somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাঙ্গামাটি ভ্রমণ: রং রাঙে দোচুয়ানি

০৬ ই অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দ্বিতীয় পর্ব: রাঙ্গামাটি ভ্রমণ: পথের কথা
প্রথম পর্ব: রাঙ্গামাটি ভ্রমণ: পূর্বাপরকথা

১১.
ঢাকায় বসে হোটেল সুফিয়ার বেশ প্রশংসা শুনেছি, কিন্তু থাকতে গিয়ে দেখি খুব একটা আহামরি কিছু না। হোটেলের রুমে ঢুকে আমি যে কাজগুলো প্রথমেই করি, কমোডের ফ্ল্যাশ কাজ করে কিনা সেটা চেক করা তার মধ্যে একটি। এ বিষয়ে একটি করুণতম অভিজ্ঞতা হওয়ার পর থেকে এ সাবধানতা! এবং এখানেও যথারীতি ফ্ল্যাশ নষ্ট। হোটেল বয়কে ডেকে আনলাম- মিনিট দশেক চেষ্টার পর সে হাল ছেড়ে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে পাশের রুমে ট্রান্সফার করে দিলো আমাদের। বাঁচোয়া! না খেয়ে দিন কাটানো যায়, কমোডের ফ্ল্যাশ না টেনে থাকা যায় না!

দু'জনেই খুব ক্লান্ত। গোসল সেরে রুমেই নাস্তা করে দিলাম ঘুম। বিকেলে বেরুবো।

১২.
তিন পার্বত্য জেলায় আমার একটা প্রজেক্টের কাজ চলছে- যে কাজে আগের সপ্তাহেও একদিনের জন্য রাঙ্গামাটি এসেছিলাম। ওই প্রজেক্টেই রাঙ্গামাটির ছেলে অসীম চাকমা বেশ কিছুদিন ধরে যুক্ত আছেন- তিনি পালা করে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে কাজ করছেন। ঘুম থেকে উঠে তাঁকে ফোন দিলাম। আমাদের আসার খবর তিনি আগে থেকেই জানেন। জানালেন, বিকেলে তিনি এসে আমাদের নিয়ে বেরুবেন।

এর মধ্যে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসলাম। বিকেলের কাপ্তাই লেক সত্যিই অপূর্ব! ঘণ্টাখানেক পর অসীম দা এসেই জানতে চাইলেন, কোথায় যাবো? আগামী তিনদিন আমাদের কী কী করার প্ল্যান? যেহেতু রাঙ্গামাটি সম্পর্কে আমাদের খুব একটা ধারণা নেই আবার তিনি এই এলাকার মানুষ, তাই অসীম দাকেই অনুরোধ করলাম তিনদিনের একটা প্ল্যান করে দেওয়ার জন্য। সেটা এমনভাবে করতে হবে যেন মানুষের কাছে গপ্প করা যায় এমন কোনো জায়গা যাতে বাদ না পড়ে। এর বাড়তি কোনো আকর্ষণ থাকলে তো আরও ভালো! সে অনুযায়ী প্রথম দিনেই কেনাকাটা করার পালা ও অসীম দার সাথে এক জায়গায় যাওয়া। দ্বিতীয় দিন সুবলং, পেদা টিং টিং, টুক টুক ইকো ভিলেজ, কাপ্তাই লেকের নানা অংশ ভ্রমণ এবং রাতে অসীম দার বাসায় খাওয়াদাওয়া। তৃতীয় ও শেষ দিনে পর্যটন, ঝুলন্ত সেতু, রাজবাড়ি, রাজবনবিহার ও শহরের নানা এলাকা।

নাস্তা সেরে বেরুলাম। অনেকেই হয়তো জানেন না- রাঙ্গামাটি শহরে কোনো রিকশা নেই। বাংলাদেশে এটিই একমাত্র শহর যেখানে কোনো রিকশা চলাচল করে না। কারণ পুরো শহরটাই ছোট ছোট পাহাড়ের উপর অবস্থিত এবং উঁচুনিচু। স্বাভাবিককারণেই রিকশা চলার অনুপযোগী। চলাচলের মূল বাহন সেখানে অটোরিকশা। ভাড়াও নির্দিষ্ট করা- কোনো দরাদরি করতে হয় না, অটোরিকশা চালকের মুখে না শুনতে হয় না- যেগুলো ঢাকায় আমাদের নিত্যসঙ্গী। তবে শহরের বাইরে গেলে কিছুটা দরাদরি করতে হয়- তাও নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে বেশি কেউ নাকি ভাড়া চায় না, দরাদরি শুধু কমানোর! আহা! আমাদের ঢাকা শহরটা এদিক দিয়ে যদি রাঙ্গামাটি হতো!

পরে সময় পাই কি না পাই- কেনাকাটা সারার জন্য তবলছড়ি গেলাম। রাঙ্গামাটিতে কেনাকাটার জন্য তবলছড়ি এলাকাটা বিখ্যাত। আদিবাসিদের তৈরি কাপড়চোপড় বা অন্যান্য জিনিসপত্রের অধিকাংশ দোকানই সেখানে। আমরা সেখানে ঘুরে টুকটাক জিনিসপত্র কিনলাম, যার মধ্যে কয়েক প্যাকেট কাজুবাদামও রয়েছে।

কেনাকাটা করতে করতেই আমাদের দোচুয়ানি খাওয়ার শখ আর অসীম দার দোচুয়ানি খাওয়ানোর সখ ক্যামতে ক্যামতে এক হয়ে গেলো। সানন্দে ও সাড়ম্বরে ট্যাক্সি করে আমরা রওনা দিলাম, দোচুয়ানি খাওয়ার উদ্দেশ্যে- গন্তব্য বনরূপা বাজার।

১৩.
রাঙ্গামাটি শহরে অনেক জায়গাতেই দোচুয়ানি পাওয়া যায়। এমনকি হোটেলবয়কে বললেও নাকি এনে দেয়। পর্যটনে এসব খাওয়ার জন্য নাকি আলাদা বার পর্যন্ত আছে। হোটেল সুফিয়া কর্তৃপক্ষ অনুমতি চেয়েছিলো বার বসানোর, পায় নি। অসীম দা বললেন, আপনাদের ভিন্ন একটা জায়গায় নিয়ে যাবো, যেখানে বসে খেতে আপনাদের ভালো লাগবে।

বনরূপা বাজারের ঘাটে গিয়ে ছোট্ট নৌকা করে কাপ্তাই লেকের মধ্যে ছোট্ট একটা দ্বীপে পৌঁছলাম- নাম রং রাং। এখানে অসীম দার-ই এক বন্ধুর একটা রেস্টুরেন্ট কাম বার আছে- ছোট্ট কিন্তু সুন্দর। মূল রেস্টুরেন্ট ছাড়াও ছোট ছোট কটেজ আছে- সেখানে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে পানি-টানি-পানীয় সবই খেতে পারবেন। বেশ সুন্দর ব্যবস্থা! আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে বলে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ হয় নি, ছবি তোলারও কোনো চান্স পাই নি। আদিবাসী তরুণদের অনেকেই বিকেল থেকে ভিড় জমায় এখানে- আড্ডার সাথে পান করার উসিলায়। তাছাড়া দোচুয়ানির সাথে খাওয়ার জন্য আলাদা কিছু সুস্বাদু তরকারিও আদিবাসিদের কায়দায় রান্না করা হয় এই রেস্টুরেন্টে, যেগুলো নাকি রাঙ্গামাটিতে খুবই পপুলার। এর একটা হলো মুরগির মাংসের চচ্চড়ি, আরেকটা ঝাল ভেজিটেবল। এরকম আরও কয়েকটা আইটেম আছে। আমরা এই দুটোর অর্ডার দিলাম।

মুরগির মাংসের চচ্চড়িটার বিশেষত্ব হলো এটা রান্নার সময় তেল একেবারেই ব্যবহার করা হয় না। মুরগি টুকরো টুকরো করার পর সিদ্ধ করা হয়। সাথে বাঁটা কাঁচামরিচ ও আলাদা ভিজিয়ে রাখা কাঁচামরিচের পানি যোগ করা হয়। পাশাপাশি ধনে পাতা এবং এ ধরনের আর কী কী যেন দেওয়া হয়। খুবই ঝাল লাগে খেতে! ভেজিটেবলেরও একই অবস্থা। বরবটি সিদ্ধ করা হয় কাঁচকি মাছের সাথে। সেখানেও প্রচুর ঝাল! মজার ব্যাপার হলো- হোটেল ম্যানেজার জানালেন- যারা ঝাল খেতে পারে না, তারাও নাকি এই প্রচুর ঝালের তরকারি আগ্রহ নিয়ে খায়। আমি বলি- আগ্রহটা কি দোচুয়ানি পেটে পড়ার আগে আসে নাকি পরে? ম্যানেজার হাসেন।

আমাদের পক্ষ থেকে অসীম দা অর্ডার দিলেন। বোতলভরে নাচতে নাচতে দোচুয়ানি আসলেন! আহা! আমরা পান করতে ও খেতে শুরু করি। সাথে কিনে আনা কাজুবাদাম ছড়িয়ে দিই আরেকটা প্লেটে।

খেতে খেতে গল্প করি, কথা বলি, আড্ডা দিই। এরই মধ্যে মাথার মধ্যে ভূমিকম্প হয়।

১৪.
রাঙ্গামাটিতে প্রথম দিনটি কাটে মোটামুটি। দোচুয়ানি খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মোটামুটি টাল। আমি নিজে ঠিক থাকি, কিন্তু বাকি পৃথিবীটা দোলে। এ কী ঝামেলা! (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:০৩
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×