বাংলাদেশে ৪৫টিরও বেশি আদিম জনগোষ্ঠী রয়েছে। জীবন ও জীবিকার তাড়নায় এই আদিম জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে পছে দেশ ব্যাপী। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, সিলেট, বৃহত্তর ময়মনাসিংহ, পটুয়াখালি, বরগুনা, নবাবগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, হবিগঞ্জ প্রভৃতি জেলাগুলোতে প্রধানত এদের বাস। দু’-একটি গোত্র বাদ দিলে এই সমুদয় জনগোষ্ঠী প্রত্যেকে আলাদা ভাষা রয়েছে। রয়েছে অনেক লোকগাঁথা, রূপকথা, পালাগান; যা আমাদের লোকসাহিত্যকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে। অথচ এই ভাষা চর্চা বা সংরক্ষণ নিয়ে নেই কোন উদ্যোগ নেই। কালের আবর্তে এই আদিম ভাষাগুলো এখন বিলুপ্তির পথে
বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষার মধ্যে বহুল প্রচলিত হল চাকমা, খাসিয়া, গাঁরো, মনিপুর, মুন্ডা, সাঁওতাল, মগ, ওঁরাও ইত্যাদি। এছাড়া কাচ্চারি, কুকি, টিপরা, মাল পাহাড়ি, মিকির, সাদ্রি ও হাজং ভাষাও কম-বেশি প্রচলিত। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি মতে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে ৫লক্ষ এক হাজার একশ’ ১৪ জন আদিবাসী রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচ লাখেরও বেশি জনগোষ্ঠী চাকমা ভাষা ব্যবহার করে। আরাকান ভাষার অপভ্রাংশ হয়ে সৃষ্টি হওয়া মগ ভাষায় ভাষীর সংখ্যা দু’ লাখের বেশি লোক। প্রায় ২৫০ বছর পূর্বে প্রথম সুনামগঞ্জে মনিপুরি ভাষার প্রচলন হলেও বর্তমানে এই ভাষা পৌছে গেছে রাজধানীতেও। ঢাকার বিভিন্ন মনিপুর কলোনিতে প্রতি নিয়ত ব্যবহার করা হচ্ছে এই ভাষা। এছাড়া সুনাম গঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার মনিপুর রয়েছে, যাদের ভাষা মনিপুরি। সিলেটের পাহাড়ি বনাঞ্চলে বাস করা খাসিয়া আদিবাসীরা কথা বলে ওয়ার (ঙুধৎ) ভাষায়। এই একই এলাকায় বাস করা সিনটেং ও লালাং রা আবার তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার গারো পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলে বাস করে গারোরা। এছাড়া দেশের বাইরে ভারতের মেঘালয় প্রদেশেও গারোদের বসবাস রয়েছে। এই গারোরা কথা বলে গারো ভাষায় যাকে তারা ‘আচিক কাথা’ (অপযরশ কধঃধ) বলে অবিহিত করে। গাজীপুরের শ্রীপুর, রংপুর ও সুনামগঞ্জ জেলাতেও কিছু গারো ভাষাভাসি রয়েছেআদিবাসী ভাষাগুলোর মাঝে আরো একটি গুরুত্বপূর্ন ভাষা হল মুন্ডা। ১৫-২০ হাজার আদীবাসি মুন্ডা ভাষায় কথা বলে। সাওতাল ভাষায় কথা বলে ৫০ হাজারে বেশি মানুষ। মালপাহাড়ি ভাষায় ন’ হাজার, টিপরা ভাষায় কথা বলে প্রায় দু হাজার, ৫০ হাজার সাদ্রি ভাষায় কথা বলে।
রংপুর, সিলেট, রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, বগুড়া জেলায় এক লাখেরও বেশি ওরাও ভাষাভাসীরা বসবাস করে।
উৎপত্তিপত দিক থেকে চাকমা ভাষা বাংলা ভাষার নিকট আতœীয়। বাংলা ভাষার অনেক যতি চিহ্ন, ব্যকরণগত আইন ব্যবহার করা হয় চাকমা ভাষায়। এই মিল বাংলাদেওেশর অপরাপর আদিবাসী ভাষা গুলোর ক্ষেত্রেও সত্য। বুৎপত্তিগত সময় হিসের করলে বাংলা ভাষা থেকে আদিম ভাষা এসব আদিবাসী ভাষা। কিন্তু ভাষা গবেষণা, সংরক্ষণ ও লিখিত রূপের অভাবেএই ভাষাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি শিক্ষিত আদিবাসীরা তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বললেও লেখার সময় বাংলা বর্ণ ব্যবহার করে। যদিও চাকমা ও মগ ব্যতিত আর কারো ভাষার লিখিত রূপ নেই।।
ওপরে আলোচিত এসব ভাষার অনেকগুলো এখন হারিয়ে যাবার অপেক্ষায়। সরকারি ভাবে নেই কোন সংরক্ষণের উদ্যোগ। এখন অনেক আদিবাসী তাদের নিজেদের ভাষার চে’ বাংলা ভাষায় বেশি ব্যবহার করে। প্রথম দিকে বাঙ্গালীদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য বাংলাকে ব্যবহার করতো তারা আর নিজেদের মাঝে নিজেদের ভাষায়ই কথা বলত। কিন্তু এখন প্রায় সব সময়ই বাংলাতে কথা বলতে অব্যস্ত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে টিপরা, মনিপুরিরা বাংলাতেইবেশি কথা বলে। হাদি,পাটোর, কোচ্, রাজবংশী, বেদেরা বাংলায় বেশি কথা বলে। আবার বগদি ও বিন্দিস তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বললেও সেটা প্রায় বাংলার মতই।
আদিম ভাষা গুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে তাদের ভাষার মূল প্রান লোকগাঁথা। এসব ভাষার লোক কাহিনী অনেক উন্নত। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার তুলনায় এই লোক কাহিনীর ভাষার গাথুনি, চিন্তা বা সামাজিক দর্শণ তুলনামূলক আধুনিক। এসব লোক গাঁথার মাঝে স্থান পেয়েছে গান, কবিতা, পালাগান, রূপকথা ও তাদের পুরানো বীরগাাঁথা প্রভৃতি। মগ, চাকমা, খাসিয়া ও গারোদের অনেক বর্বনামূলক নাটকে সাথে ময়মনসিংহ গীতিকার মিল খুজে পাওয়া যায়। এটা অনেক স্বাভাবিক একটা প্রকৃয়া। কারণ হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের অনেক লোকগাঁথার সাথে বাংলাদেশে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


