হিংস্র হত্যাকান্ড
অনেক দিন পর মনে পড়ল ১৯৯৫ সালে আগষ্ট/সেপ্টেম্বর এর এক ভয়ংকর রাতের কথা। ১৯৯৫ সালে দিনাজপুর শহর ছিলো উত্তাল আলোচিত ইয়াসমিন হত্যা নিয়ে। আর স্থানীয় লোকদের আধিপত্য এই সব নিয়ে দিনাজপুর হিংস্র হয়ে উঠছিলো। আমি ডিফ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ বর্ষের ছাত্র আর মাত্র কয়েকটি মাস ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে গ্রামের ছেলে গ্রামে অথবা ঢাকায় চলে যাবো। ১৯৭১ এর যুদ্ধ দেখিনাই শুনেছি যুদ্ধের সময় মাথার উপর দিয়ে অহরহ গুলি নাকি চলে গেছে। সেই বহাবহ ঘটনা শেষ তিনমাসে দেখতে হয়েছিলো । মনে হচ্ছিল আর মনে হয় দিনাজপুর পলিটেকনিকে পড়াশুনা করা হচ্ছে না, বেচেঁ থাকবো কিনা কে জানে। এক ভয়ংকর ভীতিতে সময় কাটছিলো। ভাবতাম বিগত এত দিনে বেশ টাকা খরচ হয়ে গেছে আমাকে কোর্স সমাপ্ত করতেই হবে।আমি গরীব ঘরের ছেলে সাধারণ এক মৃত্য শিক্ষকের ছেলে।
একদিন কলেজের গাড়ী থেকে নেমেই শুনলাম বাস শ্রমিকদের সাথে হাতাহাতি হয়েছে আর শ্রমিকরা আক্রমন করার জন্য ক্যাম্পাসে ঢুকবে। আমাদের প্রতিহত করার জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে হলো সারা দিন ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ট্যুরের কারনে আমাদের বিভাগের সবাই ক্লান্ত ছিলাম। ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব দিতো আমাদের শেষ বর্ষের ছাত্র মিলন বর্তমান জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক । তার নেতৃত্ব সাধারন ছাত্র এবং বহিরাগতদের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিলো। বন্ধুদের রক্ষা করার জন্য ওর সব ছেলে আমাদের দুই হোষ্টেলের ছেলেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করল। সন্ধা হয়ে আসছে রাস্তার উপড় থেকে রেললাইনের পাথরের টুকরো টোকায় ছেলেরা শ্রমিকের পক্ষের লোকজন হয়ে পাথর ছুরে মারছে। যাহোক সেই দিন দিনাজপুর পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের উত্তরের গেটে আমরা কয়েকজন প্রতিহত করার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। ইট, রড ছাড়া আমাদের প্রতিহত করার কোন কিছু ছিলোনা। প্রতিহত মানে কাউকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় করতে হবে এমন ইনটেনশন আমাদের নেই আমরা চাই শ্রমিকরা ইন্সটিটিউটের ভিতর যেন প্রবেশ না করে। এই ইন্সটিটিউটের সম্পদ আমাদের সম্পদ। হঠাত দেখি একজন সাদা গেঞ্জি গায়ে মস্তবড় একটা রাম দা নিয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। আমরা নিরস্ত্র তাই ভয়ে সবাই দৌড়ে ইন্সটিটিউটের আবাশিকের দিকে কোন রকমে একটি ঘরে আশ্রয় নিলাম। তারপর সেই বাড়ীর মেয়ে মানুষেরা দুরদুর করে বাসা থেকে বাহির করে দিলো। আবার গেটে এলাম এবার একটু একটু করে অন্ধকার হয়ে আসছিলো। রাস্তার উপড় থেকে পাথর গুলো মুহুত্তের মধ্যে আমার এক ক্লাসমেট আমজাতের দাঁত ভেঙ্গে দিয়ে গেল। আস্তে আস্তে আমরা এবং অনেকে পিছু হটতে লাগল। কে কোথায় গেলাম কেউ কারও খোজ নেওয়ার সময় পেলনা মনে হয় সমস্ত দেহটা মাঠির নীচে লুকিয়ে নিজেকে রক্ষা করি। আমি থাকতাম আমিনুল হলে সেই হল নিরাপদ মনে না হওয়ার কারনে এলাম আমার ক্লাসমেট এবং একই এলাকার ছেলে ওবায়দুরের রুমে । আমজাতকে নিয়ে সেই রুমেই বসে থাকলাম। কিছুক্ষনের মধ্যে শ্রমিকরা সবাই জোট বেধে ইন্সটিটিউটের ভিতরে ঢুকে পড়ল। ছেলেরা নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য ৪৪০ ভোল্ট এর লাইন কলেক্সবল গেটে লাগিয়ে রাখল। ওরা এসে হাত দিতে পারলনা। এর মাঝে আমার বর্ষের একটি নিরিহ এবং আমিনুল হলের আবাসিক ছাত্র জাহাঙ্গীর কে নজরুল ইসলাম হলের নীচে লুকানো অবস্থায় ইট দিয়ে থেঁতলিয়ে থেঁথলিয়ে মারল, কারও কোন দরদ লাগলনা। কেন জাহাঙ্গীরকে মারছে তার দোষ কি তা সৃষ্টিকর্থা ছাড়া কেউই জানতেননা।হায়রে ছাত্র, যে আর দুটি/তিন মাস পরে পড়া শুনা শেষ করে ঢাকা গাজীপুরে উজ্জতর ডিগ্রী নেওয়ার জন্য যাবে। অথচ্য জঙ্গী জাতীর মত সেই মানুষটিকে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলল মনে হলো এক উপজাতী শুকুর শিকার করছে তার জ্বিহবার স্বাদের জন্য কিন্তু মানুষ মানুষকে মেরে তাদের জ্বিহবার স্বাদ পেল? সেই বিষয়টি আমার আজও বোধগম্য নয়। এ এক বর্বরতা এবং নির্মম হত্যাকান্ড।
আমরা কাজী নজরুল ইসলাম হলের ছাদে ৪০-৫০ জন ছেলে ডু আর ডাইয়ের পজিশনে থাকলাম উপড় থেকে নীচে দেখছি অন্ধকারে কাউকে মারছে কোন প্রতিকার করার ছিলোনা। আমরা হতোবাক! আমার মনে হলো এরা শিকার করতে এসেছিলো আর একটি তাজা প্রান কেড়ে নিয়ে চলে গেল। আজও আমার মন কাদেঁ আমার সেই বন্ধু জাহাঙ্গীরের জন্য। জাহাঙ্গীর হোস্টেলে খুব কম থাকতো ক্লাস শেষ করে বাড়ী চলে যেত। একটি বাই সাইকেল ছিলো সেই সাইকেলেই যাতায়াত করত। কেন যে সেইদিন বাড়ী গেলনা তা অজানাই রইল। মৃত্যর পর পুলিশ,ছাত্র জনতা , সুধীসমাজ সবাই এলো কিন্তু জাহাঙ্গীর বাচঁতে পারলনা। আমি মর্মে মর্মে বুঝতে পারছিলাম। সবার উদ্দের্শ্যে একটাই কথা বলব আমরা গ্রাম বা দুর থেকে যারা লেখাপড়া করার জন্য এসেছি বা আসব এই আমরা কেন স্থানীয় মানুষের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবো। স্থানীয় মানুষেরা এমনিতে বহিরাগতদের ভালো চোখে দেখেনা। কেন আমরা বুঝিনা আমাদের সত্যিকারের মায়ের আচল দিয়ে রক্ষা করার কেউ নেই। আমাদের মা-বাবা-ভাই-বোন ছাড়া কেউই মনে রাখেনা। সবাইকে ছেড়ে বাহিরে থাকা যে কি কষ্টের এই অবস্থা সেই বোঝে।
যারা বাহিরে লেখাপড়া করেন তাদের ধর্য্য ধরে পড়ালেখা শেষ করার অনুরোধ করব। স্থানীয় মানুষদের থেকে দুরে সুস্থ্য থাকাই শ্রেয়। লেখক ঃ স্বপন/নিড ফাউন্ডেশন
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


