somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ অপেক্ষার ঈদ...

২০ শে আগস্ট, ২০১২ রাত ১২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত বাজে আড়াইটার মত । একটু আগেই
ঘড়ি দেখেছেন মুহসীন সাহেব ।
গতকয়েকদিনে
তার ইনসমনিয়ার ধাতটা প্রবল হয়েছে ।
রমজানের শেষ সপ্তাহটায়
রাতগুলো খাটে শুয়ে এপাশ ওপাশ করেই
কেটে গেছে বলতে গেলে । একটা সময়
মসজিদ থেকে
মুয়াজ্জিন ডেকে ওঠেন সাহরীর জন্য ।
ঘুমানোর প্রচেষ্টার ইতি টানতে হয় তখন
। সাহরী খেতে ওঠা আর এই
সুযোগে স্রষ্টার দরবারেও ধরণা দেয়ার
সুযোগটা কাজে লাগানোর চেষ্টা থাকে তার
।আজকে অবশ্য সাহরী খাওয়ার
ঝামেলা নেই । সন্ধ্যাতেই শাওয়ালের চাদ
দেখা গেছে । কাল ঈদ ।
আর এজন্যেই তার অনিদ্রা আরো বেশী ।
একটা এড ফার্মের প্রমোশন অফিসারের
কাজ করেন মুহসীন সাহেব । পদটার নাম
অনেক বড়সড় হলেও বেতন আহামরি কিছু
নয় । নতুন কোন গ্রাহক
ধরে দিতে পারলে
কিংবা বড় কোন কাজ
পাইয়ে দিতে পারলে একটা ভালো কমিশনের
ব্যবস্থা অবশ্য
আছে কিন্তু এই প্রতিযোগিতার যুগে এ
সুযোগ পাওয়াটা সহজ সাধ্য নয় । তার
ব্যবহার অমায়িক হলেও তেলতেলে নয় ।
তাই কাউকে অন্যায় সুবিধা পাইয়ে দিয়ে
কাজ বাগিয়ে নেয়াটা তার স্বভাববিরুদ্ধ ।
আর তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই
নির্ভর করতে হয় বেতনটার ওপরেই ।
রাজধানী ঢাকায় এই আয়ে চলাটা যে কতটা
কষ্টসাধ্য সেটা সারা মাসেই বুঝতে পারেন
তিনি ।
মুহসীন সাহেবের দুই মেয়ে এক ছেলে ।
পরিবারে তার আম্মাও আছেন । মোট
৬জনের
সংসার । সন্তানেরা যথেষ্ট মেধাবী অথচ
আলাদা টিউটর রাখার সামর্থ্য তার নেই
। স্ত্রী সুফিয়া বেগম উচ্চ
শিক্ষিতা হওয়ায় অনেকটা রক্ষা । তিনিই
পড়া
দেখিয়ে দেন তাদের । আর অফিস
থেকে এসে সুযোগ থাকলে ওদের অংক
করিয়ে দেন
নিজেই । এতে হয়তো অর্থলোভী কিছু
শিক্ষক পরীক্ষায় কিছুটা কম নম্বরও
দেয়
ওদের কিন্তু এতে তারা মোটেও চিন্তিত
নন । তারা চান সন্তানেরা মানুষ, হোক
রেসের ঘোড়া নয় । স্রস্টাও তাদের
কে হতাশ করেন নি একেবারে প্রথম
দ্বিতীয়
হতে না পারলেও একেবারে ক্লাসের একদম
প্রথম সারিতেই থাকে ওরা ।
ছেলেমেয়েদের ছোটবেলা থেকেই ভাল মন্দ
ন্যায় অন্যায়ের তফাত্ বুঝতে
শিখিয়েছেন তারা ।
ওরা প্রয়োজনীয়তা আর শখের
পার্থক্যটা বোঝে ভালো ভাবেই ।
কখনো কিছু পেতে গোঁ ধরে বসে থাকে না ।
একটু বুঝিয়ে বললেই আর কখনো মুখ ফুটে
চাইবে না । বাবার
সীমাবদ্ধতাকে তারা অবজ্ঞা নয়
বরং শ্রদ্ধা করে ।
মেয়ে দুটো এসে সপ্তাহখানেক আগে ঈদ
উপলক্ষে একই রকম দুটো লাল জামার
জন্য
আবদার করলো ।
তিনি শোনার পর
ওদেরকে কাছে টেনে আদর করলেন আর
বাসার সবাইকে ডাকলেন । সবাই
এলে গুছিয়ে শান্তভাবে যা বললেন তার
সারসংক্ষেপ হলো এবারের ঈদে বাড়িতে
বড়চাচাদের কিছু টাকা পাঠাতে হবে । তাই
ঈদের কেনাকাটার জন্য তেমন কোন নেই
। তাই এবারের ঈদে কাউকেই কিছু
কিনে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না ।
তবে যদি সুযোগ
থাকে তবে আব্বু আগামী কোরবানীর
ঈদে নতুন পোশাক কিনে দেবেন । পরীর
মতো
ফুটফুটে মেয়ে দুটোর মুখগুলো কিছুটা মলিন
হলো তত্ক্ষণাত্ কিছুই বললো না
ওরা । কিছুক্ষণ পর বড়
মেয়েটা বললো "আব্বু ,যদি টাকার
বেশী সমস্যা
থাকে তাহলে কোরবানীর ঈদে না দিলেও
কিছু হবে না । আমরা তোমাকে অনেক
ভালোবাসি, জামা না কিনে দিলেও
ভালোবাসি ।" মুহসীন সাহেবের বুকটা হু হু
করে
উঠলো ।কিছু বলতে গিয়ে বলতে পারলেন
না তিনি । শুধু মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে
ধরে বসে রইলেন ।
এতো ভালো কেনো ওরা ? যখন দেশের
শপিংমল গুলোতে জমজমাট
কেনাবেচা চলছে অনেক
দামী দামী কাপড়ের । ধনিক শ্রেণীর
মানুষেরা কয়েক ডজন
পোশাক দিয়ে ঈদের সপিং করছে আর তখন
তাদের এই অবুঝ আবদারটুকুই
তিনি রাখতে
পারছেন না ?
কষ্টে হৃদয়টা যেনো টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিলো ।
একবার ভাবলেন বড়ভাইকে নাহয়
টাকাটা পরে দেয়া যাবে । কিন্তু
ভেবে দেখলেন
এমনিতে তিনিতো টাকা দিতেই পারতেন
না । ঈদের বোনাসটা হাতে পাওয়ায় ওটাই
তুলে দিচ্ছেন ওনাদের হাতে ।
তাছাড়া তিনি অসুস্থ ।অপারেশনের
টাকা জোগাড়
করতে না পারায়
অপারেশনটা হচ্ছে হচ্ছে করেও হচ্ছে না ।
তার ওপর আবার
গ্রামের লোকজন মনে করেন
ওনারা যেহেতু ঢাকায় থাকেন
তাহলে বোধহয় ওনাদের
অনেক টাকা । তাই গ্রামের অনেকেই
প্রায়ই অনেক আবদার নিয়ে আসেন ।
বাধ্য
হয়েই কিছু দিতে হয় । বিগত
একটা সপ্তাহ তার মাথায় এই দুশ্চিন্তা
গুলো ঘুরছে । নিয়মিত বিছানায়
মাথা এলিয়ে দিয়েই ঘুমানোর অভ্যাস
গিয়ে এখন
অনিদ্রাই তার সঙ্গী ।
হয়তো সকালবেলা তার সন্তানদের নতুন
পোশাক ছাড়া ঈদ করতে দেখে দেখে তার
খারাপ লাগাটা আরো বাড়বে ।ওদের বন্ধু
বান্ধবেরা হয়তো এটা ওটা জিজ্ঞেস করে
ওদের কষ্ট বাড়াবে । সমবয়সীদের
বাহারী পোশাক ওদের না পাওয়ার
দুঃখটাকে আরও
গাঢ় করে তুলবে । তবু তিনি ভাবছেন
কোন রকমে ঈদের দিনটা চলে গিয়ে রাত
চলে
এলেই বোধহয় এ
দুঃখবোধটা অনেকটা কমে যাবে । অন্তত
আগামী ঈদ পর্যন্ত ।
তাহলে কাল রাতে হয়তো একটু
শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন তিনি । তাই
অধীর আগ্রহে
তিনি ঈদের
আগামী প্রহরগুলো কেটে যাওয়ার
অপেক্ষায় আছেন । কখন শেষ হবে এই
ঈদ ? কখন ?
(ঈদের দিন এমন একটা গল্প
আপনাদেরকে বলার জন্য সরি । কিন্তু
গল্পটি মোটেও
অবাস্তব নয় । একটু তাকিয়ে দেখুন
আমাদের পাশেই আছে অনেক মুহসীন
সাহেবেরা ।
ঈদ যাদের কাছে আনন্দের আবাহন নয়
অক্ষমতার শেল । আর তাদের
অক্ষমতাকে চোখে
আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেই
আমরা ঈদকে করে তুলেছি শপিং সর্বস্ব
লৌকিকতায় ।
আমাদের বোধদয় হোক ।
পোশাকী আড়ম্বরতা নয় তাক্বওয়ার
রঙই গাঢ় করুক আমাদের
ঈদের
আনন্দকে.... ঈদ মোবারক)
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×