ে যাবার ভয়ও আছে । অনুরোধ করে এটা শিউলীর জন্য নিতে । হা হা করে হেসে ওঠে বাদল , বলে তুমি কি জান আমাদের বাড়ীর ত্রিসীমানায় হীরার প্রবেশ নিষিদ্ধ , এমন কি এ শব্দটাও অনুচ্চারিত থাকে । কারনটা তুমি বুঝে নাও । আমার অবশ্য লাভই হয় । আমি সমস্ত হীরা আমার করে যত্নে গুছিয়ে রাখি একান্তে । কোন ছোয়া পড়ে না , কারো ছায়া পড়ে না ।
বাদলের পীড়াপীড়িতে হীরা বলে ওকে নাকফুল কিনে দিতে । চমকে যয় সে , বলে নাকফুল নিয়ে তো অনেক রকম সংস্কার আছে । তুমি কেন চাইছো এটা আমার কাছে ? পরতে পারবে নাতো ! হীরা বলে , বেশ দিও না কিনে , ভেবেছিলাম পরবো না , রেখে দেব আমার কাছে । কখনো টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে বিক্রি করা যাবে , তুমি সংস্কারের বাহানা করে দেবে না তাই বল । তারপরে হাসতে থাকে বাচ্চা মেয়ের মত ।
সবচেয়ে দামী আর সুন্দর হীরার নাকফুলটা কিনে দেয় হীরাকে । বাদলের ইচ্ছে হচ্ছিল নক্ষত্রকে বলে বিশেষ একটা নাকফুল তৈরী করাতে শুধু হীরার জন্য ।
শার্টের দোকানে ঢুকে কাল শার্ট খোঁজে হীরা সাদা স্ট্রাইপ দেয়া বাদলের জন্য । কাল শার্ট কেন জানতে চাইলে হীরা বলে তাকে , সেই যে ছাত্র ছিলে ক্যাম্পাসে কলেজের মাঠে কাল শার্ট পরে একজন মানুষ পায়ের উপর পা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানছিলে -- সে ছিলে তুমি । আবার যুগ পার করে যখন দেখা দিয়েছিলে দেশে এসে সেদিনও পরেছিলে কাল শার্ট । তোমাকে ভাবলে কাল শার্ট পরাই তো চোখে ভাসে ।আর তোমাকে মানিয়ে যায় এমন যে মুগ্ধতা কেড়ে নেয় অবসর । তোমার কারনে কাল হয়ে যায় আমার প্রিয় রং ।
শার্ট কেনে , একটা ঘড়িও নেয় বাদলের জন্য , মজা করে । বলে , হাতঘড়িটা পরে থাকলে মনে হবে কে যেন তোমার হাত ধরে আছে শক্ত করে , সে আর কেউ নয় - আমি ।
রুমে ফেরে , খাবারের অর্ডার দেয় । বাদল বাইরে খেতে চেয়েছিল ; হীরা রাজী হয়নি । তার ইচ্ছা সে কাছে বসে খাওয়াবে বাদলকে । মেয়েদের কত রকমের অদ্ভুত ভাল লাগার বিষয় আছে অন্যে কি আর বোঝে ? কেমন উড়ু উড়ু হয়ে যায় হীরা , সূর ভাজে
" চঞ্চলা মন আনমনা হয় যেই তার ছোয়া লাগে ,
ভোরের আকাশে আলো দেখে পাখী যেন জাগে ....."
এটা ওটা গুছিয়ে নিতে থাকে । বাদলের ইচ্ছে করে গান শুনতে , সে কথা বলতে হীরা শুরু করে ,
" তুহি মেরি মান্দির , তুহি মেরি পূজা ,
তুহি দেবতা হো ,তুমহো দেবতা ...."

থামিয়ে দেয় বাদল , বলে অন্য গান গাও তা না হলে থাক , শোনাতে হবে না এ গান । উঠে আসে বাদলের চেয়ারের কাছে সে । বলে জান , তুমি দেবতা হয়ে আছো আমার জীবনে , কত
বার ভেবেছি মানুষ হও না কেন ; মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছি তোমায় কতদিন ,পাইনি । কেন বলতো ?
বাদল বলে , আমি মানুষ ছিলাম , আছি ; তবে এক দেবীর যোগ্য হতে সাধনা করে যাচ্ছি । তুমি মিথ্যাই দেবতা করে রেখেছো এক স্বার্থপর , আত্মকেন্দ্রিক , অপরিনামদর্শী মানুষকে ।

দু'জনেই চুপ - পিন পতন নীরবতা । খাওয়া এল ঘরে ; খেয়ে নিল দুজনে । হীরা এটা ওটা তুলে দেয় আর বলে নিজ হাতে কোনদিন রেঁধে খাওয়াতে পারবো কিনা জানিনা , কাছে বসে খাওয়ানোতে সুখ ।
সব গুছিয়ে নিল হীরা ; হঠাৎ কি মনে হতে তার মোবাইল স্ক্রীনে সেভ করে রাখা বাদলের তিনটা মেসেজ দেখাল , যা সে এতবছর ধরে রেখেছে আর প্রতিদিন একবার অন্তত দেখতে ভুলে না । অবাক হয় বাদল ! হিসেব মেলে না , কে কাকে বেশী ভাল বাসে !

চলবে ........

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৪:৫৮
১৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×